× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্পাদকীয়

চিকিৎসা ব্যয়ে লাগাম টানতেই হবে

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ২১ মে ২০২৪ ১০:০৬ এএম

চিকিৎসা ব্যয়ে লাগাম টানতেই হবে

উইনস্টন চার্চিল ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ও লেখক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চার্চিলকে যুক্তরাজ্য ও বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে গণ্য করা হয়। জনস্বাস্থ্য নিয়ে তার ভাবনা ছিল দিগন্তবিস্তৃত। তিনি বলেছিলেন, ‘সুস্বাস্থ্যবান নাগরিকরাই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হয়।’ আমাদের সংবিধানে চিকিৎসা সেবাপ্রাপ্তি মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা কিংবা চিকিৎসার পথ যে দেশে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় মসৃণ নয় এবং বৃহদাংশের সাধ্যের মধ্যেও নেই এরই ফের সাক্ষ্য মিলেছে ২০ মে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি সুবিধার ২০ শতাংশও ভোগ করতে পারে না দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দরিদ্র পরিবার। ৪৬ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা খরচ মেটাতে কোনো না কোনো অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছে, হচ্ছে। দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণে সরকারের বরাদ্দ অপর্যাপ্ত উল্লেখ করে দেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে এসডিজি অ্যাকশন অ্যালায়েন্স বাংলাদেশ। ১৯ মে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার অধিকার প্রতিষ্ঠায় নাগরিক সমাজের অবস্থানপত্র শীর্ষক’ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

স্বাস্থ্য খাতে ইতোমধ্যে লক্ষণীয় অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও এখনও যে এক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে তাও অসত্য নয়। আমরা দেখছি, প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে সেবাপ্রত্যাশীদের নানা বিড়ম্বনার চিত্র। স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও দুঃখজনকভাবে সত্য, সেবার নামে নানারকম অশুভ তৎপরতা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। কোনো কোনো সরকারি হাসপাতালে সেবাপ্রত্যাশীদের সেবার ক্ষেত্রে কিছু চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল অনেকের পাশাপাশি দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যের কারণে ভোগান্তির খবরও সংবাদমাধ্যমেই উঠে আসছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির পথ সহজ করার লক্ষ্যে সরকারি হাসপাতালে ‘ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিস’-এর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় গত মার্চে। সরকারি কর্মঘণ্টা শেষে ৩ ঘণ্টা চিকিৎসকরা সরকারি হাসপাতালে ‘ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিস’ অর্থাৎ প্রাইভেট প্র্যাকটিস করবেন, এও ছিল সিদ্ধান্তের অন্তর্ভুক্ত। এজন্য চিকিৎসকদের পদ অনুযায়ী ফি’ও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। সংক্ষিপ্ত পরিসরে আপাতত এই পরিষেবা চালুর সিদ্ধান্ত হলেও আমরা সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এরপরও প্রশ্ন থাকে, চিকিৎসা ব্যয় কি সর্বসাধারণের সাধ্যের মধ্যে এসেছে?

বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি নতুন নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বরাত দিয়ে এসডিজি অ্যাকশন অ্যালায়েন্স-এর তথ্য সূত্র উল্লেখ করে ওই প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পেতে একজন বাংলাদেশির বছরে ৮৮ ডলার খরচ করা প্রয়োজন হয়। কিন্তু দেশে চিকিৎসা খাতে মাথাপিছু খরচ হয় ৫৮ ডলার, যার বড় অংশই নাগরিকরা নিজেরা সংস্থান করেন। সংস্থাটি ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবায় অভিগম্যতা, কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন গ্রহণের হার এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে নোয়াখালী, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশালের ৬০০ নাগরিকের ওপর মতামত জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে দেখা গেছে, ৭৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ কমপক্ষে একটি ডোজ পেয়েছেন, ২১ দশমিক ৩ শতাংশ কোনো ভ্যাকসিনই নেননি। প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে প্রান্তিক মানুষের অভিগম্যতার হার ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু অনেক প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া কঠিন। স্বাস্থসেবার ব্যয় এবং চিকিৎসার মান নিয়েও বহুমাত্রিক প্রশ্ন রয়েছে তা সচেতন মহলের অজানা নয়। রাষ্ট্রের দায় সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং অধিকারের মাঠ সমতল করা।

ইতিপূর্বে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা বলেছি, স্বাস্থ্যসেবায় অভিগম্যতা সম্প্রসারণে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। স্বাস্থ্য বীমা কর্মসূচির আওতার পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা খরচের জন্য ভর্তুকি প্রদান করে এর জন্য ব্যক্তিপর্যায়ে ব্যয় কীভাবে কমানো যায় এই তাগিদও আমরা দিয়েছিলাম। প্রত্যেকটি সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরিষেবাগুলো আরও সহজলভ্য এবং সাশ্রয়ী করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা শক্তিশালী করাও অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসাসেবায় কোনোরকম বৈষম্য কাম্য না হলেও এর ছায়াও কম বিস্তৃত নয়। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নেওয়া দুরূহ। চিকিৎসাকেন্দ্রিক বাণিজ্যের নানামাত্রিক কৌশল আমাদের স্বাস্থ্য খাতের জন্য বড় সংকট। চিকিৎসা পেশাই মানবিক ও মহৎ। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য নিশ্চিত করার দাবিও নতুন নয়। অগ্রগতি সত্ত্বেও আমরা স্বাস্থ্যসেবা সবার কাছে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছে দিতে পারিনি, এই সত্য অনস্বীকার্য। ধারাবাহিক চার মেয়াদের এই সরকার পঞ্চমবারের মতো সরকার গঠন করে প্রতিটি ইউনিয়নে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে, এও অসত্য নয়। কিন্তু দেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে জনমনের আস্থার সংকট কাটাতে ইতিবাচক কার্যক্রম দৃশ্যমান করতে হবে।

সরকারি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার জন্য যে জনবল ও অবকাঠামো আছে তা প্রয়োজনের তুলনায় এখনও অপ্রতুল। এরই সুযোগ নিচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালগুলো। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় এত বেশি যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বহন করা দুরূহ। ফলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর অতিরিক্ত ভিড় লক্ষ করা গেলেও এই চাপ সামলানো অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা দেখছি, অনেকেরই বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে এবং এই পরিস্থিতি দেশের স্বাস্থ্য খাতের স্বাস্থ্যহীনতাকেও নির্দেশ করে বললে অত্যুক্তি হবে না। এর ফলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে বিড়ম্বনাও। বিদেশে চিকিৎসা নিয়েছেন এমন অনেকেরই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ইতোপূর্বে সংবাদমাধ্যমেই উঠে এসেছে, কোনো চিকিৎসার জন্য দেশে যত টাকা খরচ করতে হয় অনেক ক্ষেত্রে এর চেয়ে কম খরচে প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিশেষ করে ভারতে এখানকার চেয়ে ভালোমানের চিকিৎসা সম্ভব। এই বার্তা স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সরকারের নিরলস প্রচেষ্টার বিপরীতে কোনোভাবেই সুখকর নয়।

আমরা জানি, ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার দেশে প্রথম জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই এর অন্যতম লক্ষ্য। আমরা মনে করি, সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে স্বাস্থ্য খাত ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি চিকিৎসাব্যবস্থার পথ মসৃণ করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের উদ্যোগের মতো জনকল্যাণমুখী কর্মসূচির আরও সম্প্রসারণ জরুরি। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। যদি অধিকারের ক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা যায়, তাহলে জিইয়ে থাকা নেতিবাচক অনেক কিছুরই নিরসন সম্ভব। সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন যূথবদ্ধ প্রচেষ্টা। চিকিৎসা ব্যয়ে লাগাম টানতে হবে দেশের জনগোষ্ঠীর বৃহৎ কল্যাণের স্বার্থে। আর এজন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন যথেষ্ট অর্থ এবং সুচারু ব্যবস্থাপনা। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা