কৃষি খাত
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৪ ০৯:১৬ এএম
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রায় একশ বছর আগে শরৎচন্দ্রের মহেশ গল্পের গফুর রাতের অন্ধকারে গ্রাম
ছেড়ে পালিয়ে চলে গিয়েছিল শহরে। কাজ নেবে সে পাটের কলে। কিছুতেই যেতে চায়নি। পাটের কলের
কুলিবস্তিতে তার মাতৃহীনা একমাত্র সন্তান আমিনার ইজ্জত বাঁচবে না বলে তার গভীর শঙ্কা
ছিল। তবু যেতে হলো, কারণ ব্রাহ্মণ-জমিদার-শাসিত গ্রামে সে ভয়ংকর এক অপরাধ করে ফেলেছে,
সে গরু হত্যা করেছে। গরুটা অন্য কারও নয়, তার নিজেরই; গরুর নাম রেখেছে সে মহেশ। মহেশ
গফুরের অতি আপনজন। গফুরদের পূর্বপুরুষ ছিল তাঁতি; সেই তাঁত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এসে
গিলে খেয়েছে, গফুরকে তাই কৃষক হতে হয়েছে। কিন্তু চাষবাসে যে উপকরণ লাগে তা তার নেই।
জমি নেই, লাঙলটা গেছে ভেঙে, ভরসা ছিল মহেশের ওপর, সে এখন বৃদ্ধ। গ্রামে ভীষণ খরা। পানীয়
জলের অভাব। দূরের টিউবঅয়েল থেকে জল আনতে আমিনার অনেক কষ্ট, গা বাঁচিয়ে চলতে হয়, ছুঁয়ে
দিলে হিন্দু মহিলাদের জাত যাবে। গ্রীষ্মের ভরদুপুরে এক কলসি জল এনেছিল; অতিশয় তৃষ্ণার্ত
মহেশ সে জল খেতে গিয়ে আমিনার কলসি দিয়েছে ভেঙে। রাগে, অভিমানে, দুঃখে অন্ধ গফুর তার
ভাঙা লাঙলের ফালটা এনে মেরেছে মহেশের মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে মহেশের মৃত্যু এবং তারপর গ্রাম
ছেড়ে গফুরের পলায়ন।

সেকালের গফুরের তবু ভরসা ছিল পাটকলে। গফুর পশ্চিমবঙ্গের লোক, বাস
কলকাতার কাছেই। রাজধানী কলকাতার আশপাশে তখন অনেক পাটকল। পাট যেত পূর্ববঙ্গ থেকে, কল
ছিল কলকাতায়। দেশভাগের আগে ও পরেও পূর্ববঙ্গের বিক্রয়যোগ্য সম্পদ বলতে ছিল ওই পাটই।
কিন্তু সে পাটের বিক্রির সুফল পূর্ববঙ্গ পেত না, সেটা চলে যেত করাচিতে, তারপর গেল রাওয়ালপিন্ডিতে।
রাওয়ালপিন্ডিতে নতুন একটা রাজধানীই বানানো হয়েছিল, তাতে অংশ ছিল পাট বেচা টাকার। পাটের
টাকা সমরাস্ত্র কেনায়ও লাগল, একাত্তরে সে অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে হতভাগ্য পূর্ববঙ্গেই।
গফুর পশ্চিমবঙ্গের লোক বলে তবু যা হোক পাটকলে কাজ পেয়েছে, যদি এখনকার পূর্ববঙ্গের বাসিন্দা
হতো তবে তা-ও পেত না। পাট আছে, অথচ পাটকল নেই, এ ফাঁকা অবস্থায় সাতচল্লিশের পর পূর্ববঙ্গে
কয়েকটি পাটকল তৈরি হয়েছিল; ভালো মুনাফা হবে জেনে বিখ্যাত সেই বাইশ পরিবারের দু-তিন
জন অর্থ বিনিয়োগ করেছিল পাটশিল্পে। ভালো মুনাফা আসছিল। আমাদের আদমজী পড়ে গেল; কিন্তু
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল সীমান্তের ওপারে, পশ্চিমবঙ্গে নতুন নতুন পাটকল খোলার রীতিমতো
ধুম। পাট কিন্তু যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকেই। যেন সেই পুরোনো ব্যবস্থাÑকাঁচামাল এধারের,
কারখানা ওধারে।
স্বাধীন বাংলায় দেখা গেল পাটকলগুলো একে একে হয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, নয়তো
চলে যাচ্ছে বেসরকারি মালিকানায়। বোঝা গেল পুঁজিবাদ এখন মুক্তি পেয়েছে, সে কোনো বাধা
মানবে না, তার নির্মম তৎপরতা সে দেখাবে। রাষ্ট্রীয় কারখানা যে প্রাইভেট হবে এটা ছিল
সরকারি নীতি, স্বাধীনতার পর কয়েকবার সরকার বদল হয়েছে কিন্তু নীতির কোনো বরখেলাপ হয়নি।
রাষ্ট্রীয় শিল্পকারখানা ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরে কিন্তু মুখ্য ভূমিকা নিল তারাই
যাদের ওপর দায়িত্ব ছিল সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের। বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের কর্তব্যক্তিদের
কেউ নগদ টাকা ঘুষ পেল, কেউ বা পেল কলের মালিকানা; ভালোমানুষ যারা অল্পস্বল্প ছিলেন
তারা দেখলেন নয়ন ভরে। নদী খেপে উঠেছে, পাড় ভাঙবে, সামলায় কার সাধ্য? স্বাধীনতার পর
এমনও শুনেছি যে পাটের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই, হাঁটবে একদা-বিখ্যাত সেই নীলের পথেই। কিন্তু
পড়ে যায়নি, টিকে গেছে, কারণ পাটের গুণ আছে। পাট প্রকৃতিবান্ধব। তার বিপরীতে পলিথিন
ও প্লাস্টিক প্রকৃতির সঙ্গে শত্রুতা করে, অনবরত। আর পাট থেকে যে কেবল চট-ছালা তৈরি
হয় তা তো নয়, কার্পেট হয়, কাপড় হয়, আসবাবও হয়। পাট তাই পড়ে যায়নি। অন্য দেশেও এখন বিলক্ষণ
পাটের চাষ চলছে। তবু বিশ্বের শতকরা ৫০ ভাগ পাট এখনও বাংলাদেশেই উৎপন্ন হয়। তবে অন্যান্য
দেশ তাদের পাট বিদেশে রপ্তানি করতে চায় না, ভারত তো রপ্তানি করেই না; বাংলাদেশ করে।
বিশ্বে এ এক বিরল ঘটনা যে একটি দেশ তার নিজের দেশের কাঁচামাল নিজের কাজে না লাগিয়ে
ভিনদেশে পাঠাচ্ছে। বেশিরভাগ পাটই রপ্তানি হয় আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু ও বৃহৎ প্রতিবেশী
ভারতে। ভর মৌসুমে ভারত সস্তা দরে পাটের সর্বোৎকৃষ্ট চালানটি নিয়ে যায়; বাংলাদেশের
জন্য পড়ে থাকে নিকৃষ্টতম অংশ, যা দিয়ে উৎকৃষ্ট পণ্য উৎপাদন অসম্ভব। কিন্তু এ ক্ষেত্রে
রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা কতোটা আছে?
২
পাকিস্তান আমলের জমজমাট পাটশিল্প এখন মোটামুটি ধ্বংসের পথেই। সাতচল্লিশে যখন ভাগ হলো দেশ তখন অনেকেই মনে করেছিল পূর্ববঙ্গ টিকবেই না। কী করে টিকবে? তার শিল্পকারখানা কোথায়? ভরসা ছিল ধান ও পাটেই। ধান থেকে খোরাকি জুটবে, পাট থেকে আসবে কাঁচা পয়সা। তা পাটের পয়সা পাওয়ার ক্ষেত্রে তেমন সুবিধা না হলেও ধান ঠিকই বাঁচিয়েছে আমাদের। তার মূল কারণ কিন্তু প্রকৃতি নয়, মূল কারণ চাষির শ্রম। আর ওই যে পাটের ফলন তারও মূল কারণ চাষির শ্রমই। একাত্তরের স্বাধীনতার পর মার্কিনিরা বলেছিল, বাংলাদেশ হবে একটি তলাবিহীন ঝুড়ি, অন্য অনেকেই মৃদু হেসে ঘাড় নেড়েছে; তবু দেশটি যে তলিয়ে যায়নি এবং এক ধরনের উন্নতিও করেছে তার কারণও চাষির ওই শ্রম। দূর দূর দেশে গিয়ে যারা অমানবিক পরিশ্রম করে এবং খেয়ে-না-খেয়ে দেশে টাকা পাঠায় তাদেরও অধিকাংশই কৃষক পরিবারের সন্তান। একাত্তরে এরা যুদ্ধ করেছে। পঁচিশে মার্চের পর হানাদাররা আমাদের বড় শহরগুলো দ্রুতই দখলে নিয়ে নিতে পেরেছিল; তারা বিপদে পড়েছে যখন গ্রামে হানা দিয়েছে। হানাদারদের পরাজয়ের ভিত গ্রামেই তৈরি হয়েছিল, আত্মসমর্পণের অতিক্ষুদ্র নাটকটি যদিও মঞ্চস্থ হয়েছে রাজধানীতে। যে ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছে এর অধিকাংশই কৃষক ও কৃষকের সন্তান। যে ৩ লাখ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছে তারও বেশিরভাগ মেহনতিদের বউ-ঝি। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ায় কৃষকের যে ভাগ্য খুলেছে তা মোটেই নয়। হ্যাঁ, ধনী কৃষকের সুবিধা হয়েছে, তারা নিঃস্ব হয়ে-যাওয়া গরিব কৃষকের জমি অল্প দামে কিনে নিয়েছে, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছে কৃষিতে, যন্ত্রপাতি কিনেছে এবং সেগুলো ভাড়াও দিতে পেরেছে মধ্য ও গরিব কৃষকের কাছে।
কৃষি কিন্তু ইতোমধ্যে শিল্পে পরিণত হয়ে গেছে। সেখানে পুঁজি ও প্রযুক্তি খাটছে। লাঙল ও গরুতে আর কুলায় না। ধান যে ঢেঁকিতে পা দিয়ে ঘরের বউ-ঝিরা ভানবে সে উপায় নেই। খোরাকির ধান অন্য কথা, অন্য ধান বিক্রি হয় বাজারে। গরিব কৃষক অতি দ্রুতগতিতে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। কেননা ঘরে তার নগদ টাকা নেই, বউ-ঝির শাড়িকাপড় থেকে শুরু করে চিকিৎসার ব্যয়, ঋণ শোধের দায় সবকিছুই অপেক্ষমাণ থাকে ধান বিক্রির জন্য। মিলের মালিকরা পুঁজিপতি। ধান তাদের জন্য কাঁচামাল। সে কাঁচামাল থেকে নানা রকমের ধান বের হয়। খুদ-কুঁড়া-ভুসি কোনো কিছু ফেলনা নয়, সবকিছু থেকেই বাণিজ্য পণ্যের উৎপাদন ঘটে। কৃষিতে এখন জমিদার-জোতদার নেই, আছে পুঁজির মালিক। পুঁজিবাদ কোনো ফাঁক রাখছে না। কৃষকের সর্বনাশ ঘটিয়ে পৌষ মাস সম্ভব করছে মিল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীদের জন্য। মিলের মালিক এবং গরিব কৃষকের ভেতর আজ যে সম্পর্কটি প্রকট হয়ে উঠেছে, সে সম্পর্কটিই কিন্তু পুনরুৎপাদিত হচ্ছে সমাজের সব ক্ষেত্রে। আমাদের মনোজগতেও ওই সম্পর্কের স্থায়ী অধিষ্ঠান। নানা রূপে, রঙে ও ভঙ্গিতে।