স্মরণ
হাজেরা সম্পা
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৪ ০৯:৫৭ এএম
নূরজাহান বেগম।
দেশে নারী সাংবাদিকতার
অগ্রদূত হিসেবে স্মরণীয় নূরজাহান বেগম। জন্ম ১৯২৫ সালের ৪ জুন চাঁদপুরের চালিতাতলী
গ্রামে। ডাকনাম নূরী। বাবা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ও মা ফাতেমা খাতুন। নূরজাহান বেগমের
শিক্ষাজীবনের শুরু সাখাওয়াত মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে। পরে বেলতলা উচ্চবিদ্যালয়ে
ভর্তি হন কিন্তু সেখান থেকে পুনরায় আগের বিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। ১৯৪২ সালে সাখাওয়াত
মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন
কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হন এবং ১৯৪৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। একই কলেজ থেকে
১৯৪৬ সালে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন।
বাবা মোহাম্মদ
নাসিরউদ্দীন ছিলেন সওগাত পত্রিকার সম্পাদক। বাবার হাত ধরেই নূরজাহান বেগম সংবাদপত্রজগতে
প্রবেশ করেন। তিনি উপমহাদেশের প্রথম নারী সাপ্তাহিক পত্রিকা বেগম-এর সম্পাদক। সূচনালগ্ন
থেকে আমৃত্যু পত্রিকাটি সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শিক্ষাজীবন শেষ করে নূরজাহান
বেগম মাত্র ২২ বছর বয়সে বেগম সম্পাদনায় যুক্ত হন। বেগম পত্রিকার প্রকাশনা শুরু হয়
১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই যখন নূরজাহান বেগম বিএ শ্রেণিতে পড়তেন। বেগম পত্রিকার প্রথম সম্পাদক
ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। তিনি প্রথম চার মাস সম্পাদক হিসেবে এর দায়িত্ব পালন করেন।
বেগমের শুরুতে নূরজাহান বেগম ছিলেন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক।
দীর্ঘ ছয় দশক
বেগম সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি আমাদের সংবাদপত্রজগৎকে যেমন সমৃদ্ধ করেছেন, তেমন মেয়েদের
সাংবাদিকতায় এগিয়ে আসার প্রেরণা হিসেবে তার ভূমিকা অবিস্মরণীয়। নূরজাহান বেগম এবং সাপ্তাহিক
বেগম সমার্থক দুটি নাম। এ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি সমাজের পিছিয়ে থাকা নারীদের জাগিয়ে
তোলার অগ্রপথিকের ভূমিকা পালন করেন। তার হাত ধরেই সংবাদপত্রজগতে প্রবেশ করেছেন অসংখ্য
নারী সাংবাদিক। লেখক সৃষ্টিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। যে সময়ে নারীদের
লেখা ছাপা ছিল প্রায় নিষিদ্ধ ওই সময়ে তিনি বাবার অনুপ্রেরণায় সম্পাদনার কাজ শুরু করেন
এবং নারী লেখকদের লেখা ছবিসহ প্রকাশ করে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। সব সময়ই তিনি চেয়েছেন
নারীসমাজের উন্নয়ন ও অগ্রগতি। পশ্চাৎপদ নারীসমাজকে তুলে আনতে চেয়েছেন সামনের কাতারে।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সম্পাদনায় সওগাতের ভূমিকা অনেক বিস্তৃত।
সওগাতকে ঘিরে বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে গড়ে উঠেছিল সাহিত্যগোষ্ঠী। সেই গোষ্ঠীরই
আরেকটি উল্লেখযোগ্য পত্রিকা বেগম। সওগাতের সাহিত্য আড্ডার মতোই মেয়েদের জন্যও ১৯৫৪
সালে গঠিত হয় বেগম ক্লাব। যেখানে এসে মেয়েরা মুক্তমনে নানা বিষয়ে আলোচনার সুযোগ পেতেন।
বেগম ক্লাবের প্রেসিডেন্ট বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ, সেক্রেটারি নূরজাহান বেগম এবং
বেগম সুফিয়া কামাল ছিলেন অন্যতম উপদেষ্টা।
নারী শিক্ষা ও সাহিত্য ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ১৯৯৭ সালে রোকেয়া পদকে ভূষিত হন নূরজাহান বেগম। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ মহিলা সমিতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, লেখিকা সংঘ, কাজী জেবুন্নেসা-মাহবুবউল্লাহ ট্রাস্ট, রোটারি ক্লাবসহ বিভিন্ন সংগঠনের সম্মাননাও পান তিনি। ৫ মে, ২০১৬ সালে অসুস্থ অবস্থায় নূরজাহান বেগম ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৩ মে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নারীজাগরণ, নারীমুক্তি পথ উন্মুক্ত করে সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে নূরজাহান বেগমের অবদান জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণে রাখবে।