দলীয় সমন্বয় সভা
দীপক দেব
প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৪ ০৯:৩৩ এএম
ফাইল ফটো
সাম্প্রতিক সহিংসতা চলাকালে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারার কারণ খুঁজতে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের নিয়ে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করেছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে দলের তৃতীয় দিনের মতো সমন্বয় সভা ডাকা হয়। গত দুই দিনের মতো এদিনও থানা ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতাদের অনেকেই কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে ক্ষোভ ঝেড়েছেন। থানা-ওয়ার্ডে কমিটি না থাকার কারণে সমন্বয়হীনতার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। এছাড়া মাঠে থাকা না থাকা নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনেই হট্টগোলে জড়িয়ে পড়েন নেতারা। কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এছাড়া নগরের নেতাদের লক্ষ্য করে ভুয়া ভুয়া আওয়াজ দিয়েও ক্ষোভ জানিয়েছেন তৃণমূলের অনেক নেতা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তৃতীয় দিনে ঢাকা-১১, ঢাকা-১৪, ঢাকা-১৫, ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য এবং থানা-ওয়ার্ড নেতাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। ঢাকা মহানগর উত্তরের নেতারাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন। সভায় সূচনা বক্তব্য দেন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। পরে শুরু হয় রুদ্ধদ্বার আলোচনা। এ সময় থানা ও ওয়ার্ড নেতারা তাদের বক্তব্য তুলে ধরতে শুরু করেন। প্রতিটি থানা ও ওয়ার্ড থেকে একজন করে নেতার বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল।
শুরুতে উত্তরের মিরপুর এলাকার একটি ওয়ার্ডের সভাপতি আমির উদ্দিন মিরপুর-১০ এলাকায় স্থানীয় সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদারের নির্দেশনায় মাঠে থাকার দাবি করেন। তার এমন বক্তব্যের পরপরই উপস্থিত নেতাকর্মীদের একটি অংশ এর প্রতিবাদ জানিয়ে হট্টগোল শুরু করেন। তারা দাবি করেন, কামাল আহমেদ মজুমদার ও তার অনুসারীদের কেউই ওই এলাকায় ছিলেন না। এ সময় মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক চেষ্টা করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হন। পরে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এরপর কাফরুল থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি জামাল মোস্তফা বলেন, আজকে দলের এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী সমন্বয়হীনতা। নেতা ও কর্মীদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। এই সমস্যার মূলে রয়েছে থানা-ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি না থাকা। কমিটি থাকলে এমন সমস্যায় পড়তে হতো না। ওবায়দুল কাদেরকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনি দলের সাধারণ সম্পাদক। আপনি নগরের থানা-ওয়ার্ড কমিটি দেন। কমিটি থাকলে এমন পরিস্থিতি হবে না। এ সময় উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম মান্নান কচি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়? সবাই সে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলবেন। এখানে কমিটি গঠন নিয়ে কেউ কোনো কথা বলবেন না।
পল্লবী থানার ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি আশিকুল ইসলাম আশিক বলেন, ঐক্যবদ্ধ থাকার বিকল্প নেই; কিন্তু বাস্তবে আমাদের মধ্যে কোনো ঐক্য নেই। একজন আরেক নেতার কথা শোনে না। তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের উদ্দেশ করে বলেন, দলের সবাই যেন সবার কথা শোনে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে দল ঘুরে দাঁড়াবে।
নিজের এলাকায় দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা মাঠে ছিলেন বলে দাবি করেন পল্লবী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সারোয়ার আলম। তার এমন বক্তব্যে উপস্থিত নেতাকর্মীরা আবার ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা প্রতিবাদ জানিয়ে তার বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। কেউ কেউ বলতে থাকেন, আপনি নিজেই মাঠে ছিলেন না। এ সময় তাকে উদ্দেশ করে ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিতে শোনা যায়। এ অবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকলে মাইক্রোফোন হাতে নেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম। তিনি সবাইকে চুপ থাকার অনুরোধ করে বলেন, দলের কোথায় সমস্যা আমরা বুঝেছি। এই পরিবেশে আর কারও বক্তব্য আমরা শুনব না। প্রয়োজনে প্রতিটি থানা-ওয়ার্ড নিয়ে পৃথকভাবে বসা হবে। এরপর আর কাউকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
পরে সভা সমাপ্ত ঘোষণা করেন ওবায়দুল কাদের। এ সময় তিনি বলেন, আপনারা কারা মাঠে ছিলেন আর কারা ছিলেন না- আমাদের কাছে সব তথ্য আছে। আপনারা দলের পদে থেকে ঘরে বসে থাকবেন, দলের খারাপ সময়ে নিজেকে লুকিয়ে রাখবেন, তা হতে পারে না। যারা মাঠে ছিলেন না, তাদের তালিকা হচ্ছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তালিকা ধরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সভায় উত্তর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, আমরা একটা উদ্দেশ্য নিয়ে আজকের সভা করেছি। কিন্তু আপনাদের যে উপস্থিতি, তাতে আমাদের ইচ্ছার প্রতিফলন হয়নি। আমরা আরও উপস্থিতি আশা করেছিলাম। এ সময় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে সভা শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তৃণমূল নেতাদের তোপের মুখে পড়েন মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তাদেরকে ঘিরে ধরেন উপস্থিত নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে মাঠে থাকা নেতাকর্মীদের তালিকা করার দাবি জানান। একই সঙ্গে যারা মাঠে ছিলেন না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি তোলেন তারা। উত্তরের সভাপতি শেখ বজলুর রহমানের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক এসএম মান্নান কচির সঞ্চালনায় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক, সুজিত রায় নন্দী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক আব্দুস সবুর, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগের দুটি সমন্বয় সভাতেও দলীয় সমন্বয়হীনতা ও কিছু নেতার ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন থানা-ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারা। কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে তারা পদবাণিজ্যের অভিযোগ তোলেন। টাকা নিয়ে হাইব্রিড নেতাদের পদ দেওয়ার কারণে ত্যাগীদের অনেকেই অভিমান করে মাঠে ছিলেন না বলেও কেন্দ্রীয় নেতাদের জানিয়েছেন তারা।
ভেঙে দেওয়া হয়েছে ২৬ ইউনিট কমিটি
এদিকে সাম্প্রতিক সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালনের ব্যর্থতার দায়ে ঢাকা-১৩ আসনের ৮টি ওয়ার্ডের ২৬টি ইউনিট কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। এই ধরনের আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।