× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জাল সার্টিফিকেট

জালিয়াত শুধু গালি নয়, পরিচয়ও বটে

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১০:৪৫ এএম

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

সক্রেটিস বলেছেন, ‘সত্যপ্রীতি বিজ্ঞতার লক্ষণ’। যারা এ বিজ্ঞতা অর্জনের পরিবর্তে কদর্যতাকে অঙ্গভূষণ করে লোভ-অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়, তারা নিঃসন্দেহে নির্বোধের স্বর্গে বাস করে। ‘জাল সনদে ৭ বছর ধরে পিপি’ শিরোনামে ১৫ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনটির গর্ভে যে চিত্র উঠে এসেছিল, তাতে প্রতীয়মান হয়, হবিগঞ্জ জেলার পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. সিরাজুল হক সবাইকে বোকা বানিয়ে ধোঁকা দিয়ে শুধু একটি মহান পেশাকেই কলঙ্কিত করেননি, দাঁড় করিয়েছেন অনেক প্রশ্নও। ক্ষমতার দাপটে সিরাজুল হক ভুয়া সনদধারী হয়েও পিপির দায়িত্ব পালন করেন! একই সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতির পদটিও বগলদাবা করেন। অবশেষে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনের সূত্র ধরে তদন্তক্রমে তার পিপি পদ বাতিল করেছে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেÑ৩৪ বছর যে গর্হিত অন্যায় করে তিনি আইনাঙ্গন কলুষিত এবং পিপি হিসেবে সরকারের অর্থ পকেটস্থ করেছেন; একই সঙ্গে যেসব মামলার আইনজীবী হিসেবে আইনি যুদ্ধ লড়েছেন সে সবই কি অবৈধ নয়?

বিস্ময়কর হলো, সিরাজুল হকের গ্র্যাজুয়েশন সার্টিফিকেটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের স্বাক্ষর রয়েছে, যা জারি করা হয় ১৯৮১ সালের ১৬ মার্চ। অথচ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব নেন ১৯৯২ সালে। এখানেই শেষ নয়। মো. সিরাজুল হকের ল সার্টিফিকেট যাচাই করেও দেখা গেছে, ১৯৮৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ঢাকা ল কলেজ থেকে তিনি আইন পাস করলেও ঢাকা ল কলেজের শিক্ষার্থীদের অফিসিয়াল ফলাফলের তালিকায় তার নাম, রোল ও রেজিস্ট্রেশন পাওয়া যায়নি!

হবিগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিক (?) সিরাজুলের জালিয়াতির আগুন নির্বাপিত হতে না হতেই শেখ মোহাম্মদ মহসিন উপাখ্যানের আবির্ভাব। তিনি এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী। ৬ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগমুহূর্তে ভুয়া জন্মসনদ নিয়ে ফেঁসে যাচ্ছেন মোহাম্মদ মহসিন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তরফে ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শুধু তাই নয়, তার ক্ষমতার মেয়াদে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগের তীরও ছুটেছে।

আমাদের সমাজে গডফাদার শব্দটি বহুলপ্রচলিত। এই গডফাদারদেরও আবার গডফাদার আছেন। অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক নিশ্চয়ই এমন কোনো গডফাদারের আশীর্বাদপুষ্ট। জানি না মোহাম্মদ মহসিনও এই কাতারেরই একজন কি না। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়, অ্যাডভোকেট সিরাজুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে তার সব সার্টিফিকেট সঠিক বলে দাবি করেছিলেন। তিনি এও বলেছিলেন, একটি পক্ষ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেদক সার্টিফিকেটের মূল কপিগুলো চাইলে তিনি তা পাঠাবেন বলে আশ্বাস দিলেও পাঠাননি! শেষ পর্যন্ত তার হম্বিতম্বিও মিথ্যার জটাজালে আটকে গেল।

সিরাজুল-মহসিনদের সংখ্যা এ সমাজে যে অগণ্য, এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। আমরা জানি, নকল ও ভেজাল পণ্যে এমনকি জীবন রক্ষাকারী নকল ওষুধেও বাজার সয়লাব। এই আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত শিক্ষা খাতের নানাবিধ ক্ষতও পুরোনো চিত্র। ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমেই বহুবার উঠে এসেছে, হাত বাড়ালেই মেলে অর্থের বিনিময়ে যেকোনো ধরনের সার্টিফিকেট! জাল সার্টিফিকেটের কয়েকটি চক্রের সন্ধান ইতঃপূর্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পেয়েছেন। ৬ মে একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষাবোর্ডের জাল সার্টিফিকেট ও মার্কশিট ১ থেকে ৪ লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করছিল ঢাকার একটি চক্র। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়। ওই চক্রের সঙ্গে বিভিন্ন ‘নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়’ ও বোর্ডের ‘দায়িত্বশীল’ অসাধু ব্যক্তির নাম পাওয়া যায় বলে ঢাকার লালবাগ বিভাগের ডিবি পুলিশের উপকমিশনার মশিউর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন। এর আগেও এমন দুষ্কর্মের মূল হোতাদের না পেলেও চুনোপুঁটিদের সন্ধান মিলেছিল।

শিক্ষা কোনো পণ্য না হলেও শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্যের মতো বহুবিধ নেতিবাচক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরেই চলছে এবং দৃশ্যত এর দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার-প্রতিবিধান নিশ্চিত করা যায়নি। অ্যাডভোকেট সিরাজুল হকের অপকর্মের দায় সঙ্গত কারণেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো এড়াতে পারে না। প্রথমত, বার কাউন্সিল কর্তৃপক্ষের জবাবদিহির প্রসঙ্গ সামনে আসে। তারা কী করে তার সার্টিফিকেটগুলো যাচাই-বাছাই না করে সনদপত্র দিয়েছিল? প্রকৌশলী মহসিনই বা কী করে ভুয়া জন্মসনদ দিয়ে চাকরি জীবনের অন্তিমে এলেন? তারা ছড়িয়ে আছেন আইনাঙ্গনে, শিক্ষাঙ্গনে, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। দেশের কোনো কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষকের বিরুদ্ধেও চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ ইতোমধ্যে বহুবার উঠেছে। যে শিক্ষক চৌর্যবৃত্তির মাধ্যমে গবেষণাপত্র তৈরি করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন কিংবা ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে যারা আইন পেশায় নিযুক্ত হয়ে উপরন্তু পাবলিক প্রসিকিউটরের দায়িত্ব পালন করেন তারা নিঃসন্দেহে দেশ-সমাজের শত্রু। যে জাল সনদে ৭ বছর পিপি সিরাজুল হক রাষ্ট্রের এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন এই প্রেক্ষাপটে তার কর্মের খতিয়ান কীভাবে মূল্যায়িত হবে?

জাল সার্টিফিকেটধারী সিরাজুল হক ও ভুয়া জন্মসনদধারী মোহাম্মদ মহসিন ক্ষমতার দাপটে যে দুষ্কর্ম করেছেন, এর প্রতিকার-প্রতিবিধান নিশ্চিত করার দায় রাষ্ট্রশক্তি এড়াতে পারে না। খুব দূরের ঘটনা নয়। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলায় আবদুস সালাম চাকরি না পেয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতার সব সার্টিফিকেট পুড়িয়ে ফেলেন। যে সার্টিফিকেট তার কর্মসংস্থান করতে পারেনি সেই সার্টিফিকেট তিনি আর রাখতে চাননি। ইডেন কলেজের ছাত্রী মুক্তা সুলতানাও ফেসবুক লাইভে এসে তার সার্টিফিকেট পুড়িয়ে ফেলেছে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ে সেই ছাত্রীর হাতে চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেন। ধন্যবাদ জানাই মন্ত্রীকে। কিন্তু একই সঙ্গে মন্ত্রীকে এ প্রশ্নও করতে চাই, যে তরুণীকে তিনি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে জঠরজ্বালা নির্বৃত্ত করার পথ খুলে দিলেন, এ রকম তরুণ-তরুণীর সংখ্যা এ সমাজে কত? এর বিপরীতে যখন আমরা দেখি জাল সার্টিফিকেট ব্যবহার করে সমাজের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ানো বর্ণচোরারা বেশ আছে, তখন এ প্রশ্নও জাগেÑ এই অভিশপ্ত অধ্যায়ের শেষ কোথায়? একজন বিক্ষুব্ধের প্রতিবিধান করে মন্ত্রী যদি মনে করেন শিক্ষিত কর্মহীনদের বিকশিত জীবনের দ্বার খুলে যাওয়ার পথরেখা সৃষ্টি হয়েছে, তাহলে তা কতটা যৌক্তিক, এ প্রশ্নও সঙ্গতই দাঁড়ায়। কেউ ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে আখের গোছাবে আর অগণিত শিক্ষিত বেকার সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে কর্মপ্রত্যাশায় আবেদনের পর আবেদন করে চলবে, হতাশায় জীবন পাত করবে, এমনটি সমাজের সুষম চিত্র তুলে ধরে না।

অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতা যদি কোনো সমাজে জেঁকে থাকে, তাহলে সমাজ অন্যায়কারীদের চারণভূমি হয়ে উঠবে। এমনটি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। শুভবোধসম্পন্ন সচেতন মানুষমাত্রই প্রত্যাশা করে, সমাজের কোনো স্তরেই যাতে এমন জীবাণুধারীদের তালিকা দীর্ঘ না হয়। রাষ্ট্রশক্তিকে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে এর প্রতিবিধান নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি জরুরি। যাদের আশীর্বাদে সিরাজুল হকেরা রাজনীতির অঙ্গনও কলুষিত করার সুযোগ পান, তাদেরও জবাবদিহির প্রয়োজন। অন্যায়ের প্রশ্রয়দানকারী এবং অন্যায়কারীর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সুশাসন ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা এ দেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত প্রত্যাশা। প্রতিকারহীনতায় যেন এ প্রত্যাশার অপমৃত্যু না ঘটে।

দূর হ অন্ধকার, দূর হ।

  • সাংবাদিক ও কবি 
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা