সম্পাদক
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৩ ১১:০৬ এএম
জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল
উপজেলার নিশ্চিন্তা-পাঠানপাড়া সড়কের দুই পাশে বেড়ে ওঠা প্রায় ৪০টি তালগাছ একেবারে ন্যাড়া
করে দেওয়া হয়েছে। আধা কিলোমিটারজুড়ে এক যুগ আগে রোপণ করা তালগাছগুলো ন্যাড়া করেছে স্থানীয়
পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দুর্ঘটনা থেকে রক্ষায়
গাছগুলো ন্যাড়া করা হয়েছে, এ দাবি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের। ৩ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ
প্রকাশিত খবরটি বেদনাদায়ক হলেও অবাক হওয়ার মতো নয়। কারণ, প্রকৃতির প্রতি আমাদের এরকম
নির্দয়তার অসংখ্য উদাহরণ প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে।
তালগাছগুলো কাটার
দোষ চাপানো হয়েছে শ্রমিকদের ওপর। কিন্তু তারা কার বা কাদের নির্দেশ মেনে দায়িত্ব পালন
করেছেন, সেদিকে নজর নেই। পল্লী বিদ্যুৎ ক্ষেতলাল সাবজোন অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার
প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘আমাদের নিয়ম হলো তারের ওপরে, নিচে ও আশপাশে ১০ ফুট
কেটে দিতে হবে। এখানে গাছ বা ডাল থাকলে তা কেটে দিতে হবে। তালগাছের মাথা ন্যাড়া করে
দেওয়া থাকলে এটা শ্রমিকদের ঠিক হয়নি। এর পক্ষে আমি না। এটি আমি সরেজমিনে গিয়ে দেখব।’
আমরা মনে করি, এরকম বক্তব্য দিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। গাছ
কাটা সহজ, কিন্তু একটি গাছ লাগানোর পর তার পরিচর্যা এবং বড় করে তোলার মাঝে সময় অনেক।
‘সরেজমিনে গিয়ে দেখে’ কি গাছগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া যাবে? বরং শুরুতেই
যদি যথাযথভাবে শ্রমিকদের নির্দেশ দেওয়া হতো, তাহলে গাছগুলো মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ত না। তালগাছগুলো
ন্যাড়া না করে মাত্র আধা কিলোমিটার পথের বৈদ্যুতিক তার কি সরিয়ে দেওয়া যেত না? এমন
নজির তো অসংখ্য আছে। ব্যক্তির আপত্তিতে বৈদ্যুতিক তারের খুঁটি সরিয়ে নেওয়ার উদাহরণও
প্রচুর। যেখানে বিদ্যুতের তার নিয়ে যাওয়ার জন্য কিছু গাছের শাখাপ্রশাখা কাটলেই চলত,
সেখানে আস্ত গাছ কেটে ফেলার উদাহরণও প্রচুর। আমরা দেখেছি, উন্নয়নের নামে বিভিন্ন সময়
দেশের নানা স্থানে অপ্রয়োজনেই গাছ কাটা হয়েছে; যার প্রতিক্রিয়ায় দেশের সংবেদনশীল মানুষ
প্রতিবাদও করেছেন। ক্ষেতলালের নিশ্চিন্তা-পাঠানপাড়া সড়কের তালগাছগুলো না কাটার জন্যও
সচেতন মানুষ প্রতিবাদ করেছেন, কিন্তু বন্ধ হয়নি গাছ কাটা, থামানো যায়নি গাছ কাটা। বিদ্যুৎ
সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দুর্ঘটনা থেকে রক্ষার অজুহাতে যদি ১০-১২ বছরের তালগাছ ন্যাড়া
করে দেওয়া হয়, তাহলে কোথায় গিয়ে শেষ হবে এ বিপর্যয়ের তালিকা?
সরকার একদিকে
পরিবেশের উন্নয়নে চেষ্টা করছে। মানুষকে উৎসাহিত করছে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায়। অন্যদিকে
বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত-আধাস্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানই আবার
নির্বিচারে গাছ কাটার উৎসবে মাতছে, যা সাধারণের মধ্যেও একটা ধোঁয়াশা তৈরি করে। এতে
মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা যায়। নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। ইতিবাচক প্রচারকেও অনেক সময়
অপ্রিয় প্রশ্নের মুখে ফেলে। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনেই আমরা ইতঃপূর্বে
পড়েছি ম্যানগ্রোভ কাটার খবর। বন কেটে হোটেল-রিসোর্ট তৈরি ও উন্নয়নের খবর। অথচ আমরা
ভুলে যাই, ম্যানগ্রোভ শুধু সুন্দরবন বাঁচিয়ে রাখেনি, আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলও রক্ষা করছে
ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন থেকে। আমরা পরিবেশ রক্ষার কথা বলছি, আবার সেই আমরাই পরিবেশ ধ্বংসে
নানা উদ্যোগ নিচ্ছি। এ স্ববিরোধিতায় ভবিষ্যতে আমাদের পৃথিবী কি বাসযোগ্য থাকবে? পরিবেশ
নিয়ে আমরা একের পর এক বৈঠক করছি। পরিবেশ উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছি।
মহাসমারোহে পালন করছি পরিবেশ দিবস। কিন্তু এভাবে নিজহাতে পরিবেশ বিপর্যয়ের মহোৎসব চলতে
থাকলে এর সবই তো নিষ্ফলা হতে বাধ্য। তা কি ভেবেছি?
ইতোমধ্যে আমরা
পরিবেশ বিপর্যয়ের খেসারত দিতে শুরু করেছি। আমাদের উত্তরের জনপদ মরুকরণের চিত্র ক্রমে
স্পষ্ট। দক্ষিণাঞ্চলে বাড়ছে লবণাক্ততা। এসবের পেছনে কারা দায়ী? দায়ী প্রকৃতি নয়, মানুষ।
কারণ আমরাই নদনদী-খালবিল-জলাশয় দখল করছি, গাছ ও পাহাড় কেটে নগরায়ণ করছি, অপরিকল্পিতভাবে
হাজার হাজার গাছ কেটে জাতীয় সড়ক চওড়া ও রেললাইন নির্মাণ করছি। যার সবই পরিবেশকে বিপন্ন
করছে। কক্সবাজারে সাম্প্রতিক বন্যায় আমরা দেখেছি উন্নয়নের নামে প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ
কত ধ্বংসাত্মক হতে পারে। আমরা অপরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য চরম খেসারত দিতে চাই না। আমরা
চাই নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ হোক, গাছের ওপর নির্যাতন বন্ধ হোক। ডিজিটাল বাংলাদেশ
পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে। যেখানে প্রয়োজন পর্যাপ্ত সবুজ পরিবেশ।
এ সবুজ যেন কোনো ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন’ মানুষের নির্দয়তায় ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে যথেষ্ট
সতর্ক থাকার জন্য বলি। সঙ্গে আমরা সবুজের ওপর আক্রমণকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনায় আনার
জন্যও বলি।