ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি
জোয়ান ডেনোভান
প্রকাশ : ১০ মে ২০২৪ ১৩:৪৩ পিএম
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন
অঞ্চলে শিক্ষার্থীরা শোভাযাত্রা-মিছিলের মাধ্যমে আন্দোলন করেছেন। বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষার্থীরা গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধের জোর দাবি জানিয়ে আসছেন।
ফিলিস্তিনে গণহত্যার বিরুদ্ধে মত বিশ্বের দেশে দেশে ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। অধিকাংশ প্রতিবাদকারী
সঙ্গত কারণেই বৈদেশিক নীতিমালার দ্বিমুখী আচরণের বিষয়টি সামনে তুলে আনছেন। সম্প্রতি
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তারের পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিতে
ছাত্রবিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করেছে। একে একে তা ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। একজন সমাজবিজ্ঞানী
হিসেবে সমাজে যেকোনো সংকটের গতিপ্রবাহ শনাক্ত করার জটিল কাজটি আমাকে করতে হয়। বিদ্যমান
পরিস্থিতি যাচাইয়ে বলা যায়, আগামী কয়েক সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে
এই আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে। এই আন্দোলনের গতিবিধি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক
প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের মনোযোগও আকর্ষণ করবে, এমনটি সহজেই অনুমেয়।
২০১১ সালে লস এঞ্জেলসে গবেষণাকাজের সময় সামাজিক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার
গতিবিধি নিয়ে ব্যাপক পড়ালেখা করছিলাম। ওই সময় লক্ষ করেছি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের
সহায়তায় যেকোনো আন্দোলন সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন অ্যাপ কিংবা স্ট্রিমিং পদ্ধতিতে সত্যিকার
ঘটনা সহজেই দূরবর্তী কোনো স্থানে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ওই সময় ওকুপাই আন্দোলন চলছিল। এই
আন্দোলনকারীরা হয়তো মাঠপর্যায়ে তেমন সুবিধা আদায় করতে পারেনি তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের
সহায়তায় তারা দ্রুত নিজেদের আন্দোলন সম্পর্কে অন্যদের সতর্ক করতে পেরেছিল। স্মার্টফোন
থাকায় এখন প্রত্যেকেই ‘নগর সাংবাদিকতা’র অংশ হিসেবে দাবি করেন। প্রাত্যহিক জীবনে যা
কিছু ঘটে তার সবকিছুই এখন তারা নথিবদ্ধ করে ফেলতে পারে। এভাবে গোটা বিশ্বেই একদল স্ট্রিমারের
আবির্ভাব ঘটেছে। এরই প্রভাব হিসেবে গোটা বিশ্বে যেকোনো ঘটনারই খণ্ডিত অংশ আমাদের দৃষ্টিগ্রাহ্য
হয়।
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের চড়াও হওয়া
এবং প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গিও মূলত এভাবেই গোটা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে। বিশ্বের আরও অনেক
দেশেই এমনটি ঘটেছে, ঘটছে। ২০১১ সালে নিউইয়র্কে অকুপাই আন্দোলনের সময় আমি নিজে আন্দোলনকারীদের
সঙ্গে আলাপ করেছি। কীভাবে তারা আন্দোলন ছড়িয়ে দিয়েছে এবং এর প্রভাব কেমন হয়েছে, তা
যাচাই করার চেষ্টা করেছি। এরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আরও অনেকগুলো আন্দোলনের প্রভাব
ও প্রসারের বিষয়টি নিয়ে জরিপ করার চেষ্টা চালিয়েছি। যেকোনো সমাজবিজ্ঞানীর মতোই বিষয়টিকে
আমি গবেষণা করতে চেয়েছি। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণের স্তরকাঠামো
কিছুটা হলেও বুঝেছি। উল্লেখ্য সংখ্যালঘু জাতিসত্তার মানুষ পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়ে একাধিক
আন্দোলন করছে গত এক যুগ ধরে। কিন্তু এ ধরনের আন্দোলন যে চলমান, এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ
সর্বসম্প্রতি সচেতন হতে শুরু করেছে। মূলত ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমেই তারা জানতে পেরেছে,
এমন কোনো আন্দোলন চলমান।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় সম্প্রতি নোডিএপিএল নামক আন্দোলনটি
ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। গাজায় সহিংসতার এই আন্দোলনটি আকস্মিকভাবে নাগরিক অধিকার,
বাকস্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। তাহরির স্কয়ারে প্রতিবাদকারীদের
ওপর হামলার বিষয়টিকেও ব্যাপক জোর দেওয়া হচ্ছে। যেকোনো গণমাধ্যমই আন্দোলনের প্রসারে
ভূমিকা রাখে। সঙ্গত কারণেই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সভায় পুলিশি নির্যাতন অন্য অনেককে
আন্দোলনের প্রতি সমব্যথি করে তোলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার
ফলাফল বহুমাত্রিক হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বভুবনে একধরনের অদৃশ্য অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। গোটা বিশ্ব আজ যুদ্ধবিরোধী
অবস্থানে থেকে নিজেদের মতপ্রকাশ করছে। সমসাময়িক নানা ঘটনা সম্পর্কে তারা সচেতন হচ্ছে
ফোনের মাধ্যমে। এই ফোন মানুষের রাজনৈতিক অস্ত্র বা সহায়ক হয়ে উঠেছে। চলমান নানা আন্দোলন
ও প্রযুক্তির উৎকর্ষ অনুসন্ধানী সাংবাদিক হতে চান এমন অনেককেই উৎসাহী করছে। তারা এখন
নিখুঁত এবং বস্তুনিষ্ঠ সত্য রেকর্ড করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগও পাচ্ছে। আজকের তরুণ
প্রজন্ম বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসে প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে
পারছে আরও প্রবল তাড়না নিয়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের দাবির লক্ষ্য আরও স্পষ্ট হওয়া
জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় মুক্ত জ্ঞান অন্বেষণ এবং জ্ঞান অনুসন্ধানের পথিকৃৎ এমন বক্তব্য
স্ববিরোধী। যদি তা না-ই হয় তাহলে প্রশাসন কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের
আন্তঃসম্পর্কবিষয়ক তথ্য কেন শিক্ষার্থীদের জানানো হয় না?
আজ যে শিক্ষার্থীরা যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিচ্ছে, বিশ্বের বিভিন্ন
প্রান্তে তাদের ওপর খড়গহস্ত হয়ে উঠছে প্রতিষ্ঠান ও নানা নীতিমালা। সমস্যা হলো, যারা
শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে আর যে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে অনড় অবস্থানে রয়েছেÑ
এই দুয়েরই কোনো শক্ত অবস্থান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি আদায়ের
ক্ষেত্রে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভর করলে কোনো সুবিধা আদায় সম্ভব হবে
না। কারণ তাদের আন্দোলনের কৌশল সম্পর্কে প্রশাসনিক দপ্তর সচেতন হচ্ছে দ্রুত। এই আন্দোলন
দমনেরও সঠিক কৌশল তারা খুঁজে পাচ্ছে কোনো ঝামেলা ছাড়া। ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘর্ষ বন্ধের
জন্য শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন রাজনৈতিক মাত্রা পাওয়ার জন্য নতুন কৌশল অবলম্বনের পথে
যেতে হবে। কারণ আগামী নভেম্বরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন।
তাদের এই আন্দোলন যদি সঠিক কৌশলের মাধ্যমে রূপ পায় তাহলে ওই নির্বাচনে এর একটি প্রভাব
পড়তে বাধ্য।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ঘটনা ঘটেছে এর বিপরীতে আরও অনেক ঘটনা
ও প্রতিবাদের সম্ভাবনা দৃশ্যমান হবে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বিভিন্ন দেশের সমাজে
ও বিশ্ববিদ্যালয়েও যুদ্ধবিরোধী অবস্থান অনড় হয়ে উঠেছে। কিন্তু বৈদেশিক ও দ্বিপক্ষীয়
সম্পর্কের নিরিখে এই প্রতিবাদ দমানোর জন্যই বিভিন্ন দেশের স্ববিরোধী অবস্থানও স্পষ্ট।
তা আরও প্রকট হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যখন শিক্ষার্থীদের সাময়িক
বরখাস্তের পথে হাঁটবে তখন আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যাও কমবে। কিন্তু এই আন্দোলন
বিক্ষিপ্তভাবে গোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই ছড়িয়ে পড়বে। দিন শেষে তা যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের
হাস্যরসে পরিণত হয় তাহলে এই গোটা আন্দোলনের মহৎ উদ্দেশ্য বিঘ্নিত হবে। এই আন্দোলনের
ক্ষেত্রে একটি স্লোগান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এই স্লোগান যেন স্তিমিত না হয়। স্লোগানটি
হলো, ‘ওরা আমাদের মাটিতে মেশাতে চেয়েছে কিন্তু বুঝতে পারেনি আমরাই বীজ’।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন