জনস্বাস্থ্য
ড. হারুন রশীদ
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৩ ১৪:০২ পিএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
করোনা মহামারির মতো ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে আমরা রক্ষা
পেয়েছিলাম। এর অন্যতম কারণ ছিল টিকা। বিশ্বের উন্নত অনেক দেশকে টেক্কা দিয়ে
বাংলাদেশ টিকা সংগ্রহ করতে পেরেছিল। বিপুলসংখ্যক মানুষকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব
হয়েছিল। ফলে মহামারি থেকে আমরা রক্ষা পেয়েছি। কিন্তু ফিবছর ডেঙ্গুর আক্রমণে
প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও নিয়ন্ত্রণে আশানুরূপ সাফল্য আসেনি। বরং ডেঙ্গু আরও ভয়ংকর
রূপ ধারণ করেছে। দেশের প্রায় সব জেলায় ছড়িয়েছে ডেঙ্গু। মৃত্যু মিছিল বাড়ছে। ডেঙ্গু
নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষীয় বাণী-বিবৃতি
যতটা শোনা যাচ্ছে, কার্যক্ষেত্রে ততটা বাস্তবায়িত হচ্ছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন
চূড়ান্তরূপে ব্যর্থ মশক নিধনে। ডেঙ্গুর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বেড়ে গেছে স্যালাইনসহ
জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম। রক্ত, প্লাটিলেট সংগ্রহ, চিকিৎসাব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ। দুর্ভোগ যেন নিয়তি।
সামনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, এমন শঙ্কার কথা জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। দুই
বছর ধরে দেশে ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। প্রাণঘাতী রোগটি যারপরনাই
দুর্ভাবনার কারণ হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুতে
আক্রান্তরা নাক ও দাঁত দিয়ে এবং কাশির সময় রক্তক্ষরণে ভুগে থাকে। এ ছাড়া পিঠ,
দাঁত, মাথা ও চোখের পেছনে ব্যথা অনুভব করে।
চার-পাঁচ দিনের মধ্যে আক্রান্তের অবস্থার উন্নতি না হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে
হবে। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ খাওয়ারও দরকার
নেই। চিকিৎসকরা এ ক্ষেত্রে সচেতনতার কথাও বলেন। বিশেষ করে রোগীকে বেশি মাত্রায়
পানি কিংবা শরবত খাওয়ানো যেতে পারে। এডিস মশার হাত থেকে বাঁচার জন্য দিনের বেলায়ও
ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করতে হবে।
বাসায় খোলা পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে। এ
ছাড়া ফুলের টবে জমে থাকা পানি, টায়ারের
খোল, ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দা অথবা পানির চৌবাচ্চায় এ মশা
নির্বিচারে বংশ বিস্তার করে। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ডেঙ্গু সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া
যায়। তবে প্রাথমিক অবস্থায় ১০২ ডিগ্রি এবং এর চেয়ে বেশি জ্বর, সঙ্গে শরীর ব্যথা, বিশেষ করে হাড়ে; তীব্র পেটব্যথা, স্কিন র্যাশ ইত্যাদির সঙ্গে বমিভাব
ও ক্ষুধামান্দ্য থাকলে তার ডেঙ্গু হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে। এ অবস্থায় অনেকে আতঙ্কিত
হয়ে অ্যান্টিবায়োটিকসহ নানান ধরনের ওষুধ খেয়ে থাকেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতে,
প্রাথমিক অবস্থায় জ্বর প্রশমনে কেবল প্যারাসিটামল ও প্রচুর পানি
খেলেই চলে। তবে অবস্থার অবনতি হলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধ
ও শিশুদের ক্ষেত্রে।
ডেঙ্গু এখন কোনো সময় ধরে এগোচ্ছে না। সারা বছরই ডেঙ্গুর
আক্রমণ চলছে। তা ছাড়া ডেঙ্গুর জন্য দায়ী এডিস মশা রাতে দিনে সব সময়ই কামড়াচ্ছে।
স্বচ্ছ, নোংরা যেকোনো পানিতে
লার্ভা ছড়ায় মশা। ঢাকা শহরে ‘লাইট পলিউশন’-এর কারণে এডিস মশা এখন দিনে হোক বা রাতে সব সময় কামড়ায়। লাইট পলিউশন একটা
বিশাল বড় পলিউশন। এ কারণে এডিস মশা তার আচরণে পরিবর্তন এনেছে। আর এতদিন আমরা
জানতাম এডিস মশা স্বচ্ছ পানিতে জন্মায়, নোংরা পানিতে নয়। অথচ
এখন আমরা দেখছি এডিস সব পানিতেই জন্মাচ্ছে। অর্থাৎ এডিস মশা আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন
এনেছে। এ পরিবর্তনকে টার্গেট করে আমাদের এডিস মশার নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিতে হবে।
মশা মারা কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। মশা জন্মানোর তথ্য-উপাত্ত
বিশ্লেষণ করে যারা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছেন তাদের টার্গেট করে মশা মারতে হবে।
এডিস মশা যেখানে জন্মায় সেখানে টার্গেট করে আমাদের তা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে
হবে। যেখানে আমরা পারছি না, কেন পারছি না তা বের করতে হবে।
দুঃখজনক হচ্ছে, পুলিশের ডাম্পিং করা গাড়িগুলো এডিস মশা
প্রজননের সবচেয়ে বড় আবাসস্থল। ঢাকার প্রায় সব থানার সামনাসামনি গাড়ি ডাম্পিং করা
রয়েছে। এ ছাড়া বাসাবাড়ির বেসমেন্টে যেখানে গাড়ি ধোয়া হয়, সেখানেও
পাওয়া যাচ্ছে এডিসের লার্ভা।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সচেতনতার কথা বলা হলেও তা মানা হচ্ছে না।
অনেকেই মশারি ব্যবহার করতে চান না। মশারি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই সবাইকে বাধ্য
করতে হবে। রাজধানীতে বিদ্যুৎ যায় না বললেই চলে, সেখানেও মশারি ব্যবহার করা হচ্ছে না গরম লাগছে বলে। অথচ ডেঙ্গু হলে আমরা
খারাপ অবস্থায় যেতে পারি, মারাও যেতে পারি। তার পরও সামান্য
কষ্ট করতে রাজি নই। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষীয় দায়িত্বের পাশাপাশি নাগরিক
দায়িত্বও অনেক। প্রত্যেক নাগরিকের কিছু দায়দায়িত্ব আছে। নাগরিক নিজের জায়গায় সচেতন
থাকলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা সহজ হয়। শুধু সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর
দোষ না দিয়ে আমরা দায়িত্বশীল হয়ে কাজ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। ডেঙ্গু
মোকাবিলায় ব্যবস্থাপনার গদল উঠে আসছে সংবাদমাধ্যমে। কিন্তু এসব কি সংশ্লিষ্ট
দায়িত্বশীলরা আমলে নিচ্ছেন? উত্তর প্রীতিকর নয়।
বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্যের প্রধান হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে
ডেঙ্গু। গত এক দশকে প্রাণঘাতী ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি
পেয়েছে বলে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার জরিপে জানা গেছে। বিশ্ব জনসংখ্যার ৫ ভাগের ২
ভাগ অর্থাৎ ২৫০ কোটি ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ৭০ ভাগই এশিয়া ও প্রশান্ত
মহাসাগরীয় দেশগুলোয় বাস করে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে দিয়েছে, এখনই সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এ ব্যাপারে
ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে হলে
সচেতনতাই মূল নিয়ামক। আমাদের জেগে ঘুমালে চলবে না। দায়িত্বশীল হতে হবে নিজের
জীবনরক্ষার স্বার্থেই। ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে বাঁচতে হলে এডিস মশা যাতে বংশ বিস্তার
করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দুঃখজনক হচ্ছে, জেলজরিমানা
করেও বাসাবাড়ি, অফিস-প্রতিষ্ঠানের
আশপাশ পরিষ্কার রাখা যাচ্ছে না। অথচ জীবন যাচ্ছে আমাদের। এজন্য মশক নিধনে ঢাকার
দুই সিটি করপোরেশনকে আরও সক্রিয় হতে হবে; যাতে এডিস মশার
সংখ্যা বৃদ্ধি না পায়। এ লক্ষ্যে সরকার, স্বাস্থ্য
মন্ত্রণালয়, গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে একসঙ্গে কাজ
করতে হবে। মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, ‘প্রতিষেধকের
চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম’।