প্রার্থীদের সম্পদ
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৩ ১০:০৯ এএম
আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৩ ১০:২৫ এএম
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েকটি ধাপ ইতোমধ্যে
সম্পন্ন হলেও চূড়ান্ত ধাপ সম্পন্ন হবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। নির্বাচনব্যবস্থা
কিংবা প্রক্রিয়াগত ত্রুটির অভিযোগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন কয়েকটি দলের নির্বাচনবিরোধী
অবস্থানের কারণে এই নির্বাচনের দিকে দেশ-বিদেশের নানা মহলের বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে এবং
এর সাক্ষ্য প্রায় নিত্যই মিলছে সংবাদমাধ্যমে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমরা এখন ‘ভুবনগ্রাম’-এর
বাসিন্দা। বিশ্বায়নের যুগে আঞ্চলিক সহযোগিতা তো বটেই, আরও বৃহৎ পরিসরে জোটগতভাবে কিংবা
অন্য প্রেক্ষাপটে দেশে দেশে সম্পর্কোন্নয়নের প্রচেষ্টা বিশেষভাবে দৃশ্যমান। এ দৃষ্টিকোণ
থেকে আমাদের নির্বাচনব্যবস্থা ও বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট বিদেশি নানা মহলেরও দৃষ্টি
কেড়েছে এবং ভূরাজনীতির মেরুকরণের সমীকরণে এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও চলছে।
নির্বাচন যেহেতু ক্রমেই এগিয়ে আসছে সেহেতু সংবাদমাধ্যমে নির্বাচনসংক্রান্ত খবরই প্রাধান্য পাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে নির্বাচনে অংশীজনের অর্থাৎ সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীদের ‘আমলনামা’ সংবাদমাধ্যমের বড় অংশজুড়ে থাকছে এবং তা সীমাহীন বিস্ময়ের সৃষ্টি করছে। শুধু বিস্ময়ই নয়, বরং বলা ভালো জনমনে ক্রমাগত ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছে এবং এরই প্রেক্ষাপটে জন্ম নিচ্ছে বহুবিধ জিজ্ঞাসাও। সংসদ সদস্য কিংবা মন্ত্রী পদে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন বা করছেন তাদের সম্পদের এত স্ফীতি নিশ্চয়ই প্রশ্নবোধক। হলফনামা নির্বাচন প্রক্রিয়ার আইনি একটি ব্যবস্থা। হলফনামায় প্রার্থীর উপস্থাপিত তথ্যে চোখ ছানাবড়া না হয়ে উপায় থাকে না। সরকারি কিংবা বিরোধী দল, অনেক প্রার্থীরই সম্পদ বৃদ্ধির অরুচিকর দৃশ্য ক্রমাগত দৃশ্যমান হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো সংসদ সদস্য কিংবা মন্ত্রীর সম্পদের চেয়ে তাদের স্ত্রীদের সম্পদ বহুগুণ বেশি! প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতা মানেই কি জাদুর কাঠির স্পর্শ? কিংবা আলাদিনের চেরাগ ছোঁয়া?

একজন সংসদ সদস্য শুধু জনপ্রতিনিধিই নন, মুখ্যত
তিনি আইনপ্রণেতা। সচেতন মানুষমাত্রই জানা আছে, সংসদ সদস্য কিংবা মন্ত্রীর পদ ও রাজনীতি
অলাভজনক। কিন্তু সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন দাঁড়ায়, এ অলাভজনক অধ্যায়ে লাভের এত ছড়াছড়ি হলো
কীভাবে! আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, ‘পদপদবি’র জোরে ব্যক্তি নিজে তো বটেই, পরিবারের সদস্য
বা পরিজনও নানা ক্ষেত্রে ‘ফুলে ফেঁপে’ ওঠেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক তিন মেয়াদের
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’র অঙ্গীকারের কথাও অজানা নয়। কিন্তু
এ ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’র বেষ্টনী ডিঙিয়ে কীভাবে মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদের এত স্ফীতি ঘটল?
দুর্নীতি দমনে দেশে দুর্নীতি দমন কমিশন অর্থাৎ দুদক নামে যে প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে সেই
প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা কিংবা এখতিয়ার নিয়ে দুর্মুখেরা নানা কথাই বলেন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন
সরকার সংস্থাটির ক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয় ২০০৯ সালে। অনেকেরই হয়তো স্মরণে আছে, দুদকের
একজন সাবেক চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ‘আমি সফল নই, দুদক নখদন্তহীন বাঘ’। দুর্নীতি দমনের
লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটির ওই কর্ণধারের খেদোক্তি অনেক কিছুই উন্মোচন করে দিয়েছিল।
নিঃসন্দেহে বলা যায়, এমন মন্তব্য কোনো একটি প্রতিষ্ঠানপ্রধানের ব্যক্তিগত অক্ষমতার
বহিঃপ্রকাশই শুধু নয়, সামগ্রিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার বিষয়টিও সামনে আনে।
নির্বাচনী হলফনামা বিধিবিধান অনুসারে নিশ্চয়ই
অর্থহীন আনুষ্ঠানিকতামাত্র নয়। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগে প্রার্থীকে প্রথম
শ্রেণির জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে শপথ করে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, আয়,
সম্পদ, মামলাসহ মোট আটটি তথ্য অঙ্গীকারপত্রে নিবন্ধন করতে হয় এই মর্মে, ‘আমি শপথ করে
বলছি, এ হলফনামায় দেওয়া যাবতীয় তথ্য এবং দাখিল করা সব ধরনের দলিল-দস্তাবেজ আমার জ্ঞান
ও বিশ্বাসমতে সম্পূর্ণ সত্য ও নির্ভুল।’ যিনি বা যারা আইন প্রণয়ন করেন তারা যদি হলফনামায়
অসত্য তথ্য দেন কিংবা কোনো কিছু গোপন করেন, এর আইনি প্রতিবিধান যেমন প্রয়োজন তেমনি
তার বা তাদের ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক সম্পদ বৃদ্ধির অস্বাভাবিক স্ফীতিচিত্রের পেছনের
কারণ অনুসন্ধানও জরুরি। নির্বাচনে অংশ নেয়া অনেকেরই অসত্য তথ্য দেওয়ার নজির আছে। একজন
প্রার্থী কিংবা তার স্ত্রী অথবা পরিবার-পরিজনের যেকোনো কারও ক্ষমতার স্পর্শে সম্পদের
পরিমাণের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন জাগে, তারা এ কোন আলাদিনের চেরাগ স্পর্শ করলেন? এমন
সংসদ সদস্য, মন্ত্রী কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকর্তার অনেক নজিরই আমাদের সামনে আছে।
এ তো গেল ওপরের কথা। আমরা যদি নিচের দিকে তাকাই
তাহলেও দেখতে পাই, স্বাস্থ্য বিভাগের চতুর্থ শ্রেণির কর্মী অথবা তিতাস গ্যাস কিংবা
পিডিবিসহ এমন অনেক প্রতিষ্ঠানেরই কারও কারও অস্বাভাবিক সম্পদের স্ফীতি সংবাদমাধ্যমে
উঠে আসছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতীতে বহুবার এও শোনা গেছে, এই দুর্নীতিবাজদের কোনো ছাড়
নয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, যত গর্জন হয়েছে তত বর্ষণ আমরা দেখিনি। জাতীয় সংসদে সংসদ
সদস্যের অনেকেই অর্থ পাচারকারী, ঋণখেলাপি কিংবা দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে চিৎকার করে
গলা ফাটিয়েছেন। অথচ বিস্ময়কর হলো, অস্বাভাবিক সম্পদস্ফীতির তালিকায় তাদেরও অনেকের নাম
রয়েছে! কি বিস্ময়কর স্ববিরোধীতা। জানি না রাজনীতির ছায়াতলে এমন কদর্যতার খতিয়ান বিস্তৃত
করে তারা কীভাবে পার পেয়ে যান কিংবা টিকে থাকেন। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত রক্তস্নাত
বাংলাদেশের এমন অবয়ব নিশ্চয় অচিন্তনীয় ছিল।
আমাদের স্মরণে আছে, দুদকের দায়িত্বশীলরা যেমন
অতীতে বলেছিলেন এবারও বলেছেন, প্রার্থীদের হলফনামার দিকে নজর রেখে তারা ব্যবস্থা নেবেন।
কিন্তু তাদের এ আশ্বাসে বিশ্বাস রাখার সঙ্গত কোনো কারণ নেই। অতীতে তারা এমন কোনো দৃষ্টান্ত
রাখেননি যাতে সাধারণ মানুষ তাদের কথায় বিশ্বাস রাখতে পারে। অবশ্যই প্রত্যাশা, নির্বাচনী
হলফনামায় দুদক নজরদারিতে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তাদের অঙ্গীকারের
প্রতি মর্যাদাই শুধু নয়, দৃঢ় অবস্থানেরও জানান দেবে। বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে
যদি প্রশ্ন ওঠে, হলফনামার তথ্যই দুর্নীতির মাপযন্ত্র, তাহলে তা কি উড়িয়ে দেওয়া যাবে?
উপার্জনের কোনো মাধ্যম ছাড়াই কী করে এত সম্পদের মালিক বনে গেলেন কোনো কোনো মন্ত্রী-এমপি
কিংবা তাদের স্ত্রীরা, এর উত্তর জটিল কিছু নয়। কিন্তু সরকারের যেহেতু দুর্নীতির বিরুদ্ধে
‘শূন্য সহিষ্ণুতা’র অঙ্গীকার রয়েছে সেহেতু স্বচ্ছতার মানদণ্ডের নিরিখে এর উৎসে নজর
দেওয়া উচিত। একজন মন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্য নিশ্চয়ই আইনের ঊর্ধ্বে নন। ১১ ডিসেম্বর
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ভিন্ন এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, চাকরি দেওয়ার কথা বলে কয়েকজন
চাকরিপ্রত্যাশীর কাছ থেকে নেওয়া সাড়ে ৯ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা
প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন। ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে ভুক্তভোগীদের
টাকা ফেরত দেন প্রতিমন্ত্রীর দুজন প্রতিনিধি! রাজনীতি ও ক্ষমতার দাপটে এ কদাচারের নিন্দা
জানানোর ভাষাও জানা নেই। অবশ্য এরকম নজির অনুসন্ধানে আরও মিলতে পারে। ১২ ডিসেম্বর প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এই শীর্ষস্থানে এই জাকির হোসেনেরই আরও দীর্ঘ কুকীর্তির আমলনামা উঠে এসেছে।
বিস্ময়কর হলো, তারপরও তিনি মন্ত্রীপরিষদের সদস্য হিসেবে টিকে আছেন! এরকম জাকির হোসেনের
সংখ্যা কত, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে সংবাদমাধ্যমে প্রার্থীদের যে
সম্পদের স্ফীতির চিত্র উঠে আসছে তাতে এই প্রশ্নটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের দুর্ভাগ্য,
এই জাকির হোসেনরাই দেশ-জাতির ভাগ্যনিয়ন্ত্রক! এই প্রেক্ষাপটে জনগণ তাদের প্রতিনিধি
নির্বাচনে অত্যন্ত সচেতন হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। তবে সর্বাবস্থায়ই এর জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ
নির্বাচন ব্যবস্থা অর্থাৎ প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন।
এবার আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থী মনোনয়নে আলোচিত
ও বিতর্কিত অনেককেই মনোনয়ন দেয়নি। কিন্তু তাদের অনেকেই আবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
তাদের কেউ কেউ যে নির্বাচনী বৈতরণি পার হবেন না, তাও কিন্তু নয়। আওয়ামী লীগ প্রধান
ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতি নির্মূলে যে অঙ্গীকার-প্রত্যয় রয়েছে এর প্রমাণ
আরও বলিষ্ঠভাবে তাকে দিতে হবে এই অসাধুদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার মাধ্যমে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) প্রার্থী
হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিধান উপস্থাপন করেছেন। আমাদের অনেক বিধিবিধানই কাগজে-পত্রে
আছে বটে, কিন্তু এর যথাযথ প্রয়োগ কিংবা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি আছে এমন
নজিরের অভাব নেই। অনেকেরই হয়তো স্মরণে আছে, কয়েক বছর আগে ‘যোগ্য প্রার্থী’র দাবিতে
আন্দোলনের ক্ষীণ ঢেউ উঠেছিল। কিন্তু তা বেশিদূর গড়ায়নি। মনোনয়নদানে যদি স্বচ্ছ কিংবা
যোগ্য প্রার্থীর বাছবিচার রাজনৈতিক দলগুলো না করে তাহলে নির্বাচনের মাধ্যমে এমন প্রার্থী
পাওয়ার আশা দুরাশামাত্র। আরও বিস্ময়কর হলো, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী কোনো কোনো দলের
একেবারে শীর্ষজনেরও সম্পদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আনুপাতিক যে হার উঠে এসেছে তাতে কেউ যদি
ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন রাখেন, এই নেতা কিংবা প্রার্থীকে দিয়ে আমরা কী করব, তাহলে এর উত্তরও
সরল হবে না। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনেই উঠে এসেছে একজন সংসদ সদস্য তার ক্ষমতার
মেয়াদে ৫০০ ভরি সোনা উপহার নিয়েছেন! তার স্ত্রীও এ ক্ষেত্রে রয়েছেন সমানতালে। এমন সংসদ
সদস্যর গভীরভাবে খোঁজ নিলে হয়তো আরও মিলবে।
প্রার্থী কিংবা তাদের স্ত্রী বা স্বজনদের অস্বাভাবিক হারে সম্পদ বৃদ্ধির উৎস অনুসন্ধান করে যদি প্রতিবিধান নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে রাজনীতিতে শুদ্ধাচারের যে দাবি নানা মহল থেকে বারবার উঠছে তা অসারই থেকে যাবে। আমাদের রাজনীতির অর্জন কম নয়। কিন্তু ক্ষোভের সঙ্গে এও বলতে হয়, বিসর্জনের খতিয়ানও অনেক বিস্তৃত এবং বিসর্জনের এ প্রেক্ষাপটও অজানা নয়। কাজেই সর্বাবস্থায় প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে রাজনীতিকদেরই শুদ্ধাচারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া, জবাবদিহির পাঠ নিশ্চিত করা। নিশ্চয়ই তারা জনগণের কাছে জবাবদানে দায়বদ্ধ এবং আইনের উর্ধ্বে নন।