পরিপ্রেক্ষিত
আরকে চৌধুরী
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১২:১৩ পিএম
বিশ্বের যেসব মহানগরীর জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে ঢাকা তার মধ্যে একটি। প্রতিদিন ঢাকার
বাসিন্দা হিসেবে যোগ হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ জন। প্রতি মাসে ঢাকার জনসংখ্যা বাড়ছে ৫১ হাজার।
বছরে ৬ লাখের বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রতি একরে ৭০০ থেকে ৮০০ মানুষের
বসবাস। অথচ মেগাসিটির মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি একর আয়তনে জনসংখ্যা থাকার কথা ১২০। সব
ধরনের সেবা রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় মানুষ ভিড় জমাচ্ছে ঢাকায়। এ ছাড়া শিল্পকারখানার
অধিকাংশই রাজধানী ও এর আশপাশে হওয়ায় বিশাল জনগোষ্ঠীর বাস রাজধানী ও সংলগ্ন এলাকায়।
বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় সহজেই স্থানান্তর বা বিকেন্দ্রীকরণ করা গেলেও
কোনো সরকার এতে আগ্রহ দেখায়নি। এ ছাড়া বিভাগ ও অন্য জেলাগুলোয় কর্মসংস্থানের সুযোগ
তৈরি করলে মানুষ আপনাআপনিই ঢাকা থেকে স্থানান্তরিত হবে। এতে ধীরে ধীরে বাসযোগ্যতা ফিরে
পাবে ঢাকা।
রাজধানীর জনসংখ্যা বাড়ার কারণে বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ। অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানীও
তাদের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ঘিঞ্জি এলাকায় পরিণত হচ্ছে। যানজট, বায়ুদূষণ-শব্দদূষণ থেকে
বাঁচার একমাত্র পথ ঢাকামুখী স্রোতের অবসান ঘটানো। ঢাকা মহানগরী আজ থেকে ৫০ বছর আগেও
ছিল সবুজে সমৃদ্ধ এক জনপদ। সেই নগরী ক্রমেই ইট-কংক্রিটের স্তূপে পরিণত হচ্ছে। রাজধানী
ঢাকা বিশ্বের শীর্ষ যানজটের নগরীগুলোর একটি। ফুটপাতেও নেই হাঁটার পরিবেশ। দূষণ ও অস্বস্তিকর
জীবনের কারণে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে। বসবাসের অযোগ্য নগরী, ইট-কংক্রিটের বস্তি ইত্যাদি
নানা অভিধা সত্ত্বেও ঢাকার জনসংখ্যা হুহু করে বাড়ছে। কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছে না ঢাকামুখী
জনস্রোত। বসবাসের অযোগ্য নগরী হওয়া সত্ত্বেও মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে পেটের দায়ে। কর্মসংস্থানের
সিংহভাগ সুযোগ ঢাকায় হওয়ায় বাধ্য হয়ে আসছে তারা। এ প্রবণতা ঠেকাতে রাজধানীর বাইরে কর্মসংস্থানের
ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। শিল্পকারখানা স্থাপন করতে হবে দেশের প্রতিটি প্রান্তে। ছোট
ছোট শহরগুলোয়ও নাগরিক সুবিধা সৃষ্টির নিতে হবে উদ্যোগ।
আন্তর্জাতিক অনেক জরিপে রাজধানী নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আমরা দেখতে পাই, এখানে
বসবাসের মতো অবস্থা নেই। ঢাকার সমস্যাগুলো দূর করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ
দেখা যায়। তবে ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য করতে শুধু ভবন নির্মাণ করলেই হবে না। রাজধানীতে
প্রচুর গাছ লাগাতে হবে। ভবন নির্মাণ করতে হবে অবশ্যই রাজউকের প্ল্যান বা নকশা অনুসারে।
ভবনের পাশে খালি স্থান না রেখে ইচ্ছামতো ভবন করা যাবে না।
বাংলাদেশের রাজধানী শহর গড়ে উঠেছে একেবারেই অপরিকল্পিতভাবে। নাগরিক সুযোগসুবিধার
অনেক কিছুই এখানে অনুপস্থিত। এ ছাড়া ঢাকা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতঃপূর্বে অন্য জরিপে
প্রকাশ পেয়েছে, ঢাকা বিশ্বের দূষিত নগরগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঢাকার চারপাশের নদনদীগুলোর
করুণ অবস্থায়ই এ জরিপের সত্যতা প্রমাণে যথেষ্ট। সবকিছুতেই পরিকল্পনাহীনতার ছাপ। অথচ
ঢাকা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। এজন্য পরিকল্পিত নগরায়ণের কোনো বিকল্প
নেই। ঢাকা আবাসস্থল থেকে পরিণত হয়েছে বিরাট বাজারে। বস্তুত এ শহরের সুনির্দিষ্ট কোনো
চরিত্র নেই। যত্রতত্র যে যেখানে পারছে যেকোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। এতে নগরী তার বিশিষ্টতা
হারাচ্ছে। এক জগাখিচুড়ি অবস্থায় রাজধানীবাসী এখানে বাস করছে। ফলে অনেক নাগরিক সুবিধা
থেকেই তারা বঞ্চিত হচ্ছে।
এ অবস্থা উত্তরণে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু ঢাকা নয়, দেশের অন্যান্য
শহরও পরিকল্পনামাফিক গড়ে তুলতে হবে। সুষম উন্নয়ন করতে হবে গ্রামেও। শহরের ওপর জনসংখ্যার
চাপ কমাতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।