× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শরণার্থী

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাড়ছে নিরাপত্তা হুমকি

মোহাম্মদ আলী শিকদার

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৩ ০৫:৩১ এএম

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

কয়েক দিন আগে কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে বাংলাদেশ সফরে আসা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ৫ সদস্যের প্রতিনিধিদল। বিদেশি বিভিন্ন দেশ বা সংস্থার এমন প্রতিনিধিদল প্রায়ই রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে এবং আশ্রিত রোহিঙ্গারা প্রতিবারই নিজ ভূমে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানায়, এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। আশ্রিত রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার এই আকুতি বারবারই জানাচ্ছেন তারা দেশের প্রতি টানের পরিপ্রেক্ষিতে। দেশ ও ভিটেমাটিচ্যুতদের এই আকুতি বিদেশিরা শোনেন, প্রতিশ্রুতি দেন কিন্তু কার্যত তারা কাজের কাজ কতটা কী করেছেন কিংবা করছেন এই প্রশ্নের উত্তর জটিল কিছু নয়। আমাদের দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা নিজ দেশে অনেকেই স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করছিল। আচমকা বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে তাদের নিজ বাসভূম ছেড়ে অন্য দেশে জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের একাংশ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন গড়ে তুলছে এবং তারা নানাভাবে আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। কিন্তু এই ক্ষুদ্র অংশ বাদ দিলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

মিয়ানমারের অভ্যন্তরে কী ঘটছে বা ঘটেছে এর দায় মিয়ানমারের ওপরই বর্তায়। রোহিঙ্গাদের সঙ্গত প্রত্যাশা, তারা নিজ দেশে ফিরে গেলে নাগরিক অধিকার ফিরে পাবে। তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে চাইবে এমনটাই স্বাভাবিক। অনেকবার বিদেশিরা রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন কিন্তু এখনও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ তাদের নিতে দেখা যায়নি। এর পেছনে এই অঞ্চলে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব জড়িয়ে আছে। শুধু মিয়ানমার নয়, ভূরাজনৈতিকভাবে পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল ঘিরে এই দুই শক্তির মধ্যে সংঘাত চলছে। প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্বের কারণে অবধারিতভাবেই রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান হচ্ছে না। ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কাছে যেন মানবতা হেরে যাচ্ছে।

চীনের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় মিয়ানমার তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারে সামরিক শাসন চলছে। জাপান ও চীনের সামরিক শক্তি বাড়ছে। তাইওয়ানকে ঘিরে ওই অঞ্চলে যুদ্ধের আশঙ্কা বহুদিন ধরেই ভূরাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা করে আসছেন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিকট অতীতে জানান, ২০২৬ সাল নাগাদ তাইওয়ানের সঙ্গে চীনের সংঘাত লেগে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এজন্যই মিয়ানমার চীনের জন্য 'লাইফলাইন'। চীনের ব্যবহারযোগ্য শক্তির ২০ শতাংশ আসে রাশিয়া থেকে। বাকি অংশ তারা সংগ্রহ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এই জ্বালানি সংগ্রহের জন্য তাদের মালাক্কা প্রণালি বাদে আর কোনো রুটে আনার সুযোগ কম। তাই যুদ্ধ শুরু হলে এই মালাক্কা প্রণালি দিয়ে তেল বা জ্বালানি আমদানির পথ বন্ধ হয়ে যাবে। মালাক্কা প্রণালি রয়েছে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং ইত্যাদি অঞ্চলের মধ্যে। আর এ রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রশক্তি। ফলে চীনের জন্য জ্বালানি আমদানি করার পথও অনেক সংকুচিত হবে, তা-ও আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অর্থাৎ ভূরাজনৈতিক কারণে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আমরা বিদেশিদের তৎপরতা দেখছি কম।

রোহিঙ্গা সংকট ১৯৭৮ সাল থেকেই বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তা অর্থাৎ ভূখণ্ডগত শান্তির জন্য বিষফোঁড়া। ১৯৭৮ থেকে শুরু হওয়া সংকট আস্তে আস্তে বিস্তৃত হতে হতে বর্তমানে অসহনীয় পর্যায়ে চলে এসেছে। রোহিঙ্গা সংকটের বহুমুখী উদ্বেগজনক দিক রয়েছে। অনেকেরই বক্তব্য, ‘মিয়ানমার সরকারই এই সংকটের সমাধান করতে চাচ্ছে না বলে এর সমাধান হচ্ছে না।' এই বক্তব্যের সঙ্গে আমি কিছুটা দ্বিমত পোষণ করি। কারণ মাল্টিপোলার বিশ্বে একটি রাষ্ট্রের একার সিদ্ধান্ত এ রকম সংকটের পথে সব সময় বাধা হয়ে থাকতে পারে না। রোহিঙ্গা সংকটের বৃহত্তর আঙ্গিক রয়েছে। বাংলাদেশকে ঘিরে যে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, এর সঙ্গে এই সংকট সরাসরি জড়িত। ১৯৭৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মিয়ানমার সরকার যেসব ঘটনা ঘটিয়েছে, তা বিদ্যমান সংকটের জন্য অবশ্যই দায়ী।

মিয়ানমারের গণহত্যা আন্তর্জাতিক মহলের গভীর নজর কাড়ার বিষয়। এই সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক মহল এগিয়ে আসবে, এমন প্রত্যাশাই স্বাভাবিক। বিভিন্ন দেশে গণহত্যা কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র মন্তব্য করে। তাদের উচিত বিদ্যমান সংকট নিরসনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা। কিন্তু তেমন কিছুই এখনও দৃশ্যমান নয়। ফলে আমাদের দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে বহুপক্ষ সৃষ্টি হচ্ছে এবং তাদের মধ্যে নিয়মিত সংঘর্ষের মতো উদ্বেগজনক ঘটনাও ঘটছে। খুনখারাবি হচ্ছে। তাদের মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে এবং একই সঙ্গে পরিবেশগত অনেক সমস্যাও দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়রা আতঙ্কে রয়েছেন। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সংঘটিত গণহত্যার বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে এই সমস্যা কোনো দিন সমাধান করা যাবে না। ১৯৭৮ থেকে এ পর্যন্ত মিয়ানমারে যা ঘটেছে, সেসব ঘটনাকে একত্র করে সুষ্ঠু সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। যুদ্ধ কিংবা সংঘাতের মাধ্যমে বিদ্যমান সংকটের সমাধান হবে না। আন্তর্জাতিক মহল এখন যুদ্ধের পথ বন্ধ করেও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সংকট নিরসন করে থাকে। যেহেতু বিশ্ব মাল্টিপোলার হয়ে উঠেছে, তাই অনেক সময় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

এই স্তম্ভেই কিছুদিন আগে লিখেছিলাম, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে। তা ছাড়া ক্যাম্পের চারপাশে ওয়াচটাওয়ার গড়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখা উচিত। তাহলেই যথাযথভাবে রাতের বেলায় নিরাপত্তাকর্মীরা গভীর নজর রাখতে পারবেন। বিশেষত প্রতিটি ক্যাম্পে প্রবেশ ও বহির্গমনের জন্য দুটি আলাদা গেট গড়া প্রথমেই জরুরি ছিল। এখনও অবকাশ আছে নিরাপত্তাবেষ্টনী আরও জোরদার করার। শুধু দুটি গেটে যদি প্রবেশ করার সুযোগ সীমাবদ্ধ থাকে এবং প্রবেশের সময় প্রত্যেককে নিজের পরিচয় দিতে হয়, তাহলে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সদস্যরা সহজে ঢুকতে পারবে না। মাদক ব্যবসাসহ আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি নেতিবাচক অনেক কিছুই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বড় উপসর্গ হয়ে দেখা দিয়েছে। উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩ আগস্ট ভোরে এপিবিএনের সঙ্গে আরসার সদস্যদের গোলাগুলির খবর জানা গেছে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে।

রোহিঙ্গা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনকে উগ্রবাদী সংগঠনগুলো নানাভাবে সহায়তা দিচ্ছে- এই অভিযোগ নতুন নয়। আমাদের পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এগিয়ে আসছে। এই স্তম্ভে এ-ও লিখেছিলাম, নির্বাচনের আগে দেশের অভ্যন্তরে পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তোলার ক্ষেত্রে ধর্মীয় উগ্রবাদী সংগঠনগুলো এদের অর্থাৎ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনকে ব্যবহার করতে পারে এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে তারা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি নিশ্চিত করা গেলে আমাদের এত চিন্তিত হতে হতো না। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ স্থানীয় প্রশাসনের সবাইকে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রবেশপথ দ্রুত আরও সংকুচিত করা জরুরি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশ ঘটছে, এই সংবাদে দুর্ভাবনার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ। মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনেক বিদেশি এনজিও কাজ করছে। সেখানে হঠাৎ করে অভিযান পরিচালনা করতে গেলে এই এনজিওগুলো নানা অভিযোগে বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করতে শুরু করবে। অভিযান পরিচালনা করলে সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সঙ্গে গোলাগুলি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সঙ্গত কারণেই নিরস্ত্র কিছু মানুষ প্রাণ হারাবে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির দায় বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। এমনটি কাম্য হতে পারে না। তাই সতর্কতার সঙ্গে বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

ধর্মীয় উগ্রবাদ রোহিঙ্গাদের প্রলুব্ধ করছে। দেশের অভ্যন্তরে কিছু ধর্মীয় উগ্রবাদী সংগঠন যেমন তৎপর তেমনি পাকিস্তানের কিছু ধর্মীয় উগ্রবাদী সংগঠনও সক্রিয় রয়েছে। তারা আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় অপব্যাখ্যার মাধ্যমে ভুলপথে পরিচালিত করছে। রোহিঙ্গা সংকটকে ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা করা যাবে না। মানবতার বিপর্যয় থেকে সৃষ্ট এই সংকট। অন্য কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে এই সংকটকে চিহ্নিত করলে সমাধান মিলবে না। হয়তো ভূরাজনৈতিক স্বার্থের জন্যই আমরা বড় শক্তির তোড়জোড় দেখতে পাচ্ছি না। তবে মাল্টিপোলার বিশ্বে এই সমর্থন আদায় করা কঠিন কিছু নয়। সরকার এ বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক এবং তৎপর। তারপরও আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের স্বার্থেই কৌশলগত অবস্থান দৃঢ় করতে হবে। এজন্য বাড়াতে হবে কূটনৈতিক তৎপরতাও। ভূরাজনৈতিক স্বার্থের প্রেক্ষাপটে বিদেশি বিভিন্ন মহলের দফায় দফায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখাই শ্রেয়। তারা বিদ্যমান পরিস্থিতি অনুধাবন করে বিষয়টি যাতে সেভাবে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করে এজন্য আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে।

  • বীর মুক্তিযোদ্ধা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক; অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল
শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা