স্মরণ
আমিরুল আবেদিন
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৩ ১৫:২৫ পিএম
আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৩ ১৭:০৮ পিএম
আবু সাঈদ চৌধুরী।
আবু সাঈদ চৌধুরী ১৯২১ সালের ৩১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার নাগবাড়ী গ্রামের এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আবদুল হামিদ চৌধুরী পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার ছিলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তাঁকে খান বাহাদুর উপাধি প্রদান করেছিল।
আবু সাঈদ ১৯৪৭ সালে কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে ঢাকা হাই কোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৬০ সালে আবু সাঈদ চৌধুরী পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাডভোকেট জেনারেল নিযুক্ত হন। ১৯৬১ সালের ৭ জুলাই তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান তাঁকে অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগ করেন এবং দুই বছর পর ঢাকা হাই কোর্টে স্থায়ী নিয়োগ পান।
১৯৬৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন। ১৯৭১-এর মার্চে আবু সাঈদ চৌধুরী জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের অধিবেশনে যোগদানের জন্য জেনেভা যান। সেখানে জেনেভার একটি পত্রিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন ছাত্রের মৃত্যু সংবাদ দেখে বিচলিত হয়ে ২৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক শিক্ষা সচিবকে পাকিস্তান দূতাবাসের মাধ্যমে প্রেরিত এক পত্রে লেখেন, ‘আমার নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর গুলি চালানোর পর আমার ভাইস চ্যান্সেলর থাকার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। তাই আমি পদত্যাগ করলাম।’
শুধু দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে, কর্তব্যবোধে পরিচালিত হয়ে পাকিস্তানের নৃশংস বর্বরতায় ক্ষুব্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ দায়িত্ব তিনি নিয়েছিলেন। ঢাকায় গণহত্যার খবর শুনে বিচারপতি চৌধুরী ২৭ মার্চ শনিবার পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেন। পাকিস্তান পার্লামেন্ট বাতিল, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার এবং স্বাধীনতা ঘোষণায় বাংলাদেশ সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ, সেই ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ মহিলা সমিতি ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণহত্যার প্রতিবাদে এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে সমর্থনের দাবিতে বেশ কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করে।
ওই সময় লন্ডনেও বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক এবং লন্ডনের বাইরে শহরভিত্তিক সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে বাঙালি। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করলেও তা সমন্বয়ের অভাবে আশাপ্রদ ফল অর্জন করতে পারছিল না। এ সংকটময় মুহূর্তে বিলাতের প্রবাসী বাঙালিকে সমন্বয় করার দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।
বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কর্তব্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরতা এবং বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার প্রতিবাদে তিনি স্বেচ্ছায় জেনেভা থেকে লন্ডনে এসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার প্রত্যয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে বিশ্বজনমত গঠনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী লন্ডনে সদর দপ্তর স্থাপন করে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে সমগ্র বিশ্ব ছুটে বেড়িয়ে সম্পন্ন করেছেন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।
স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ও তাদের দোসরদের প্রাণনাশের হুমকির মুখে অবিচলিত, শান্ত এই কর্মবীর সাহসের সঙ্গে মাতৃভূমির মুক্তির লক্ষ্যে বিরামহীনভাবে কাজ করে গেছেন। একাগ্রতা, দেশপ্রেম ও কঠোর পরিশ্রমে অতিদ্রুত বিবদমান ও বিশৃঙ্খল সংগ্রাম পরিষদসমূহকে সমন্বয় করে এবং রাজনৈতিক দল ও উপদলের বিশ্বাস অর্জন করেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টা করেন প্রবাসে থেকেই।