স্মরণ
অসিত বরণ রায়
প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ ১২:০০ পিএম
কমরেড মণি সিংহ
কিংবদন্তি বিপ্লবী কমরেড মণি সিংহের নামের সঙ্গে
জড়িত হয়ে আছে টঙ্ক আন্দোলন। ১৯৯০ থেকে ২০২৩Ñ ৩৩ বছর আগে কমরেড মণি সিংহ মৃত্যবরণ
করেন। কিন্তু এ দেশের মানুষের কাছে আজও জীবন্ত হয়ে আছে তার রেখে যাওয়া আদর্শ, কর্ম
ও স্বপ্ন। কমরেড মণি সিংহের দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, নিষ্ঠা, একাগ্রতা আমাদের এখনও
অনুপ্রাণিত করে। যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন যৌবনে, মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তার থেকে
একটুকুও বিচ্যুত হননি। নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া শেষে শুরু হয় কমরেড মণি সিংহের
নেতৃত্বে টঙ্ক আন্দোলন। টঙ্ক মানে ধান কাড়ারি খাজনা। ফসল হোক বা না হোক, কাড়ার যত
ধান তা দিতে হবে। টঙ্ক জমির ওপর কৃষকের কোনো স্বত্ব ছিল না। কলমাকান্দা,
দুর্গাপুর, হালুয়াঘাট, নালিতাবাড়ী, শ্রীবর্দী উপজেলায় টঙ্ক প্রথার প্রচলন ছিল।
বিশেষ করে সুসং দুর্গাপুরের জমিদারের এলাকায় প্রচলিত ছিল ব্যাপকহারে। এ
সামন্ততান্ত্রিক শোষণব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিশাল পাহাড়ি এলাকা জুড়ে দীর্ঘ ১২ বছর
প্রতিবাদ আন্দোলন সংঘটিত হয়। ১৯৫০ সালে দীর্ঘ সংগ্রামের পর টঙ্ক প্রথা বিলুপ্ত হয়।
স্বীকৃত হয় জমিতে কৃষকের স্বত্ব।
এ দেশের স্বাধীনতার আগে ও পরে যত আন্দোলন হয়েছে, তার
প্রতিটি সংগ্রামে অন্যতম ভূমিকা রেখেছেন কমরেড মণি সিংহ। মানবমুক্তির লড়াই সংগ্রাম
এক অবিচ্ছিন্ন ধারা। সে ধারার সঙ্গে কমরেড মণি সিংহ ছিলেন আজীবন। মানুষের
অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতীক ছিলেন মণি
সিংহ। তার চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-জ্ঞান ছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের। তিনি প্রতিনিয়ত
ভাবতেন বৈষম্যমুক্ত সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ। তিনি ছিলেন ভারত উপমহাদেশের বরণীয়, পূজনীয়,
সবার শ্রদ্ধেয় অবিস্মরণীয় নেতা। ষাটের দশকের প্রথম দিকে জাতীয়তাবাদী সংগ্রামী নেতা
বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার বৈঠক হয়। সেদিন
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আপনার কথা আমি মেনে
নিলাম। কিন্তু আমি বাংলার স্বাধীনতাই চাই।’ ওই বৈঠকের পরই পাকিস্তান সরকারের ভিত
কেঁপে ওঠে। শুরু হয় বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন। তারপর ছয় দফা আন্দোলন। এর পরে ঊনসত্তরের
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম।
নেত্রকোণার সুসং দুর্গাপুর থেকে যখন দেখা করতে
নেতানেত্রীরা আসতেন, তিনি খুব খুশি হতেন। বিশেষ করে দুর্গাপ্রসাদ তেওয়ারী যখন
আসতেন তার কাছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দুর্গাপুরের গল্প শুনতেন। সুসং দুর্গাপুরের থানাটা
সোমেশ্বরী নদীর পারে। এ নদীতে শুকনো মৌসুমে জল থাকত না, শুধু পাহাড়ি বালি। তার মধ্যে
ছোট ছোট নালা দিয়ে স্বচ্ছ জলের তীব্র স্রোত বয়ে যেত। আর বর্ষা মৌসুমে নদী ভয়ানক
রূপ ধারণ করত। পাহাড়ি চন্দন, গজারি কাঠ ভেসে আসত। কখনও কখনও হাতিও ভেসে আসত। নদীতে
পাওয়া যেত অপূর্ব স্বাদের মাছ মহাশোল। দাদুর কাছে এ মহাশোলের গল্প শুনেছি (তাকে আমি
দাদু ডাকতাম)।
কমরেড মণি সিংহকে দেখতাম কোনো নেতা বাসায় এলে উঠে দাঁড়াতে। যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিলেন, তখনও দাদু তা-ই করতেন। উঠতে পারতেন না একা। আমি বিছানা থেকে উঠিয়ে দাঁড় করিয়ে দিতাম। দাদুর একসময় ডান হাত অবশ হয়ে গেল। কথা বন্ধ হয়ে গেল। তখনও দেখতাম দাদু বাঁ হাত দিয়ে টেনে আনতেন ডান হাত এবং নেতাদের সালাম দিতেন। পার্টি এবং পার্টির নেতাদের প্রতি দাদুর ছিল এরকম সম্মান যা আজ অনেক ক্ষেত্রে বিরল। তিনি সারাটা জীবন ব্যয় করেছেন নির্যাতিত, নিপীড়িত, শোষিত, মেহনতি মানুষের মুক্তির জন্য। ১৯৯০ সালের ৩১ ডিসেম্বর আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন তিনি। রেখে গেলেন সুদীর্ঘ এক বিপ্লবী অধ্যায়, যা অনুপ্রাণিত করবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে।