সম্পাদকীয়
সম্পাদক
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৩ ১০:৪৬ এএম
ব্যবসার উদ্দেশ্য
মুনাফা। এখন প্রশ্নÑ একটি পণ্যে কতটুকু মুনাফা করা যায়? তারও তো রয়েছে কিছু যুক্তি।
কিন্তু সেই যুক্তি কি মানা হয়? সোজা ভাষায় উত্তরÑ মানা হয় না। আর হয় না বলেই পণ্যমূল্য
বাড়ে দফায় দফায়। দাম বাড়ানোর এই কারসাজির পেছনে একদিকে রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগী, অন্যদিকে
সিন্ডিকেট। মাঝ থেকে জেরবার উৎপাদক ও ভোক্তার। ১৯ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশের একটি
সংবাদের শিরোনাম ‘ডিম পাড়ে হাঁসে খায় বাগডাশে’ সেই সত্যকেই স্পষ্ট করে। সংবাদটিতে একটি
পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয়েছে, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ১২ ডিসেম্বর
পর্যন্ত এক বছরের ব্যবধানে বেশকিছু কৃষিপণ্যের দাম বেড়েছে আড়াইগুণ বা আড়াইশ শতাংশ।
অথচ এসব পণ্যের উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম। তারপরও খুচরা পর্যায়ে পণ্যগুলো বিক্রি
হচ্ছে বেশ চড়া দামে। তার মানে কি বাজারে চাহিদার তুলনায় জোগান কম? না, তাও নয়। চাহিদা
ও জোগানের মধ্যেও নেই কোনো ফারাক। বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকেই
স্পষ্টÑ বাজারে কোনো পণ্যেরই ঘাটতি নেই। তারপরও অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ছে। এই বাড়ার পেছনের
অযৌক্তিক কাজটি দীর্ঘদিন ধরে করছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের (ডিএএম)
দেওয়া পণ্যের উৎপাদন ব্যয়, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিক্রির প্রতিদিনের একটি তালিকাও
উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়েছে, এক কেজি পেঁয়াজ
উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় ৩৩ টাকা ৪ পয়সা। প্রতিষ্ঠানটি বলছে এক্ষেত্রে, খুচরা পর্যায়ে পেঁয়াজের
কেজিপ্রতি যৌক্তিক মূল্য হবে ৩৬ টাকা। অথচ গত ১২ ডিসেম্বর পণ্যটি পাইকারি পর্যায়েই
কেজিপ্রতি বিক্রি হয়েছে ৭৫ থেকে ১৮০ টাকায়।
এ তো মাত্র একটি
পণ্যের উদাহরণ। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর তাদের তালিকায় এরকম ত্রিশটি পণ্যের মূল্য দেখিয়েছে।
আমাদের প্রশ্নÑ কৃষক পর্যায়ে যে পণ্যটির দাম ৩০-৩৫ টাকা, সেই পণ্যটি বাজারে প্রবেশ
করেই কী করে দামে কেজিপ্রতি দুইশ টাকা ছাড়ায়? এমনকি পাইকারি বাজার থেকে বেরিয়েই একটি
পণ্য কী করে পাশের খুচরা বাজারে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হয়? এর কারণ, মধ্যস্বত্বভোগীদের
কারসাজি। মধ্যস্বত্বভোগীদের এই দৌরাত্ম্যের কথা কারও অজানা নয়। আগেও ফড়িয়া হিসেবে পরিচিত
মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ে কম কথা হয়নি। কিন্তু তাদের দৌরাত্ম্য তো কমেইনি, মাঝ থেকে
করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই এই দলে নাম লিখিয়েছে। ফলে বাজার তার স্বাভাবিক চরিত্র
হারিয়েছে। এই মধ্যস্বত্বভোগী এবং সিন্ডিকেটেরই কবজায় এখন বাজার। তারাই বাজার ইচ্ছামাফিক
নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে পণ্য যখন কৃষক বা খামারির কাছে থাকে, তখন তারা দাম কমিয়ে দেয়।
আর পণ্য কৃষক ও খামারির হাতছাড়া হলে তারা নিজেদের খেয়ালখুশি মতো দাম বাড়ায়। এমনকি কৃষকের
যেখানে উৎপাদন খরচ ওঠাতেই হিমশিম খেতে হয়, সেখানে মধ্যস্বত্বভোগীরা কয়েকশ গুণ লাভের
মাধ্যমে নিজেদের আখের গোছায়।
সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে আক্ষরিক অর্থেই নাভিশ্বাস উঠেছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের। আমরা কিছুদিন আগেই আলুর বাজারে তেলসমাতি কাণ্ড ঘটতে দেখেছি। ডিম, মুরগি এমনকি মুরগির বাচ্চা নিয়েও দেখেছি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। আর মাত্র কয়েক দিন আগে পেঁয়াজ নিয়েও দেখা গেল তাদের নগ্ন চরিত্রের প্রকাশ। যার মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীরা মাত্র এক দিনেই হাতিয়ে নেয় কোটি কোটি টাকা। একজন কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে সচ্ছলতার মুখ দেখেন না। অথচ একজন মধ্যস্বত্বভোগী কোনো পরিশ্রম ছাড়াই শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণ করে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকা। এই অবস্থা বাজারের সব পণ্যে। মধ্যস্বত্বভোগী বড় বড় কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে আজ জিম্মি দেশের বাজার ব্যবস্থা। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। আমরা চাই এই অচ্ছেদ্য সিন্ডিকেট ভেঙে একটি স্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থা গড়ে উঠুক। যেখানে যৌক্তিক মুনাফা করার মাধ্যমে ব্যবসায়ী ব্যবসা করবেন। ভোক্তাও ন্যায্যমূল্য দিয়ে পণ্য কিনবেন। কৃষকও পাবেন তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য। আমরা চাই না বারবার হাঁসের ডিম বাগডাশে খেয়ে যাক। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, কবির সেই পঙক্তি, ‘সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা,/দেশ মাতারই মুক্তিকামী, দেশের সে যে আশা।’ আমরা কৃষকের বঞ্চনার ছবি দেখতে চাই না। আমাদের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির আশা কৃষক। কৃষক ও কৃষির সঙ্গেই আমাদের বাঁচা-মরা। কৃষককে বাঁচাতে তাই তার উৎপাদিত ফসলের নায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। কৃষক বাঁচলেই নিশ্চিত হবে আমাদের স্বনির্ভরতা ও সক্ষমতা।