পরিপার্শ্ব
আর কে চৌধুরী
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৩ ১০:৫৬ এএম
গত ৫২ বছরে বিপুলসংখ্যক নদ-নদী
অস্তিত্ব হারিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে দেশের ৪০৫টি নদীর তথ্য রয়েছে।
সম্প্রতি জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন ৯০৭টি নদীর খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে। তবে এই খসড়া
তালিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ এই তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে নদীর
সংজ্ঞা কী তা উল্লেখ করা হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর
‘বাংলাদেশের নদ-নদী’ বইয়ে আছে ১ হাজার ২১৬টি নদীর তথ্য। অন্যদিকে বেসরকারি বিভিন্ন
গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দাবি, দেশে নদীর সংখ্যা ১ হাজার ৬০০-এর বেশি। একদিকে নদীর
সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি, অন্যদিকে দখল-দূষণে হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক নদী। চলতি
বছর আগস্টে নদী কমিশনের তালিকা প্রকাশের পরই বিভিন্ন দিক থেকে আপত্তি আসতে শুরু
করে। ওই খসড়া তালিকায় রংপুর বিভাগের শতাধিক নদ-নদী বাদ পড়েছে বলে দাবি করেছে
নদীবিষয়ক সংগঠন ‘রিভারাইন পিপল’। তাদের দাবি, এসব নদী তালিকাভুক্ত না হলে এই
অঞ্চলের প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্গে নদীকেন্দ্রিক ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি জানতে পারবে
না আগামী প্রজন্ম। নদীমাতৃক দেশে নদীর সঠিক পরিসংখ্যান তৈরি করতে না পারা সত্যিই
দুঃখজনক। প্রাকৃতিক জলাশয় হারিয়ে যাওয়া মানে জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যর
বিপন্ন হওয়া। এতে মরুকরণের হুমকিও সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশে যত নদ-নদী আছে তা
বিশ্বের অনেকে দেশেই নেই। নদ-নদীর সঙ্গে বৈরী আচরণ দেশের পরিবেশের জন্য বিপর্যয়
ডেকে আনছে। অস্তিত্বের স্বার্থে এ আত্মঘাতী প্রবণতা থেকে বিরত থাকতে হবে।
বিগত ৬০-৭০ বছরেও অনেক নদ-নদী
খনন না করায় নদ-নদীর তলদেশে পলি জমে এর নাব্য হ্রাস পাচ্ছে। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে
জীববৈচিত্র্যসহ মৎস্যসম্পদ ও নানা জলজপ্রাণী। হাজার হাজার জেলে পরিবার তাদের আদি
পেশা ছেড়ে বেকারত্ব ঘোচাতে বেছে নিচ্ছে অন্য পেশা। খেয়া পারের মাঝিরা বৈঠা ছেড়ে
কলের নৌকা চালিয়েও অভাব ঘোচাতে পারছে না। তাদেরও পেশা বদলাতে হয়েছে। জালের মতো
ছড়িয়ে থাকা শাখা নদীগুলোও এখন বিত্তবানদের ফসলি জমি। ভয়াবহ নাব্যসংকট নদীর
অববাহিকায় পরিবেশ বিপর্যয়সহ কৃষি আবাদে নেমে এসেছে স্থবিরতা। নদীর তলদেশে পানি না
থাকায় সেচনির্ভর কৃষকরা পড়েছে মহাসংকটে। দেশের বুক চিরে বয়ে চলা অসংখ্য নদ-নদীর
কারণে বাংলাদেশ বিশ্বে নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিতি। এসব নদীকে কেন্দ্র করেই
বাংলার বুকে গড়ে উঠেছে শহর-নগর-বন্দর। এ দেশের মানুষের জীবন-জীবিকাও নদীর সঙ্গে
ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিস্তীর্ণ নদীপথ যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। মিঠাপানির
মৎস্যসম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্যের অন্যতম আবাসস্থল হিসেবে নদীর গুরুত্ব অপরিসীম।
তবে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো বর্তমানে বিপন্ন। অবৈধভাবে নদী দখল
এবং শিল্পকারখানার বর্জ্য দ্বারা দূষণে নদীগুলো যেমন বিপন্ন হয়ে পড়ছে, তেমনি নদীর
পরিবেশ নষ্ট হওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছসহ গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য।
অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণে নদীর পানিপ্রবাহ কমে গিয়ে জেগে উঠেছে নিষ্প্রাণ
চর। নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ঠিক রাখা ও ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড বন্ধ করার মাধ্যমে
যেমন রক্ষা পাবে নদ-নদী, তেমনি টিকে থাকবে হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত বাঙালি
সংস্কৃতি।