পর্যবেক্ষণ
অজয় দাশগুপ্ত
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৪ ১১:৩৯ এএম
ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালত শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের করা মামলায় গ্রামীণ টেলিকম চেয়ারম্যান ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ চারজনকে ছয় মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছেন। সেই সঙ্গে প্রত্যেককে ৩০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। তবে রায় ঘোষণার পর উচ্চ আদালতে আপিল করার শর্তে চারজনই এক মাসের জন্য জামিন পেয়েছেন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এটা বড় সম্মান। দেশবিদেশে তার খ্যাতি-সুনাম রয়েছে।
তাকে ১ জানুয়ারি (২০২৪) কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায় জানার সঙ্গে আবেদন করায় তিনি জামিন
পেয়েছেন। ওই সময়ে বাংলাদেশে বিএনপি ঘোষিত যে ‘অসহযোগ আন্দোলন’ চলছিল, তাতে আহ্বান ছিলÑ
কেউ আদালতের কার্যক্রমে অংশ নেবেন না। বাদী-বিবাদী, আইনজীবী ও বিচারপতি সবার জন্য এটা
প্রযোজ্য। ড. মুহাম্মদ ইউনূস কিংবা তার মামলায় সংশ্লিষ্ট অন্যরা ‘অসহযোগ আন্দোলনের
প্রহসনে’ সাড়া দেননি, এটা ভালো খবর। এমনটি করা হলে জামিনের আবেদন করা যেত না। ১৯৭১
সালের মার্চে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ
আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিসহ
অন্য বিচারপতিরা। এ কারণে ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ হিসেবে পরিচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল
টিক্কা খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে শপথ নিতে পারেননি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের
মামলা চলাকালে এমনটিও ঘটেনি।
সম্প্রতি ১২ জন
মার্কিন সিনেটর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হয়রানি না করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে
একটি চিঠি দিয়েছেন। ড. ইউনূস নারীর ক্ষমতায়নের জন্য বহু দশক ধরে কাজ করছেন। প্রশাসন,
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ সমাজের নানা ক্ষেত্রে এখন নারীর দৃপ্ত
পদচারণ দেখছি। ১২ জন মার্কিন সিনেটর শেখ হাসিনাকে ‘ক্ষমতায়িত নারী’ হিসেবে নয়, চিঠি
দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। অথচ ড. ইউনূসের মামলায় দণ্ড ঘোষণা করেছেন বিচার বিভাগ।
তাকে জামিন দিয়েছেন বিচার বিভাগ। এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে তিনি লড়বেন। ঠিক এ বিষয়টির
প্রতিই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিনউদ্দিন। তিনি বলেছেন,
‘মার্কিন আইনপ্রণেতাদের বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা দুর্ভাগ্যজনক।’
তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘লবিস্ট’ সম্পর্কে যাদের ধারণা রয়েছে, তারা বলবেন, সেখানে
অনেক সময় ‘টাকা কথা বলে’। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের কোনো ব্যক্তি, কোনো প্রতিষ্ঠান
কিংবা কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো সুবিধা আদায় করতে চাইলে তদবিরের জন্য
লবিস্ট নিয়োগ করতে পারে। তারা ন্যায়-অন্যায় ভুলে মক্কেলের পক্ষে দাঁড়াবেন, এটাই স্বাভাবিক।
এটা অনেকটা আইনজীবীদের কাজের মতো। মামলায় আইনজীবীরা পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেন। প্রকাশ্যে
সংঘটিত গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও অপরাধীর পক্ষে আইনজীবীরা সওয়াল করেন। এ ক্ষেত্রেও
বলা যায়, ‘মানি স্পিকস’।
ড. ইউনূস বিচারিক
প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায়। বাংলাদেশে শ্রম আইন বিশেষভাবে
আলোচিত হয় পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রে। লাখ লাখ শ্রমিক এখানে কাজ করে। পোশাক কারখানায় কাজের
পরিবেশ ও শ্রম অধিকার সব সময় মানা হয় না, এমন অভিযোগ রয়েছে। তবে যেদিন ১২ জন মার্কিন
সিনেটর ড. ইউনূসের প্রতি সুবিচারের অনুরোধ জানিয়েছেন, একই দিনে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা
বা আইএলও জানিয়েছে, বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতে পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার
উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আরও উন্নতি দরকার এবং পোশাক শিল্পের বাইরেও
প্রসারিত হওয়ার তাগিদ রয়েছে। আইএলও এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠন ও শ্রম অধিকার রক্ষায়
সংশ্লিষ্টরা বিষয়টির প্রতি সর্বক্ষণ নজর রাখবেন, এটাই প্রত্যাশা।
আইএলও যে গবেষণা
কাজের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের শ্রম ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিষয়ে ইতিবাচক
অভিমত দিয়েছে, তার অর্থের জোগান দিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েকটি
দেশে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে শ্রম অধিকার কখনও কখনও উপেক্ষা হয়, এমন অভিযোগ রয়েছে।
আইএলওর প্রতিবেদন এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে স্বস্তি দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ১২ জন সিনেটর
এ গবেষণা কাজ খতিয়ে দেখতে পারেন। তারা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের কর্মপদ্ধতিও অবহিত
হতে পারেন। এখানে মার্কিন দূতাবাস সক্রিয়। রাষ্ট্রদূত পিটার হাস আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। তিনি জানেন ড. ইউনূসের বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে প্রকাশ্য
আদালতে। দুর্নীতি দমন কমিশনের কাজ সম্পর্কেও তিনি অবহিত। তার স্বদেশের সিনেটরদের আবেদনে
অসঙ্গতি কোথায়, তা তিনি তাদের জানিয়ে দিতে পারেন। অন্যথায় তারা অভিযুক্ত হতে পারেন,
না জেনে-বুঝে কথা বলার জন্য।
শ্রমিকের অধিকার
বিষয়ে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুযায়ী বাংলাদেশের গ্রামীণ টেলিকমের কর্মীদের
পক্ষেই কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের থাকার কথা। সিনেটররা বাংলাদেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার
অপব্যবহারের অভিযোগ এনেছেন। বলেছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচারব্যবস্থার ব্যবহার এবং
এভাবে সরকারের সমালোচকদের টার্গেট করা হচ্ছে। এটাও বলা হয়েছে, গত এক দশকে ড. ইউনূসের
বিরুদ্ধে ‘নথি-প্রমাণহীন দেড়শ’র বেশি মামলা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে চলা মামলায় অনিয়মের
বিষয়ে বিভিন্ন দায়িত্বশীল মহল প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলেছেন, ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে ড.
ইউনূসের অগ্রণী কর্মকাণ্ড বাংলাদেশসহ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জন্য বৃহত্তর অর্থনৈতিক
প্রতিশ্রুতির সুযোগ করে দিয়েছে।
সেনাশাসক জিয়াউর
রহমান ও খালেদা জিয়ার শাসনামলে এক যুগের বেশি বাণিজ্য ও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন
করেছেন এম সাইফুর রহমান। তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে লিখেছেন, ‘গ্রামীণ
ব্যাংক গরিবদের জন্য যে ঋণ দেয় তার চেয়ে অনেক বেশি ঋণ দেয় সরকার নিরাপদ বেষ্টনী কর্মসূচির
মাধ্যমে। ... বাংলাদেশে শত শত এনজিও মাইক্রোক্রেডিট প্রকল্পে কাজ করে। এই অর্থ দেয়
পল্লী কর্মসংস্থান প্রকল্প ও বাংলাদেশ ব্যাংক।’ [কিছু স্মৃতি কিছু কথা : পৃষ্ঠা ২০১-২০২]
সাইফুর রহমান এখন মন্ত্রিপদে নেই। এ সময়ে সরকারের সামাজিক নিরাপদ বেষ্টনী বা সোশ্যাল
সেফটি নেটওয়ার্ক ও ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচি বহুগুণ বিস্তৃত হয়েছে। বেড়েছে ভাতার পরিমাণ
ও সুফলভোগীর সংখ্যা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে
১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৭ শতাংশ।
মার্কিন সিনেটরদের
বিষয়টি ভালোভাবে অবগত করায় ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস উদ্যোগী হতে পারে। তারা এও জানাতে
পারে যে, ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহীতারা যেমন এ ঋণের সুফল ভোগ করে, তেমন তাদের চড়া হারে সুদ
দিতে হয়। একবার ঋণের ফাঁদে পড়লে সেখান থেকে বের হয়ে আসা কঠিন। লাখ লাখ গ্রহীতা জানায়,
গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ নিয়ে তারা ‘আশা’র ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে, আশার ঋণ নিয়ে প্রশিকার
ঋণের কিস্তি দেয়। কোনো কারণে এক এনজিওর ঋণ সময়মতো না পেলে অন্য এনজিও থেকে বিপদের শঙ্কা
দেখা দেখা দেয়।
মার্কিন সিনেটররা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচারব্যবস্থার ব্যবহার এবং ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে নথি-প্রমাণহীন দেড় শতাধিক মামলা দায়েরের অভিযোগ এনেছেন। মামলা চলছে প্রকাশ্যে এবং ড. ইউনূস আয়করসংক্রান্ত একটি মামলায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পর দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে অর্থ পরিশোধ করেছেন। আর কী নথি-প্রমাণ চাইছেন সিনেটররা?
ওয়াশিংটনভিত্তিক
উইলসন সেন্টারের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান গ্রামীণ টেলিকম
বিষয়ে মামলা চলাকালে বিবিসিকে বলেছেন, ড. ইউনূস একজন সেলিব্রিটি। সে কারণে বিশ্বজুড়ে
অনেক প্রভাবশালী তার বন্ধু। তিনি বিভিন্ন সময় তার পক্ষে অনেককে এক জায়গায় আনতে পারেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিক্স অ্যান্ড
গভর্নমেন্টের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রীয়াজ বলেছেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও সুশাসনের
অভাব রয়েছে। এ কারণে তিনি ন্যায়বিচার পাবেন না বলে আন্তর্জাতিক মহলের একটি অংশের ধারণা।
যুক্তরাষ্ট্রের
সাবেক রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার অভিযোগ করেছেন, তিনি কিছু আদালত থেকে ন্যায়বিচার
পাবেন না। সম্প্রতি নিউ হ্যাম্পশায়ারে অনুষ্ঠিত প্রাইমারি প্রসঙ্গে তিনি অবাধ ও সুষ্ঠু
নির্বাচনের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সুষ্ঠু নির্বাচন
প্রয়োজন। মার্কিন ১২ সিনেটর এ বিষয়ে কী বলবেন?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
থেকে কেউ কেউ বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে শেখ হাসিনার ওপর চাপ
সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়েছিলেন এবং এজন্য ড. ইউনূসের ইস্যু ব্যবহার করা হয়েছে, এমন অভিমত
ছিল। একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কি এমনটি করতে পারেন? তা ছাড়া নির্বাচনের পর বিএনপি
এবং তাদের মিত্ররাও এ মূল্যায়ন করছে, যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনার ওপর চাপ সৃষ্টি করে
বিএনপির জন্য সুবিধা করে দেবে এবং এমনকি নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতায়ও এনে দিতে পারে; এমন
ভরসা করা ছিল মারাত্মক ভ্রম।
বিএনপি এ ভ্রান্তিতে
পড়ে ফেঁসে গেছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের কেউ কেউ এখনও ভ্রমজগতে থাকতেই
পছন্দ করেন।