× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মিয়ানমার সংঘাত

সীমান্ত নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশ ঠেকানো দুই-ই চ্যালেঞ্জ

ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ

প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৪ ০৯:২৫ এএম

ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ

ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পুবের প্রতিবেশী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অগ্নিগৰ্ভ পরিস্থিতির বিরূপ প্রভাব বহুমুখী হয়ে দাঁড়িয়েছে। দোদুল্যমান ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তা টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবা নিয়ন্ত্রণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বন্ধ করে রাখার ফলে সেখানকার প্রকৃত চিত্র পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। তথাপি যেসব তথ্য প্রকাশ পেয়েছে, তাতে নিশ্চিতভাবে ধারণা করা যায়, মিয়ানমার জান্তা ও জান্তাবিরোধীদের পাল্টাপাল্টি বোমাবর্ষণের ফলে শুষ্ক এ মৌসুমে আগুনে পুড়ছে রাখাইনের বিস্তীর্ণ জনপদ। রাখাইনের দুর্গম ও ও সীমান্তবর্তী এলাকায় জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা ঘাঁটি, শিবির ও চৌকির প্রায় সব কটি দখল করেছে আরাকান আর্মি। এবার তারা দখলে নিতে চায় রাখাইনের রাজধানী সিতওয়ে (স্থানীয় উচ্চারণে সাইটটুয়ে বা সিটটুয়ে, যা আগে আকিয়াব নামে পরিচিত ছিল)।

অন্যদিকে যেকোনো মূল্যে রাখাইন রাজ্যের রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ন রাখতে মরিয়া জান্তা সরকার। ২৯ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার রাজধানীর পাশের সিতওয়ে বন্দরের দিক থেকে নিক্ষিপ্ত বোমা শহরের পশ্চিমের একটি বাজারে আঘাত হানে। সরকারবিরোধী আরাকান আর্মির বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বোমাটি সরকারি সেনারা সিতওয়ে বন্দরের কাছেই নোঙর করা একটি যুদ্ধজাহাজ থেকে নিক্ষেপ করেছে, যা কেড়ে নিয়েছে ১২ নিরীহ নাগরিকের জীবন। এতে হতাহতের সংখ্যা দাঁড়ায় আশির ঘরে। অন্যদিকে জান্তা নিয়ন্ত্রিত টিভি চ্যানেল দাবি করেছে, এ বোমা নিক্ষেপ করেছে সরকারবিরোধী আরাকান আর্মির সেনারা। তথ্যমতে, রাখাইনের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র পালতোয়া, পানানগুনসহ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শহর দখলের পর আরাকান আর্মির নজর এখন রাজধানী সিতওয়ের দিকে। তবে কতজনের প্রাণের বিনিময়ে সিতওয়ে দখল কিংবা রক্ষা হবে, তা নিয়ে শঙ্কিত বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ।


রাখাইনের চলমান যুদ্ধে রোহিঙ্গারা মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটির মতে, প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা ২০১৭ সালের গণহত্যার পর থেকে নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাখাইনের বিভিন্ন স্থানে বাস্তুহারা শিবিরে থাকতে বাধ্য হয়েছিল। এর মধ্যে যত্রতত্র যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় এসব বাস্তহারা আরও সংকটে পতিত হয়েছে। সংকটের ব্যাপকতা তুলে ধরতে গিয়ে এক রোহিঙ্গা গ্রামবাসী বলেন, তার গ্রামে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই ৪২ জনের জানাজা হয়েছে। তবে তিনি কেবল তার ছেলের (৪২) জানাজায় অংশ নিতে পেরেছিলেন। বাকি সময় জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বেড়ান। মৃতদেহ কম্বলে মুড়িয়ে গ্রাম ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয় অনেকে। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া গণহত্যার পর ধাপে ধাপে ৭ লাখ রোহিঙ্গা রাখাইন ছেড়ে বিভিন্ন দিকে চলে যায়। আর ৬ লাখ রোহিঙ্গা রাখাইনেই চলাচলে নিয়ন্ত্রণসহ নানা কারণে অমানবিক জীবন যাপন করতে থাকে।

নতুন করে যুদ্ধের তীব্রতা তাদের জন্য জীবনমরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারবিরোধী আরকান আর্মির বোমা হামলা নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে সামরিক জান্তা। আবার জোরপূর্বক গ্রাম বা ক্যাম্প থেকে তুলে নিয়ে মাত্র দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে তাদের লেলিয়ে দেওয়া হচ্ছে কিংবা বাধ্য করা হচ্ছে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। অতিসম্প্রতি নাগরিকত্ব কার্ড, রসদ ও ভাতা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে লুকিয়ে থাকা সামর্থ্যবান রোহিঙ্গা নারী-পুরুষকে মিয়ানমার সরকারি বাহিনীতে যোগ দিতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। রাখাইনের রোহিঙ্গারা বর্তমানে যেকোনো মূল্যে কেন্দ্রের চাপিয়ে দেওয়া শাসনের অবসান ও নিজেদের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট রয়েছে। আর কেন্দ্র থেকে সামরিক জান্তা যেকোনো পন্থায় আরাকানে আবারও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সীমান্তের ওপারে ও সীমান্তরেখায় এমন পরিস্থিতি আমাদের জন্য শঙ্কা ও দুশ্চিন্তার কারণ।

ইতোমধ্যে আরাকান আর্মি আমাদের বিপরীতে থাকা সরকারি সীমান্ত শিবিরগুলো দখল করেছে। আবার এসব সীমান্ত শিবির থেকে আরাকান আর্মিকে তাড়িয়ে দিতে আকাশ থেকে জঙ্গিবিমান ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে বোমা ও গুলি বর্ষণ করছে সরকারি জান্তা। এ সময় বোমা ও গুলির কারণে সীমান্তে বাংলাদেশিদের জীবনজীবিকা, শিক্ষাদীক্ষাসহ স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। শঙ্কার কারণ হলো যেকোনো সময় যেকোনো উপায়ে সাধারণ রোহিঙ্গা কিংবা রোহিঙ্গাবেশে আরাকান আর্মির সদস্যরা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরের বেকার ও অতি উৎসাহী তরুণ-যুবকরা সরকার বা আরাকান আর্মির ফাঁদে পা দিতে এবং হাতে অস্ত্র তুলে নিতে পারে। তাদের কারণে বাকি রোহিঙ্গারা প্রতিপক্ষের প্রতিহিংসার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

মিয়ানমার সংঘাত নিয়ে নিকট অতীতে এ স্তম্ভেই লিখেছিলাম বিদ্যমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক দূরদর্শিতার আরও সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রগুলোর অভিভাবক হিসেবে জাতিসংঘকে পূর্বতনসহ বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত ওয়াকিবহাল রাখতে হবে এবং প্রয়োজনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আলোচনার প্রস্তাব দিতে হবে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে জাতিসংঘকে এ এলাকায় শান্তিরক্ষা কার্যক্রম চালুর আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক প্রস্তাবও দেওয়া যেতে পারে। মিয়ানমারের জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মুসলমান বিধায় ওআইসিসহ মুসলিমপ্রধান দেশগুলোকেও নিয়মিত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার একই সঙ্গে বেশ কিছু আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক জোটে যুক্ত। এসবের মধ্যে রয়েছে আসিয়ান, এশিয়ান রিজিওনাল ফোরাম (এআরএফ), বিমসটেক ইত্যাদি। অর্থনৈতিক কারণে মিয়ানমারকে নির্ভর করতে হয় বেশ কিছু আন্তর্জাতিক আর্থিক ও দাতা সংস্থার ওপর। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে কূটনীতির নতুন কর্মকৌশল প্রণয়ন করে এগোনো বাঞ্ছনীয় মনে করি।

উল্লিখিত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামের সঙ্গে ব্যাপক সংযোগ স্থাপন করে সমস্যার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি সমাধান অনুসন্ধানের জন্য আরও জোরালো পদেক্ষপ নিতে হবে। মনে রাখা আবশ্যক, সংঘাতসংকুল রাখাইন রাজ্যের সমস্যা একাধারে মিয়ানমারের পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারত ও বাংলাদেশেরও। চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলসহ অনেক রাষ্ট্রের বহুমাত্রিক স্বার্থ রয়েছে মিয়ানমার ঘিরে। তাই বাংলাদেশকে একক সমাধানের বদলে যুগপৎ সমাধানের পথে হাঁটা সঠিক মনে করি। আমরা আস্থা রাখি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের গভীর প্রজ্ঞা নিশ্চয়ই বাংলাদেশকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাযথভাবে চালিত করবে। গোয়েন্দা নজরদারি সার্বক্ষণিক সতর্কতা ও সজাগ থেকে চালাতে হবে। মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যেসব সামরিক-বেসামরিক লোকের অনুপ্রবেশ বাংলাদেশে ঘটেছে তাদের ফেরত পাঠাতেও চালাতে হবে জোরদার তৎপরতা। বাংলাদেশ স্পষ্টতই প্রতিবেশীর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে না বরং সৃষ্ট পরিস্থিতিতে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে, যা অন্য অনেকেই করেনি। মিয়ানমারের গৃহদাহের তাপ যাতে আমাদের জন্য উপসর্গ আরও কঠিন করে তুলতে না পারে, সেদিকে দৃষ্টি গভীর রাখতে হবে।

মিয়ানমারে বিদ্যমান সংকট নিরসনে বিশ্বসম্প্রদায়ের ভূমিকা নেওয়া উচিত। প্রতিবেশীর অভ্যন্তরীণ সংকটে বাংলাদেশকে যে মূল্য দিতে হচ্ছে তা-ও তাদের অনুধাবন করা উচিত। তারা এ ব্যাপারে শুধু আশ্বাস কিংবা প্রতিশ্রুতিই দিচ্ছে, কিন্তু কার্যত কাজের কি কিছু করেছে কিংবা করছে? সীমান্ত নিরাপত্তায় আরও সতর্ক অবস্থানের পাশাপাশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সজাগ থাকতে হবে। যেকোনো পক্ষের কাছে গোপনে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের জন্য আন্তর্জাতিক মাফিয়া গোষ্ঠী ও অস্ত্র ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের জল-স্থল ভাগের সীমান্ত এলাকা বেছে নিতে পারে। সব আশঙ্কা মাথায় রেখেই আমাদের সীমান্তে নিরাপত্তা প্রযুক্তিনির্ভর করে নতুনভাবে সাজাতে হবে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ফোরামের এবং বন্ধুরাষ্ট্রের বিশেষত চীন ও ভারতের যেকোনো সহায়তার জন্য সদাতৎপর থাকার কোনো বিকল্প নেই। সামরিক ও কূটনৈতিক দক্ষতার সমান্তরাল সাফল্যে রাখাইন সীমান্তে জঙ্গিবিমানের বদলে শান্তির পায়রা উড়ুক- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

  • অবসরপ্রাপ্ত মেজর, নিরাপত্তা-বিশ্লেষক ও গবেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা