পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী
শাহীন হাসনাত
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১১:৫৬ এএম
অশান্ত পৃথিবীতে
শান্তির বার্তা নিয়ে আগমন করেন শেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ছুটেছেন শান্তির বার্তা ও আদর্শ নিয়ে। সমাজে
শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানুষের নিরাপত্তা বিধানে করেছেন নিরন্তর সংগ্রাম ও সাধনা। শৈশবে,
দুরন্ত ও রাঙা কৈশোরে, উদ্দীপ্ত তারুণ্যে এবং জীবনসায়াহ্নেও তিনি হেঁটেছেন একই লক্ষ্য
ও উদ্দেশ্যে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতরূপেই প্রেরণ
করেছি।’Ñসুরা আম্বিয়া : ১০৭
শৈশবকালেই তিনি
আরব সমাজে ভূষিত হন ‘সাদেক’ (সত্যবাদী) ও ‘আল-আমিন’ (বিশ্বস্ত) উপাধিতে। স্বার্থপরতা,
হিংস্রতা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং প্রতিশোধস্পৃহা দমন করে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার
জন্য হিলফুল ফুজুল নামক একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তরুণ বয়সে হজরত মুহাম্মদ (সা.)
সেই সংগঠনে যোগদান করেন ও এর কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখেন।
মানুষের কল্যাণে গড়া এটাই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম সাংগঠনিক সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান।Ñআল
বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ২/৩৫৫
পাপ ও অজ্ঞতার
অন্ধকারে নিমজ্জিত আরববাসীকে আলোর পথ দেখিয়ে সাম্য, অকৃত্রিম ভ্রাতৃত্ব এবং বিশ্বমানবতার
ভিত্তিতে এক উন্নত ও আদর্শ সমাজব্যবস্থার প্রবর্তন করেন নবী মুহাম্মদ (সা.)। পৃথিবীর
ইতিহাসে নজিরবিহীন এক সমাজব্যবস্থার সূচনা হয়। যাতে রক্তের সম্পর্কের চেয়ে ঈমানের বন্ধন
ছিল মজবুত ঐক্যের প্রতীক। কথিত অভিজাত্যের গৌরব, উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্র, কালো সাদার
বৈষম্যের পরিবর্তন করে সাম্য এবং ন্যায়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। আল্লাহভীতি ছিল তাতে
সম্মানের মানদণ্ড। তিনি ঘোষণা করেন, ‘হে লোকসকল! তোমাদের রব এক আল্লাহ, তাকওয়া (আল্লাহভীতি)
ব্যতীত অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই...। নিঃসন্দেহে আল্লাহর কাছে তোমাদের
মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি যে বেশি তাকওয়াবান।’ Ñবায়হাকি শোয়াবুল ঈমান : ৫১৩৭
তখনকার আরবে নারীদের
ভোগ্যসামগ্রী মনে করা হতো। কন্যা সন্তানদের জ্যান্ত দাফনপ্রথা ছিল সিদ্ধ। পিতা এবং
স্বামীর সম্পত্তিতে তাদের কোনো অংশ ছিল না। তিনি নারীদের পৃথিবীর সর্বোত্তম বলে আখ্যা
দিয়ে ঘোষণা করেন, ‘পৃথিবী মানুষের ভোগ্য-বস্তু, আর এর মধ্যে সর্বোত্তম হলো পুণ্যবতী
স্ত্রী।’ Ñসুনানে নাসায়ি : ৩২৩২
আরবের বিভিন্ন
গোত্রে দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগেই থাকত। সামান্য অজুহাতে ভয়াবহ যুদ্ধের দামামা বেজে উঠত
আর দাবানলের মতো জ্বলত কয়েক যুগ। রক্তপাত ও লুণ্ঠন ছিল তাদের নিত্যদিনের পেশা। নবী
করিম (সা.) এ সবের অবসান ঘটিয়ে শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। নবুয়তের আগে ‘হিলফুল
ফুজুল’ এবং পরে ‘মদিনা সনদ’ এর মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।
মদপান হয়ে উঠেছিল তাদের আভিজাত্য ও বৈশিষ্ট্য। জুয়া খেলা ছিল তাদের সম্মানজনক অভ্যাস।
জুয়া খেলায় হেরে মানুষ অসামাজিক কাজে লিপ্ত হতো। ফলে ব্যাহত হতো সামাজিক জীবন। নবী
করিম (সা.) কঠোরভাবে মদপান এবং জুয়া খেলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা তোমাদের
জন্য মদ এবং জুয়া হারাম করেছেন...।’ Ñমুসনাদে আহমদ : ৪/২১৮
প্রাচীন আরব ছিল
নিষ্ঠুরতায় ভরপুর। ভোগবাদী আরবরা দাসদাসী, এমনকি গোত্রের লোকদের সঙ্গে অমানবিক নিষ্ঠুরতার
পরিচয় দিত। কেউ কারও কল্যাণের কথা ভাবত না। তিনি সমাজ থেকে এসব বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা
দূর করে সমাজে আমূল পরিবর্তন আনয়নের জন্য তাদের কুরআন মাজিদের তালিম দেন। ‘হে মানুষ!
আমি তোমাদের সকলকে এক পুরুষ ও এক নারী হতে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও
গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অন্যকে চিনতে পারো...।’ Ñসুরা হুজরাত : ১৩
৬২২ খ্রিস্টাব্দের
২৪ সেপ্টেম্বর রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনা মোনাওয়ারা হিজরত করেন। সেখানে বসবাসরত দুটি
সম্প্রদায়, বনু আউস এবং বনু খাযরাজের মধ্যে গোষ্ঠীগত হিংসা-বিদ্বেষ লেগেই থাকত। তাই
কলহে লিপ্ত সম্প্রদায় দুটির মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি স্থাপন ও মদিনায় বসবাসরত সকল
গোত্র ও শাখা গোত্রের মধ্যে সুশাসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নবী করিম (সা.) যে
ধারার সনদ বা সংবিধান প্রণয়ন করেনÑ তা ইতিহাসে মদিনার সনদ নামে পরিচিত। এটিই পৃথিবীর
প্রথম লিখিত সংবিধান। ইবনে হিশামের মতে, এতে ৫৩টি ধারা রয়েছে। উইলিয়াম মন্টগোমারি ওয়াটের
মতে এই সনদের ধারার সংখ্যা ৪৭টি। Ñআল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ২/২৩১-২৩৩
অর্থনৈতিক দৈন্যদশা
দূর করে সমাজে সার্বিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের সৌধ নির্মাণের নিমিত্তে আল্লাহ প্রদত্ত
জাকাতের বিধান চালু করেন। যাতে করে সমাজ থেকে দারিদ্র্যবিমোচনের পথ সুগম হয় এবং ধনী-দরিদ্রের
পার্থক্য চিরতরে মুছে যায়। ‘হে নবী! তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে
আপনি তাদের পবিত্র ও বরকতপূর্ণ করবেন।’ Ñসুরা তওবা : ১০৩
অন্যায়ভাবে কাউকে
হত্যা এবং কারো সম্পদ গ্রাস করা যাবে না। সবার জীবন-সম্পদ পবিত্র আমানত এ বিশ্বাসের
ওপর সমাজ কাঠামোকে গড়ে তোলেন। প্রতিটি মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।
বিদায় হজের ভাষণে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের জান-মাল তোমাদের জন্য তোমাদের রবের
সাক্ষাৎ দিবস পর্যন্ত এমন সম্মানিত যেমন সম্মান এ দিনের, এ মাসে এবং শহরে। Ñসহিহ বোখারি
: ১৭৪১
এভাবে নানা বিধান আরোপ করে নবী করিম (সা.) সামাজিক অসাধুতা, প্রতারণা, মিথ্যাচার, দুর্নীতি, হটকারিতা, মজুদদারি, কালোবাজারি, ইত্যাকার যাবতীয় অনাচার হারাম ঘোষণা করে সমাজ থেকে উচ্ছেদ করে একটি সুন্দর সমাজ কাঠামো উপহার দেন, যে সমাজ ব্যবস্থার কথা ইতিহাসে জ্বলজ্বল করছে। বর্তমানে সমাজেও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে, ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন ও আন্তর্জাতিক জীবনের সর্বত্র রাসুলের আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই, এটাই হোক এবারের ১২ রবিউল আউয়ালের শিক্ষা।