ঐতিহ্য
মোহাম্মদ অংকন
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৩ ১৩:১২ পিএম
‘আপনার বাড়ি কোথায়?’ এই প্রশ্নের উত্তরে যখন বলি নাটোরে, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন কর্তার মনের ভেতর কয়েকটি নাম বা চিহ্ন অকপটে ভেসে ওঠে। যথা : বনলতা সেন, চলনবিল, উত্তরা গণভবন। তবে সবচেয়ে বেশি যে নামটি মানুষের মনের ভেতর জেগে ওঠে, তা হলো কাঁচাগোল্লা। তারপরই আবদারটা করে বসেন, কবে খাওয়াচ্ছি নাটোরের বিখ্যাত কাঁচাগোল্লা? মিষ্টি-মধুর এই আবদার কখনও-সখনও পূরণ করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়ানো একটা কৌতুক আছে, নাটোরের মানুষ বলেই যে সারা দিন কাঁচাগোল্লা খাই, এমনটা ভাববেন না! যা হোক, এই যে কাঁচাগোল্লার বরাত দিয়ে আমাকে বা আমার শহরকে অন্য জেলার মানুষ সহজেই শনাক্ত করতে পারছে, এই শনাক্তকরণই হচ্ছে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই)। উইকিপিডিয়ার তথ্য বলছে, ‘ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) হচ্ছে কোনো সামগ্রীর ব্যবহার করা বিশেষ নাম বা চিহ্ন। এই নাম বা চিহ্ন নির্দিষ্ট সামগ্রীর ভৌগোলিক অবস্থিতি বা উৎস (যেমন : একটি দেশ, অঞ্চল বা শহর) অনুসারে নির্ধারণ করা হয়। ভৌগোলিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সামগ্রী নির্দিষ্ট গুণগত মানদণ্ড বা নির্দিষ্ট প্রস্তুত প্রণালী অথবা বিশেষত্ব নিশ্চিত করে।’ এই সংজ্ঞার সূত্র ধরে সহজেই অনুমেয় হয় যে কাঁচাগোল্লাও নির্দিষ্ট একটি শহরকে সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করে আসছে।
বিশেষত্বের দিক
দিয়েও এটি মৌলিকত্ব বহন করে। অর্থাৎ কোনো পণ্য ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) হিসেবে স্বীকৃতি
পেতে যেসব মানদণ্ড লাগে, সেসব বিষয়ে কাঁচাগোল্লা উতরিয়ে আছে ইতোমধ্যেই। সেই কাঁচাগোল্লাকে
ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত করার বিষয়ে নাটোরের মানুষ দাবি তুলে আসছে
অনেক আগে থেকেই। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ বিষয়ে তেমন কোনো জোরালো পদক্ষেপ নিতে দেখা
যায়নি কিংবা ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি দাতা প্রতিষ্ঠানের নজরে আসেনি এই পণ্যটি।
কাঁচাগোল্লার জন্য গর্ববোধ করেন নাটোরবাসী। নাটোরের কাঁচাগোল্লার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের
অত্রাঞ্চলের আপামর মানুষের আবেগ, ভালোবাসা ও স্মৃতি। প্রায় আড়াইশ বছর আগে প্রথম তৈরি
হলেও আজও মিষ্টিটির সুনাম ধরে রেখেছে কারিগর ও বিক্রেতা-প্রতিষ্ঠানগুলো। নাটোর অঞ্চলের
যেকোনো বিয়ে, বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান এবং অতিথি আপ্যায়নে সরবরাহ করা হয়
কাঁচাগোল্লা। নাটোরে আসা দর্শনার্থীরাও কাঁচাগোল্লার স্বাদ লুফে নেয়। শুধু নাটোরে উৎপন্ন
হয় বলেই যে নাটোরবাসী কাঁচাগোল্লাকে নিয়ে এত গর্ববোধ করে, তা কিন্তু নয়। যে কাঁচাগোল্লার
কথা বললে নিজের জন্ম-অঞ্চলকে আর নতুন করে কোনো বিশেষণে বিশেষায়িত করার প্রয়োজন মনে
হয় না।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে
প্রকাশিত খবরে জানান যায়, ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেতে পারে নাটোরের
কাঁচাগোল্লা। ইতোমধ্যে নিবন্ধনের উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। নাটোরের জেলা প্রশাসক
সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ‘নাটোরের কাঁচাগোল্লাকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) হিসেবে
নিবন্ধনের উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নিবন্ধনের
আবেদন করা হয়েছে। এ ছাড়া এফিডেভিটের মাধ্যমে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, ডিজাইন ও
ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) বরাবর আবেদন পাঠানো হয়েছে।’ তবে যতদিন আন্তর্জাতিক
স্বীকৃতি কাঁচাগোল্লা পাচ্ছে না, ততদিন আমাদের দাবিকে তাচ্ছিল্য করে থামিয়ে রাখার কোনো
সুযোগ নেই। আমরা জেলা প্রশাসককেও বিনীত অনুরোধ করব, বিষয়টির অগ্রগতি কতদূর, তা দেখভাল
করার জন্য।
বলার কোনো অপেক্ষা রাখে না নাটোরের কাঁচাগোল্লা সারা দেশে প্রসিদ্ধ ও এর যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। তাই কাঁচাগোল্লাকে দ্রুত ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে নাটোরের ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা জরুরি হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে কাঁচাগোল্লার নকল প্রতিরোধে জেলা প্রশাসনকে তৎপর হওয়ার আহ্বান করছি। শেষ কথা এই যে, নাটোরের কাঁচাগোল্লাকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে ঘোষণা করা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।