জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
দীপক দেব ও ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:৪৪ এএম
বুধবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ডাকসুর ফল ঘোষণার পর সাংবাদিকদের সামনে উচ্ছ্বাসিত নবনির্বাচিত ভিপি, জিএস ও এজিএস। প্রবা ফটো
জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ছাত্ররাজনীতির মাঠে নতুন করে আলোচনায় আসা ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (ডাকসু) ভূমিধস বিজয় পেয়েছে। অতীতে কখনও ডাকসুর কোনো পদে জয় না পেলেও এবার ভিপি-জিএসসহ ১২টি সম্পাদকীয় পদের মধ্যে নয়টি জিতে নিয়েছে। ডাকসুর ২৮ পদের মধ্যে ২৩টিতেই জয় পেয়েছে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের প্রার্থীরা।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিয়েছে, ডাকসু নির্বাচনের ফলাফলে তারই প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করেন ডাকসুর সাবেক নেতাদের কেউ কেউ। তাদের মতে, এ প্রজন্ম প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিÑ বড় ভাইদের সালাম দেওয়া, প্রটোকল বা দখলদারির রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বুঝেছে, রাজনীতি মানে আন্তরিকতা, সংগ্রাম ও অঙ্গীকার; এটি লুটপাট বা ক্ষমতার শর্টকাট রাস্তা নয়। এ প্রজন্ম দুর্বৃত্তায়িত ও চাঁদাবাজির রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করছে এবং পরিবর্তনের দাবি তুলছে। তবে ডাকসু নির্বাচনের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কারও কারও মতে, ডাকসুতে শিবিরের এমন ভূমিধস বিষয়ের পেছনে অনেক বিষয় কাজ করেছে। এর মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থান, ডাকসু নিয়ে শিবিরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সোশ্যাল মিডিয়াকে পুরোপুরি কাজে লাগানো এবং নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারা ছিল অন্যতম। এ ছাড়া অতীত ছাত্ররাজনীতির শঙ্কা থেকে বের হতে না পারার কারণে ছাত্রদলের ওপর আস্থা রাখতে পারেননি শিক্ষার্থীরা। বিকল্প হিসেবে ছাত্রশিবিরকে বেছে নেওয়ার পেছনে এটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে। তবে ডাকসুতে শিবিরের এই বিজয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বা জামায়াতে ইসলামী কিছুটা সুবিধা পেলেও জাতীয় নির্বাচন বা ভোটের রাজনীতিতে এটা খুব বেশি প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না।
গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়। গভীর রাতে ফলাফল ঘোষণা শুরু হয়। পরে গতকাল বুধবার বেলা সোয়া ১১টায় চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ডাকসুর শীর্ষ তিনটি পদ সহসভাপতি (ভিপি) হিসেবে মো. আবু সাদিক কায়েম, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হিসেবে এসএম ফরহাদ ও সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) হিসেবে মুহা. মহিউদ্দীন খান জয় পেয়েছেন। তারা তিনজনই ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থী। ভোটের ব্যবধানও ছিল উল্লেখ করার মতো।
বুধবার সকাল থেকে সামাজিক মাধ্যমেও ডাকসু নির্বাচন নিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন অনেকেই। নেটিজেনদের মতো ডাকসুর সাবেক ভিপি ও জিএসদের কেউ কেউ নির্বাচন নিয়ে নিজেদের মতো করে বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
ডাকসু নির্বাচন নিয়ে গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় কথা বলেছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না। ছাত্র আন্দোলন এবং ডাকসু নির্বাচনের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন তিনি। মান্না বলেন, এ প্রজন্ম দুর্বৃত্তায়িত ও চাঁদাবাজির রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করছে এবং পরিবর্তনের দাবি তুলছে। এবারের ডাকসু নির্বাচন পরিবর্তনের বিষয়গুলো তুলে ধরে সাবেক এই ভিপি বলেন, অতীতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা দাঁড়ানোর সাহস পেত না, কিন্তু এখন দাঁড়াচ্ছেÑ এটিই পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এখন আর বিশাল জনসভা নয় বরং সাইবার প্রচারণা ও নতুন প্রজন্মের ভাবনায় রাজনীতি গড়ে উঠছে। এ প্রজন্ম প্রচলিত সংস্কৃতিÑ বড় ভাইদের সালাম, প্রটোকল বা দখলদারির রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বুঝেছে, রাজনীতি মানে আন্তরিকতা, সংগ্রাম ও অঙ্গীকার; এটি লুটপাট বা ক্ষমতার শর্টকাট রাস্তা নয়।
মান্না আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সুবিধাবাদী হয়ে পড়েছে, কিন্তু ছাত্ররা ভিন্ন উদাহরণ দেখিয়েছে। ভবিষ্যতে ঐক্য ও সংস্কার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এজন্য যতখানি দৃঢ়তা দরকার, তেমনি প্রয়োজনে ছাড়ও দিতে হবে। সংকট নিরসনে সুপ্রিম কোর্টের রায় গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে, আর তা সব দলকেই মানতে হবে।
তিনি বলেন, রাজনীতি হালকাভাবে নেওয়ার বিষয় নয়। এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত সংগ্রাম। তাই সবার দায়িত্ব সৎ, অংশগ্রহণমূলক ও সংস্কারমুখী রাজনীতি গড়ে তোলা। তাহলেই আগামী দিনের জন্য একটি ভালো নির্বাচন এবং একটি উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করা সম্ভব হবে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও ডাকসুর সাবেক জিএস ডা. মুশতাক হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ ও সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোট পড়েছে, এটি আশার সঞ্চার করেছে। ভোটের শেষদিকে কিছু অনিয়ম ও অভিযোগ এসেছে। এগুলো বাতিল না করে ফয়সালা করা দরকার। এসব অনিয়ম নির্বাচনকে কতটা প্রভাবিত করেছে এই প্রশ্ন আসতে পারে। তারপরও অনিয়ম তো অনিয়মই। এই সমস্যা বের করে সমাধান না করা গেলে ভবিষ্যতে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে ব্যবধান থেকে যাবে।
তিনি বলেন, অনেকগুলো অপশনের (বিকল্প) মধ্যে ছাত্ররা নিজেরা যেটা ভালো মনে করেছে, তাদের ভোট দিয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্যাম্পাসে ছাত্রদের নির্যাতন করেছে, দীর্ঘদিনের দখলদারি বজায় রেখেছে এবং তাদের জিম্মি করে কাজ করেছে। অতীতে যেমন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এসব করেছে, আগামীতেও তা করবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এখন যারা ভোট চেয়েছে, গণঅভ্যুত্থানের পর তারা সারা দেশে বিভিন্ন ধরনের দখলদারিত্ব করছে। এটি খারাপ নজির সৃষ্টি করেছে। তাদের এসব কাজের কারণে মানুষের একটি ক্ষোভ জন্ম নিয়েছে। এসব নানা কারণে নির্বাচনী হাওয়া উল্টো গেছে। শিক্ষার্থীরা শিবিরের প্যানেল তথা ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থীদের প্রতি হয়তো কিছুটা নমনীয় মনে করেছে। এজন্য তাদের ভোট দিয়েছে।
ডাকসুর ভোট ধর্মভিত্তিক দলের দিকে যাচ্ছে না। কেননা ছাত্ররা ক্যাম্পাসে তাদের যে তিক্ত অভিজ্ঞতা দেখেছে, সেই আলোকে তারা ভোট দিয়েছে। এটি কোনোভাবেই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেয়নি। গত বছর যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন হলো, সেখানে কিন্তু নির্দলীয় ব্যানারে আন্দোলন হয়েছে। কেউ কোনো রাজনৈতিক চিন্তা নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়নি। এখানে সবগুলো রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের ভূমিকা ছিল কিন্তু কেউ রাজনীতিকে সামনে আনেনি। ডাকসুর রায়কে কেউ ধর্মভিত্তিক ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধ চেতনার মনে করে এবং সেভাবে কাজ করতে চায়, তাহলে তারা দ্রুত জনসমর্থন হারাবে। ছাত্রদের দ্বারা ঘেরাও হয়ে যাবে। তার একটি উদাহরণ হলোÑ গণঅভ্যুত্থানের পর কেউ কেউ মনে করেছিল যেহেতু ধর্মভিত্তিক দলগুলো আন্দোলনে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে। সেখান থেকে তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে টিএসসিতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাদের ফাঁসি হয়েছিল তাদের ছবি টানিয়েছিল। তাৎক্ষণিকভাবে সাধারণ ছাত্ররা দৃঢ় প্রতিবাদ করার পর তা প্রত্যাহার করেছে। কেননা তাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের জঘন্য ভূমিকার কারণে তারা সেই অবস্থান থেকে পরে সরে আসে।
তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী এখন সাইবার দিক। কেননা এটি আগামীতে বড় ধরনের একটি স্থান দখল করে থাকবে। জাতীয় নির্বাচনে এটি বিশাল প্রভাব ফেলবে। আর এই ডাকসু নির্বাচন কোনোভাবেই জাতীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে না। কেননা ইতঃপূর্বেও ডাকসুর অনেক ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হয়েছেন, যারা জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারেনি। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের অত্যাচারের কারণে ছাত্ররা জাসদ ছাত্রলীগকে ভোট দিয়ে নির্বাচনে জয়ী করলেও সেই নির্বাচন পরবর্তী সংসদ নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারেনি। তারপরও অনেকেই ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন কিন্তু এমপি হননি। অর্থাৎ এসব নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না।
ডাকসুর সাবেক ভিপি ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন তার প্রত্যাশার কথাও। তিনি লিখেছেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ঐতিহাসিক এই নির্বাচনে বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারী সকল শিক্ষার্থীকে অভিনন্দন জানাই। একই সঙ্গে ধন্যবাদ জানাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে, যারা ধৈর্য, কৌশল ও দক্ষতার সঙ্গে প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলে একটি প্রাণবন্ত ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্পন্ন করেছেন।’
তিনি লিখেছেন, ‘আশা করি তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে ক্যাম্পাসের সকল ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে ছাত্ররাজনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা করবেন। যেখানে ছাত্ররাজনীতি হবে জাতীয় রাজনীতির কালো থাবামুক্ত এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নিবেদিত।’
নুর উল্লেখ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় যেন শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া, গবেষণা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, গান-কবিতা, আড্ডা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার তীর্থভূমি হয়ে ওঠে।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ডাকসুতে শিবিরের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পেছনে মূল কনটেস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান। যদিও একটি বিষয় এখানে সম্পৃক্ত নয় বরং অন্য অনেক কারণও থাকে। আমার কাছে মনে হয়েছে, ডাকসু নিয়ে শিবিরের দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি ছিল। তাদের প্রচারণার স্টাইল, ক্যান্ডিডেট সিলেকশন সবকিছু মিলে একটি কমপ্লিট প্যাকেজ আকারে কাজ করেছে। সামাজিক মাধ্যমকে তারা ব্যবহার করেছে। তাদের পর্যাপ্ত রিসোর্স ছিল। অ্যালামনাইয়েও প্রচুর লোকবল রয়েছে। সবকিছু মিলেই এমনটা হয়েছে।
তিনি বলেন, ছাত্ররা শঙ্কামুক্ত হতে পারেনি যে ছাত্রলীগের মতো ছাত্রদলও কি একই ধরনের কাজ করবে? হল লাইফ, গেস্টরুম কালচার আবার ফিরে আসবে কি না। এখানে আস্থা ফিরে পায়নি। সবাই শিবিরকে পছন্দ করে দিয়েছে বিষয়টি তাও না। কিছুটা বিকল্প বা পরীক্ষা হিসেবে নিয়েছে। তুলনামূলকভাবে নারী ভোটারদের তারা কাছে টানতে পেরেছে। এটা ইউনিক ব্যাপার। কেননা পর্দার কারণে তারা তাদের থেকে দূরেই থাকতে চায়। তাদের কৌশল ভালো কাজ করেছে।
এর প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, এই বিজয় ইসলামী রাজনীতিতে উৎসাহ ও উদ্দীপনা তৈরি করবে। জামায়াত এখান থেকে সুবিধা পেতে পারে। কেননা এখানে ৬৪টি জেলার ছেলেমেয়ে রয়েছে। তাদের কাছে তারা প্রচার করবে। এটা নির্বাচনে একবারে ডিটারমাইন করবে না। জাতীয় রাজনীতিতে নির্বাচনে জয়ী হওয়া অন্য জিনিস। তবে এটি তাদের উৎসাহিত করবে।