সম্পাদক
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৩ ১০:৩৮ এএম
‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করি, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করি’Ñ এই প্রতিপাদ্য ধারণ করে ৬ অক্টোবর জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস পালিত হয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতার নিরিখে সংগতই প্রশ্ন উঠেছে, নাগরিকদের সেবা নিতে গিয়ে যে সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছেÑ এর জবাব কী। ৬ ও ৭ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোয় এ ব্যাপারে যে তথ্য উঠে এসেছেÑ তা আমাদের বিস্মিত না করে পারে না। বছরজুড়ে দেশের মানুষকে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করতে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। এই সমস্যা নিরসনের কার্যত কোনো উদ্যোগই দেখা যাচ্ছে না। উপরন্তু কায়দাকানুনের মারপ্যাঁচে পড়ে পদে পদে জনবিড়ম্বনা আরও বেড়েছে। বিগত কয়েক মাস ধরে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম প্রায় অকার্যকর। সার্ভার জটিলতায় অনেকেই ঢুকতে পারছেন না স্থানীয় সরকার বিভাগের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে। এমন পরিস্থিতিতেও এই কার্যক্রমে কৃতিত্বের জন্য ২৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করার বার্তা মিলেছে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র ৬ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর উপস্থিতিতেই এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর এ ব্যাপারে দায়বদ্ধতা থাকলেও তারা জিইয়ে থাকা সমস্যার নিরসনে কার্যত যেকোনো ইতিবাচক ভূমিকাই পালন করতে পারেনি, বিদ্যমান বাস্তবতা এরও সাক্ষ্যবহ।
ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সরকার যেখানে প্রযুক্তির
বিকাশকে কাজে লাগিয়ে নাগরিক পরিষেবা সহজ করতে চাচ্ছে, সেখানে জিইয়ে থাকা এমন জটিলতা
নিঃসন্দেহে অনাকাঙ্ক্ষিত। আমরা দেখছি, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের বিষয়ে নাগরিকদের আগ্রহ
বাড়ছে। কিন্তু এই সেবা নিতে গিয়ে যেভাবে মানুষকে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে তা কোনোভাবেই
মেনে নেওয়া যায় না। অথচ প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রায় সবক্ষেত্রেই প্রয়োজন
নাগরিকদের জন্ম ও মৃত্যুর সনদ। সার্ভারের ধারণক্ষমতা কিংবা সক্ষমতা যদি না থাকে, তবে
সার্ভারকে কীভাবে উন্নত ও ব্যবহারবান্ধব করা যায়Ñ এই দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়
এবং বিভাগগুলোরই। আমরা দেখছি, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে জটিলতা ক্রমে বাড়লেও সরকারের
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলরা সমস্যা এড়িয়ে যেতে চাচ্ছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে
অভিযোগ অস্বীকারের তথ্যও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। সেবাপ্রার্থীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে
বঞ্চিত করে দায়িত্বশীলদের দায় এড়ানোর বিষয়টি প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। যেহেতু
সমস্যাটি নতুন নয়, সেহেতু দীর্ঘদিনেও কেন এর নিরসন করা যায়নিÑ এও জরুরি প্রশ্ন। অনলাইনে
নাগরিককে সেবা দেওয়ার অঙ্গীকারের ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে
এক্ষেত্রে যে এর ব্যত্যয় ঘটছে তা আমাদের ক্ষুব্ধ না করে পারে না। অভিযোগ আছে, সেবা
নিতে গিয়ে শুধু ভোগান্তির মুখেই পড়তে হচ্ছে না, অসাধু দায়িত্বশীলদের ঘুষ দিয়ে নিবন্ধন
সম্পন্ন করতে হচ্ছে।নাগরিকদের সেবার নামে অনিয়ম-দুর্নীতির মচ্ছব মেনে নেয়া যায় না।
ম্যানুয়ালি যারা জন্মসনদ নিয়েছেন, তাদের মধ্যে যারা নিজ উদ্যোগে বা সংশ্লিষ্ট কার্যালয়
থেকে অনলাইনে এন্ট্রি করাননি, তাদের জন্মনিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য সার্ভারে নেইÑ এও সংবাদমাধ্যমে
বলা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের বরাত দিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা
হয়েছে, সেবাপ্রার্থীরা সংশ্লিষ্ট একটি কার্যালয়ে গেলে তাদের সেবাপ্রাপ্তির জন্য আরও
কয়েকটি কার্যালয় দেখিয়ে দেওয়া হয়। সার্ভারের ধীরগতি, নিবন্ধন ও ভুল সংশোধন প্রক্রিয়া
জটিলতায় সেবার নামে কেন নাগরিকরা ভোগান্তির শিকার হবেনÑ এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিয়ে যে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে এর আশু সমাধান
প্রয়োজন। কোনোরকম অজুহাত দাঁড় করিয়ে দায়িত্বশীলদের পার পেয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই। সংবাদমাধ্যমের
প্রতিবেদনেই আমরা দেখেছি, এই নাগরিক সেবা দেওয়ার কার্যালয়ে কর্মরতরা নাগরিকদের ঠিকমতো
আবেদন করতে না পারা কিংবা দক্ষ জনবল না থাকার অজুহাত দাঁড় করাচ্ছেন। এভাবে দোষ চাপিয়ে
দিয়ে ব্যর্থতা ঢাকার অপচেষ্টা অগ্রহণযোগ্য। সেবাপ্রার্থীরা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর
দায়িত্বশীলদের কাছে গিয়ে হেনস্তার শিকার হবেন আবার নাগরিকদের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন
সনদ আবশ্যকতার ব্যাপারেও গুরুত্বারোপ করবেনÑ এই স্ববিরোধিতার ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়ও
তাদেরই। জনগুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়ে আশু কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে জটিলতার নিরসন করে নাগরিকদের
ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিতে হবে। আমরা মনে করি, ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির পাশাপাশি আন্তরিকতা
ও দক্ষতার যে ঘাটতি রয়েছেÑ তা দূর করার বিকল্প নেই। অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিকার করাও
সমভাবেই জরুরি।