× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পোশাক শিল্প খাত

বেতন বৃদ্ধির আন্দোলনেও নাশকতার ছায়া

ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৩ ১৫:৩২ পিএম

বেতন বৃদ্ধির আন্দোলনেও নাশকতার ছায়া

দেশে আবার নতুন করে সংঘাত শুরু হলো। এর শেষ কোথায় কেউ জানে না। ২০১৪ সালের প্রথম তিন মাস এ দেশের মানুষ আন্দোলনের নামে তাণ্ডব দেখেছিল। যাত্রীবাহী বাসে আগুন ধরিয়ে দিয়ে মানুষ হত্যা, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা পুড়িয়ে ধ্বংস করা, কোটি কোটি পাঠ্যবইয়ে আগুন দেওয়া হয়। বৃদ্ধ, নারী, শিশু এসব তাণ্ডবে প্রাণ হারায়। দেশের মানুষ তখন এর নাম দেয় আগুনসন্ত্রাস। এ সন্ত্রাসের পেছনে কারণ ছিল ২০১৪ সালের নির্বাচন বন্ধ করা। তৎকালীন বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে না এসে নির্বাচন পণ্ড করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চেয়েছিলেন সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে আসুক। আমাদের স্মরণে থাকার কথা, শেখ হাসিনা তখন নির্বাচন বিষয়ে সংলাপের জন্য তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করেছিলেন। ফোনের সেই কথোপকথন দেশবাসীও শুনেছিল। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কত কর্কশ ও সৌজন্যবহির্ভূত আচরণ করতে পারেন সেদিন তা সবাই জেনেছেন। এরপর শুরু হলো ধ্বংসযজ্ঞ। এক পর্যায়ে সরকার পরিস্থিতি আয়ত্তে নিয়ে আসে। মাঝখানে কয়েক বছর দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল ছিল। ফলে উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়েছে। এটা ঠিক, উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বৈধ- অবৈধ পথে কিছু মানুষের উপার্জনও বেড়েছে। আসছে জানুয়ারিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে। নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় এজন্য বিএনপিসহ রাজপথের কয়েকটি দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি করে আসছে।

সরকার বলেছে, তত্ত্বাবধায়কের অভিজ্ঞতা দেশবাসীর জন্য সুখকর নয়, তাই দলীয় সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে। বিএনপি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে লবি করছে এবং তাদের দিয়ে সরকারের ওপর নিরন্তর চাপও সৃষ্টি করে যাচ্ছে। চাপের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, সকাল-সন্ধ্যা বিএনপিকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে। তারা এমন অবস্থা তৈরি করেছেন, পিটার হাস যেন তাদের দলেরই নেতৃস্থানীয় কেউ। এ পর্যায়ে বিএনপির ধারাবাহিক আন্দোলনের এক পর্যায়ে ২৮ অক্টোবর ঢাকায় দলটির মহাসমাবেশ ছিল। বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, আন্দোলন বা মহাসমাবেশ শান্তিপূর্ণ হবে। কিন্তু বেলা ১১টার পরই টেলিভিশনগুলোর পর্দায় ভেসে উঠলো, প্রধান বিচারপতির বাসভবনে দুর্বত্তরা হামলা চালিয়েছে। তখন পর্যন্ত অন্য কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার সংবাদ আমাদের কাছে আসেনি। ইতোমধ্যে জামায়াতকে পুলিশ শাপলা চত্বরে জমায়েত হতে বাধা দেয়। কিন্তু এক পর্যায়ে জামায়াত-শিবিরের জঙ্গি মনোভাব দেখে পুলিশ তাদের শাপলা চত্বর ছেড়ে দেয়। এতে স্পষ্ট হয়, পুলিশ সংঘাতে যেতে চায় না। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরই দেখা যায়, পুলিশের সঙ্গে ঢাকায় বিএনপি কর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। বাংলাদেশে এ দৃশ্য নতুন নয়। গত সাত-আট বছর হয়তো এমনটি দেখা যায়নি। একসময় আমরা দেখেছি সামনে সরকারি দল, পেছনে পুলিশ। অর্থাৎ পুলিশের প্রটেকশনে সরকারি দলের সন্ত্রাসীরা বিরোধীমতের কর্মীদের ওপর হামলা করত। যেহেতু প্রায় ১৫ বছর আওয়ামী লীগ একাদিক্রমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে তাই ওই দৃশ্য মানুষ ভুলে গেছে। ২৮ তারিখের সবচাইতে নির্মম ঘটনা যেটি ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় গুরুত্বের সঙ্গে দেখানো হয় তা হলো, পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে পুলিশ যখন পিছু হটছিল, তখন একজন পুলিশ সদস্য হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় তার ওপর বর্বরোচিত তাণ্ডব। ভিডিওতে দেখা যায়, তার জীবন বিপন্ন তবুও তার ওপর আক্রমণ চলছে। এমনকি ভিডিও দেখে এটা স্পষ্ট হয়, মৃত্যুর পরও তার ওপর উপর্যুপরি আঘাত করা হচ্ছে। এ দৃশ্য একাত্তরের হানাদার বাহিনীর নির্মমতাও হার মানিয়েছে। পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করে। যখন কোথাও পরিস্থিতি অবনতিশীল হয়, তখন তারা টিয়ার শেল ছোড়ে, বড়জোর ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে বা জীবন বিপন্ন হয়ে উঠলে গুলি ছোড়ে। কিন্তু খবরে যতটুকু দেখেছি, ওই পুলিশ সদস্য পলায়নপর অবস্থায় পড়ে যান। এ হত্যাকাণ্ডের পর শুরু হয় রাস্তার তাণ্ডব; যা কয়েক দিন যাবৎ চলমান। এমনকি বিভিন্ন জায়গায় চোরাগোপ্তা হামলাও শুরু হয়েছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হলে সমঝোতার একটা পরিবেশ তৈরি হতে পারত, এখন যা সুদূরপরাহত।

এবার ২৮ অক্টোবর আন্দোলনের একটা নতুন দিক পরিলক্ষিত হলো। বহু বছরের সংস্কৃতি হলো, ঢাকায় বিরোধী দলের মহাসমাবেশ হলে সব ধরনের গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে। এ ক্ষেত্রে মিডিয়াকর্মীরা বাসমালিকদের জিজ্ঞাসা করলে তারা গতানুগতিক উত্তর দিয়ে থাকেন যে, নিরাপত্তার জন্য গাড়ি বের করেননি। এবারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু নতুন যে বিষয়টি সামনে এলো তা হলো, গার্মেন্টস কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন। ২৮ অক্টোবর ঢাকার মিরপুরের অবস্থা দেখে বেশ খটকা লাগল। মনে হলো বিষয়টি হয়তো কাকতালীয়। কিন্তু সময় পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধারণা ক্রমেই পাল্টে যায়। গার্মেন্টস কর্মীদের হাতে আন্দোলন আছে বলে মনে হচ্ছে না। এ আন্দোলনের নাটাই অন্য কারও হাতে। পরিকল্পিতভাবে তাদের রাস্তায় নামানো হয়েছে বলে মনে হয়। এখানে হিসাবটা ভিন্ন। তারা অবরোধের সময় রাস্তায় থাকলে রাস্তায় যানবাহন চলাচল করতে পারবে না। অন্যদিকে তাদের দীর্ঘদিন রাস্তায় রাখতে পারলে বিদেশি ক্রেতাদের সময়মতো পোশাক সরবরাহ করা যাবে না। তাতে সংশ্লিষ্ট দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেবে এবং তারা রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারার জন্য সরকারকে দায়ী করবে। আরও বিষয় মাথায় থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যতটা তৎপর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ততটা নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমাদের তৈরি পোশাকের বড় ক্রেতা। পোশাক খাতের কর্মীদের বেতন কম

এবং সরকার এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না, এজন্য তারা সরকারের ওপর নাখোশ হতে পারে। তা ছাড়া এতদিন গার্মেন্টসকে রাজনীতির বাইরে রাখা গেলেও একটি মহল হয়তো সেক্ষেত্রে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করতে প্রয়াসী। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় শিল্প খাতের পাটকল, বস্ত্রকল ও চিনিকল ধ্বংস হয়েছে রাজনীতির কারণে। গার্মেন্টস শিল্পেও একটি মহলের উস্কানি আছে বলে মনে হয়। এখানে বলা দরকার, এ দেশে শ্রমিকরা সব সময় বেশি শোষিত হয়েছে শ্রমিকনেতাদের দ্বারা। এই নিবন্ধকারের এ বিষয়ে চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

গত শতকের আশির দশকে বিভিন্ন দাবিতে কলকারখানায় প্রায়ই হরতাল-ধর্মঘট লেগে থাকত। শ্রমিকরা দিনের পর দিন কাজে যোগদান থেকে বিরত ছিলেন। পরে দেখা যেত কর্তৃপক্ষ মিলগুলো লে-অফ ঘোষণা করেছে। এরপর শ্রমিকদের ঘরে ফিরে যাওয়া ছাড়া কোনো পথ খোলা থাকত না। এর হয়তো এক মাস বা দেড় মাস পর সামগ্রিক দাবির তুলনায় তুচ্ছ কোনো সুবিধা নিয়ে কাজে যোগদান করতে হতো। হয়তো অনেকে বলবেন শ্রমিকদের যা প্রাপ্তি তা আন্দোলনের মাধ্যমেই হয়েছে, কিন্তু সেই আন্দোলনে জঙ্গিত্ব থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। দেখা গেছে নাশকতার ছায়াও! তা ছাড়া যেকোনো আন্দোলন কর্মসূচির একটি নিয়ম আছে। তা হলো প্রথম কর্তৃপক্ষকে দাবির বিষয়ে জ্ঞাত করা। এরপর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা। প্রথমে প্রতীকী আন্দোলন, ধীরে ধীরে একে এগিয়ে নেওয়া। জানা নেই, এ পদ্ধতিগত বিষয়গুলো বর্তমান আন্দোলনে অনুসৃত হয়েছে কি না। যদি হয়েও থাকে, তাহলে রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির সঙ্গে একত্রে কেন?

আমরা অবশ্যই শ্রমিকদের উন্নত জীবন চাই। গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের একটি ব্র্যান্ড। সাকিব আল হাসান বা মাশরাফির কারণে যেমন বাংলাদেশকে পৃথিবীর একশ্রেণির মানুষ চেনে, ঠিক গার্মেন্টস শিল্পের কারণেও বাংলাদেশ বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে। বাংলাদেশের বেকার সমস্যা সমাধানে তৈরি পোশাক শিল্পের অবদান অপরিসীম। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে এ শিল্পের ভূমিকা অতুলনীয়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এ শিল্পের ভূমিকা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। তবে তাদের দাবিদাওয়া যদি মালিকপক্ষ বিচক্ষণতার সঙ্গে বিবেচনা করে তাহলে বড় ধরনের আন্দোলন হবে বলে মনে হয় না। যৌক্তিক দাবি পূরণের আশ্বাস দেওয়ার পরও যদি আন্দোলন চলে, তাহলে সেই শুরুর কথা 'ডাল মে কুচ কালা হ্যায়'। করোনাকালে দেখেছি, কিছু কিছু মালিক বিদেশে পণ্য সরবরাহ করতে পারেননি, তার পরও তারা কর্মীদের সহায়তা করেছেন। আশা করব, কর্তৃপক্ষ এবারও উদারতার পরিচয় দেবে এবং উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের পরই কর্মীরা কাজে ফিরে যাবে। গার্মেন্টস কর্মীরা আমাদের অহংকার। তারা যেকোনো অশুভশক্তির প্ররোচনায় সেই গর্বের জায়গাকে নিঃশেষ করবে না- এটাই প্রত্যাশা।


  • শিক্ষাবিদ ও রাজনীতি-বিশ্লেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা