× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অংশীদারিত্ব

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের একান্ন বছর

ফারিহা জেসমিন

প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৩ ১৪:২৫ পিএম

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের একান্ন বছর

‘উদীয়মান সূর্যের দেশ’ হিসেবে খ্যাত জাপান বাংলাদেশকে স্বাধীনতা অর্জনের দুই মাস (১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি) পরই স্বীকৃতি দেয় এবং ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাপান সফরের আয়োজন করে। এভাবে জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্কের গোড়াপত্তন হয় এবং পরবর্তী সময়ে সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে জাপান। ২৩ জুলাই ২০২৩, জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী ইয়াসুতোশি নিশিমুরার বাংলাদেশ সফর আবারও মনে করিয়ে দিল বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের সোনালি অতীত এবং এক অটুট বন্ধুত্বের কথা, যা গত ৫১ বছরে দুই দেশের মধ্যে গড়ে উঠেছে। বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের অনেক ক্ষেত্রে সমূহ-সম্ভাবনার দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে দেখেছেন নিশিমুরা।বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে ক্রমেই আকর্ষণীয় বাণিজ্যিক গন্তব্য হয়ে উঠছে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ১৮ কোটি ভোক্তার দেশ বাংলাদেশ। উন্নয়নের রোল মডেল খ্যাত দেশটিতে ক্রমেই বেড়ে উঠছে একটি শক্তিশালী মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠী, যাদের দ্রব্য ও সেবা ক্রয়ক্ষমতা সন্তোষজনক। বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে খোলা মানসিকতা, স্থানীয় বিপুল চাহিদা, সহজলভ্য এবং সস্তা শ্রম ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশে বিশ্বের অনেক দেশ বিনিয়োগ করে আসছে এবং বিনিয়োগে আগ্রহী আরও অনেক শিল্পোন্নত দেশ।

দীর্ঘ ৫০ বছরের পরীক্ষিত বন্ধু জাপান অত্যন্ত উদারচিত্তে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে যেমনÑদৃশ্যমান-অদৃশ্যমান অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুনীল অর্থনীতি, মানবসম্পদের উন্নয়ন, গ্যাস, বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করে আসছে। জাপানের আনুষ্ঠানিক উন্নয়ন সহযোগিতা কর্মসূচির সবচেয়ে বড় গন্তব্য বাংলাদেশ। ১৯৭২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গত অর্ধশতাব্দীতে জাপান ২৪.৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক সাহায্য এবং ঋণ হিসেবে দিয়েছে। এশিয়ায় বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার হলো জাপান। বাংলাদেশ মূলত গার্মেন্টস ও চামড়াজাতীয় দ্রব্য জাপানে রপ্তানি করলেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য হতে পারে সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাতে, যেমনÑ ফার্মাসিটিক্যালস, কৃষিজাত পণ্যদ্রব্য ও ফিশারিজ। জাপান থেকে বাংলাদেশ আমদানি করে লোহা, ইস্পাত, গাড়ি, মেশিনারিজ ইত্যাদি। বাংলাদেশ হলো এসব দ্রব্যের ব্যবসায় জাপানের একচেটিয়া বাজার। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮-১৯ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে জাপান-বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে সামান্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল (১.১৮ বিলিয়ন রপ্তানি, ২.০২ বিলিয়ন আমদানি)। তবে বিরাজমান এই সামান্য ঘাটতি নিজেদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে (মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির মাধ্যমে) দূর করা অসম্ভব কিছু নয়।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফর এবং বিভিন্ন পর্যায়ের আটটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর ঢাকা- টোকিও সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্লোবাল সাউথ যখন জাপানের কাছে পররাষ্ট্রনীতি পর্যায়ে গুরুত্বের বিষয় এবং বাংলাদেশের সঙ্গে জাপান ব্যাপক অংশীদারত্ব থেকে কৌশলগত অংশীদারত্বের কথা ভাবছে, ঠিক তখন প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর তার বিগত সফরগুলোর তুলনায় তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রধানমন্ত্রী ওই সফরে অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে কৌশলগত অংশীদারত্বে বাংলাদেশের পাশে অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করে জাপান।

কক্সবাজারে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, যুমনা সেতু, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং ঢাকা মেট্রোরেলের মতো আমাদের প্রায় সব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে পাশে ছিল বন্ধুদেশ জাপান। জাপানি জাইকা তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও সহায়তা দিয়ে আসছে, তৈরি করেছে আইসিটি মাস্টারপ্ল্যান, সাইবার সিকিউরিটি পলিসি। এ ছাড়াও বাংলাদেশ-জাপান ইন্ডাস্ট্রি আপগ্রেডেশন পার্টনারশিপ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশে জাপানের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) ছিল অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ; প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে স্পেশাল ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠিত হয়।

সম্প্রতি ঢাকা সফর করে জাপানি অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী নিশিমুরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরিকল্পনায় জাপানের অংশীদার হওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়ে ইঙ্গিত করেন, স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি ৫ থেকে ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। এখন ২০২৬ সালে এলডিসি পর্যায় অতিক্রম করার সময়সীমা ঠিক করেছে। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশটি উন্নত দেশের মর্যাদায় যাওয়ার লক্ষ্যও ঠিক করেছে। বিশ্বায়নের যুগে শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি গত ৫০ বছর যেমনটা ছিল তার চেয়ে উন্নত পর্যায়ে এই ঢাকা-টোকিও বন্ধুত্ব বা অংশীদারত্ব সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

শিশু শিক্ষায় সহযোগিতা, বাংলাদেশে শিল্পায়নে আরও বিনিয়োগসংক্রান্ত আলোচনা এবং বেশ কিছু সমঝোতা স্মারক সই করার পাশাপাশি ধরে নেওয়া যায় ইয়াসুতোশি নিশিমুরার বাংলাদেশ সফর দুই দেশের বাণিজ্যিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সম্প্রসারণে নিঃসন্দেহে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ও বঙ্গোপসাগরীয় সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে জাপানের কাছে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি জাপান-বাংলাদেশ মৈত্রী বৈশ্বিক কূটনীতিসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানেও অবদান রাখতে পারে বলে মনে করি। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হয়ে উঠতে জাপানের দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সমর্থন প্রয়োজন, তাতে করে জাপানের সহায়তায় বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগ এমনকি বার্গেনিংও করতে পারে।

জাপান-বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পরস্পরের সাহায্য নিতে পারে, বিভিন্ন বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে পারে। দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশেষ করে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় জাপানের কাছ থেকে অনেক শেখার রয়েছে বাংলাদেশের। জাপানের সঙ্গে বিগত বছরগুলোর মতো সামনের দিনগুলোতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখলে বাংলাদেশ যেমন জাপানের সাহায্যে সফলভাবে তার প্রাচ্যনীতি বাস্তবায়ন করতে উপকৃত হবে, তেমনি জাপান ও ভারত মহাসাগরে বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে বাংলাদেশের সরাসরি সংযোগের কারণে নানাভাবে উপকৃত হবে। পরস্পর নির্ভরশীলতার সম্পর্কের এই পর্যায়ে জাপান-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব আরও শক্তিশালী হবে আশা করা যায়। স্বাধীনতার ৫২ বছর পরও বাংলাদেশ নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থে জাপানের সঙ্গে তার কূটনৈতিক বন্ধন আরও মজবুত, আস্থাশীল ও অটুট করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।


  • সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা