সম্পাদকীয়
সম্পাদক
প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২৩ ১১:১৭ এএম
আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২৩ ১১:১৯ এএম
রাজধানীর তিনশ কেন্দ্রে ন্যায্যমূল্যে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকসেল কার্যক্রম নতুন করে শুরু করেছে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। এর মাধ্যমে লিটারপ্রতি ১০০ টাকা করে দুই লিটার সয়াবিন, ৬০ টাকা দরে দুই কেজি মসুর, পেঁয়াজ ৫০ ও আলু প্রতি কেজি ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১৪ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম নিয়ে গত দুই দিনে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ যে প্রতিবেদনগুলো প্রকাশিত হয়েছে তাতে কার্যক্রমে সুচারু ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির ইংগিত মিলেছে। রাজধানীর স্বল্প আয়ের মানুষকে ভর্তুকি মূল্যে কয়েকটি নিত্যপণ্য দিতে টিসিবির ট্রাকে পণ্য বিক্রির এই কার্যক্রমের মাধ্যমে পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরেছে সংস্থাটি। বাজারে একের পর এক নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। নিকট অতীতে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, গত অক্টোবরে দেশে মূল্যস্ফীতির পারদ অনেক বেশি ঊর্ধ্বমুখী হয়। তদারকি ব্যবস্থা জোরদার ও আমদানি করার পরও নিয়ন্ত্রণে আসেনি অনেক নিত্যপণ্যের দাম। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, ‘এখন বিশ্বব্যাপী পণ্যের দাম বেশি। তাই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ঢাকার বাইরেও চালু করা হবে এই ট্রাকসেল কার্যক্রম।’
টিসিবির ট্রাকসেল
কার্যক্রমের উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য বটে, কিন্তু আমরা এ কথাও স্মরণ করিয়ে দিতে
চাই, প্রথমত যে কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম সরকার খোলা বাজারে নির্ধারণ করে দিয়েছিল সেগুলো
নির্ধারিত দামে ভোক্তা কিনতে পারেনি। এ ব্যাপারে ব্যবসায়ী মহলের তরফে নানা অজুহাত দাঁড়
করালেও সরকারের দায়িত্বশীল অনেকেই বলেছেন, ‘সিন্ডিকেট করে বাজারে নিয়ন্ত্রণের অপতৎপরতায়
লিপ্ত অতিমুনাফাখোর অসাধু মহল’। দ্বিতীয়ত, এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা ইতঃপূর্বে বহুবার
প্রশ্ন রেখেছি, সিন্ডিকেটের হাত কি আইনের হাতের চেয়েও লম্বা। আমরা দেখছি, যেসব পণ্য
আমাদের আমদানি করতে হয় না সেগুলোর দামও হুটহাট বেড়ে যায় কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই। সম্প্রতি
রাজনৈতিক সংকটে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে বটে কিন্তু এ অজুহাত
দাঁড় করিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের পার পাওয়ার অপচেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ট্রাকসেল
কার্যক্রম শুরুর দুই দিন পর অর্থাৎ ১৬ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে
জানা যায়, ক্রেতা নেই আবার কোথাও পণ্য শেষ। সম্প্রতি টিসিবি রাজধানীতে এই কার্যক্রম
শুরুর আগে এমন কোনো প্রচার-প্রচারণা চালায়নি যাতে সাধারণ মানুষ জানতে পারে ন্যায্যমূল্যে
কয়েকটি নিত্যপণ্য বিক্রির নতুন উদ্যোগ নিয়েছে তারা। অন্যদিকে অনেক ট্রাকসেল কেন্দ্রেই
দেখা গেছে, পণ্য বিক্রি শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে গেছে। আমরা আগেই বলেছিলাম, যখন এ
কার্যক্রম টিসিবি শুরু করবে তখন পর্যাপ্ত পণ্য নিয়েই তাদের কার্যক্রম শুরু করতে হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, টিসিবির ট্রাকগুলো বিভিন্ন কেন্দ্রে এত স্বল্প পরিমাণে পণ্য নিয়ে
হাজির হয় বিক্রি শুরু হতে না হতেই শেষের ঘণ্টা বেজে যায়। আমরা মনে করি, স্বল্প কিংবা
নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সুফল যদি পৌঁছেই দিতে হয় তাহলে ‘সিন্ধুর মাঝে বিন্দুর মতো’
প্রস্তুতি থাকলে চলবে না।
অভিযোগ আছে, টিসিবির
পণ্য ক্রয়ে সরবরাহকৃত কার্ড নিয়েও। ভুক্তভোগীদের এ কার্ড সংগ্রহ করতে সংশ্লিষ্ট মহলের
কাছে ধর্না দিয়ে তাদের বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়েছে কিংবা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ,
গত কয়েক দিন ফের নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে চিনি ও আটার দাম। এক্ষেত্রে আমদানিকারকরা
নানা অজুহাত দাঁড় করিয়েছেন। অতীতে আমরা দেখেছি, সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনতে টিসিবির
ট্রাকসেল কেন্দ্রে সকাল থেকে দীর্ঘ লাইন দিয়েও অনেক ভোক্তাই পণ্য সংগ্রহ করতে পারেনি।
সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই আমরা প্রস্তাব রেখেছিলাম, নিত্যপণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রির সরকার
যে উদ্যোগ নিয়েছে তা অত্যন্ত সময়োপযোগী, কিন্তু কার্যক্রম শুরুর আগে ব্যবস্থাপনায় নজর
বাড়াতে হবে। বিদ্যমান পরিস্থিতি সাক্ষ্য দিচ্ছে, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল এ ব্যাপারে
তাদের নজর গভীর করেনি। ধারাবাহিক তিন মেয়াদের এ সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির
আওতা অনেক বাড়িয়েছে এবং এর সুফল নিম্ন আয় ও সাধারণ শ্রেণির ভোক্তারা কোনো না কোনোভাবে
পেয়েছেন বা পাচ্ছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এমনটিও দেখা গেছে, ব্যবস্থাপনায় গলদের কারণে
সরকারের মহৎ উদ্যোগ কোনো কোনো ক্ষেত্রে হোঁচট খাচ্ছে। আমরা আশা করব, ন্যায্যমূল্যে
নিত্যপণ্য বিক্রির টিসিবির নতুন কার্যক্রম যাতে কোনোভাবেই হোঁচট না খায়। স্বল্প আয়ের
মানুষের সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো জরুরি।