নাহিদ আখতার
প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২২ ২৩:৫০ পিএম
আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২২ ২৩:৫১ পিএম
ছেলে আর মেয়ে যে আলাদা তা বোঝানোর প্রক্রিয়া শুরু হয় ছোটবেলা থেকেই। ছবি : সংগৃহীত
ছেলে আর মেয়ে যে আলাদা তা বোঝানোর প্রক্রিয়া শুরু হয় ছোটবেলা থেকেই। সবকিছুর ওপরে তারা যে মানুষ, উদারতা, মানবিকতা আর বৈষম্যের ঊর্ধ্বে, সেটাই যেন ভুলে যান সবাই।
ছেলেদের আবেগ দেখানো যাবে না, শত কষ্টেও চোখে পানি আনা যাবে না, এসব কি আসলে যুক্তিযুক্ত? অথচ ছোটবেলা থেকেই ছেলে শিশুকে পুরুষ হওয়ার শিক্ষা দেয় পরিবার। এই শিশু একদিন বড় হয়ে যখন মায়ের কোল ছেড়ে ঘরের বাইরে পা রাখে তখন নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। ঘরের কাজ থেকে শুরু করে জীবনে চলার অপরিহার্য এসব প্রাথমিক শিক্ষা ঘর থেকেই দিলে ছেলে বাচ্চারাও হবে স্বনির্ভর সহানুভূতিশীল আর উদার। ঘরে বাইরে ছেলেমেয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার এই আধুনিক যুগে মেয়েরা যেমন ঘরের বাইরের কাজেও পারদর্শী হচ্ছে ছেলেদেরও তেমনি ঘরে বাইরে সব ধরনের কাজে পারদর্শী হওয়াটা জরুরি।
মেয়েরা আবেগপ্রবণ এমন ধারণা এখনও সমাজে টিকে আছে। কিন্তু এই ধারণা অনেকটা মন্দের ভালো। মেয়েরা অন্তত তাদের হাসি-কান্না, চিন্তা-দুশ্চিন্তাগুলো ভাগ করে নিতে লজ্জা বা ভয় পায় না। অন্যদিকে ছেলেদের শৈশব থেকেই যেকোনো পরিস্থিতিতে আবেগ চেপে রাখতে শেখানো হয়েছে। আবেগ চেপে আমরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে আবেগ প্রকাশ করলে পুরুষত্বে আঘাত লাগে। ছেলেবাচ্চাকে খুব অল্প বয়সেই মায়ের কাছ থেকে, তার স্পর্শ থেকে আলাদা করার চেষ্টা থাকে। অথচ বিকাশ মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মায়ের সাহচর্য শিশুর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অনেক সময় শিশুর মনে অভিমান কিংবা অন্যান্য নেতিবাচক অনুভূতি জমাট বাঁধতে শুরু করে, যা ভবিষ্যতে পরিবারের জন্য ভয়ংকর সমস্যা হতে পারে। এর মধ্যবর্তী সময়ে শিশু মন খুলে তার আবেগ প্রকাশ করতে পারে না। শৈশবেই এক অদৃশ্য দেয়াল তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। শিশুর পরিবার নিজেদের দায় এড়িয়ে, দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে, বাচ্চাদের দিকেই একক অভিযোগের তীর ছুড়ে দেয়। মেয়েদেরকে তাও নিরাপত্তার কথা ভেবে কিংবা বুদ্ধি কম ভেবে অনেকটা বয়স পর্যন্ত বাবা-মা চোখে চোখে রাখেন। তাদের যেভাবে পরিচর্যা করা হয় সেটাও ছেলেবাচ্চাদের দিকে তাকালে দেখবেন আলাদা। শারীরিকভাবে বড় হয়ে উঠলেও সাহায্য, সহযোগিতা, উপদেশ আর যত্ন ছেলেমেয়ে উভয়েই সারাজীবন একইভাবে পরিবার থেকে পায় না। ঠিকমতো কৈশোর পার হওয়ার আগেই ছেলেদের মাথায় ঢুকানো হয় তাদেরকে এবার উপার্জনের পথ ধরতে হবে।
ছেলে হওয়া মানে তাকে পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে। পয়সা কোথা থেকে আর কীভাবে বেশি বেশি কামানো যাবে ভাবতে ভাবতে ঠিকমতো কৈশোর কিংবা যৌবন কোনোটাই তারা উপভোগ করতে পারে না? কতটুকুই বা সত্যিকারের মানবিক গুণাবলি বা মূল্যবোধে বিকশিত হতে পারে? অবশ্য তাতে অনেক পরিবারেরই যেন কিছু যায় আসে না। কীভাবে আয় করছে সেটার চেয়ে বরং গুরুত্ব পায় কত আয় করছে। এমনকি পরিবারে নিজের মান-সম্মানও নির্ভর করে আয়ের ওপর।
সব পরিবারকেই যে সন্তানের আয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়, তা কিন্তু নয়। অথচ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অযথাই বাড়তি একটা চাপ ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয় যাতে করে পরিবারের অন্যরা গর্ব করার উপলক্ষ খুঁজে পান। এই বাড়তি চাপের কারণে যে সময়টিতে বাচ্চারা সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নিয়ে আরেকটু ভাবতে পারত সেখানে তাকে রোজগার নিয়ে ভেবে ভেবে দিশেহারা হতে হচ্ছে। শুধুই তার ক্যারিয়ারের গল্প করে তো আর কেউ সুখী হতে পারছে না, সেটা বুঝে যায় সে নিজেও দিন শেষে।
ছোটবেলায় কিন্তু কেউ নিজেকে আলাদা মনে করে না, অথচ এই আলাদা করে তোলার বিষয়টি মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে পরিবার থেকেই কেড়ে নেওয়া হয় অনেকেরই কৈশোর। এর ধারাবাহিকতা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও থেকে যায়। কেড়ে নেওয়া হয় মানুষ হিসেবে স্বতস্ফূর্ত আনন্দময় জীবন। তার প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার খবরের মাধ্যমে কিছুটা আন্দাজ করা যেতে পারে। এখন একটাই প্রত্যাশা, বদলে যাক এসব অসুস্থ মানসিকতার, যত্নবান হোক প্রতিটি অভিভাবকত্ব।
লেখক : গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া, আমেরিকা