জনস্বাস্থ্য
ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৩ ১৯:২৪ পিএম
আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৩ ০০:০৫ এএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
স্মরণে আছে, ২০১৯ সালের মে মাসে দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ১৭৯। কিন্তু জুন মাসেই সেই সংখ্যা বেড়ে এক হাজার ৮৮৪ জনে দাঁড়ায়। জুলাইয়ে রোগীর সংখ্যা ১৬ গুণ বেড়ে যায়। ওই বছর এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়, যা এক বছরে সর্বোচ্চ। সাধারণত বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। ডেঙ্গুর কারণগুলো অচিহ্নিত নয়। খোলা স্থানে পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশা ডিম পাড়ে। বিশেষত, ঘরে ও বাড়ির ছাদে টব, মাটির পাত্র, প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত বালতি বা ট্যাংক, নির্মাণাধীন ভবন, বাড়ির ছাদসহ আরও অনেক স্থানেই এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে। এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল। তবে কয়েক বছর ধরে বর্ষার আগেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে। চলতি বছর মৌসুমের আগেই ডেঙ্গু অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা অর্ধশততে পৌঁছেছে। প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ডেঙ্গু আর ঢাকায়ই সীমাবদ্ধ নেই। সারা দেশেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। আমরা দেখছি, টেকনাফে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু। অর্থাৎ সারা দেশই এখন ডেঙ্গুর হটস্পট। ডেঙ্গু আক্রান্তরা বিলম্বে হাসপাতালে ভর্তির ফলে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে এবং ২ জুলাই এক দিনে সর্বোচ্চ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হনÑ এ খবর ৩ জুলাই প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে। একই দিন সংবাদমাধ্যমে এও জানা গেছে, ঢাকার বাইরে রোগী বাড়ছে এবং ৫২ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। এমতাবস্থায় প্রয়োজন ডেঙ্গু মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নাগরিক সমাজ ও কর্তৃপক্ষের যূথবদ্ধ প্রয়াস জরুরি। কিন্তু আমরা সেখানেও বারবার ব্যর্থ হচ্ছি স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব থাকায়।
জলবায়ু পরিবর্তন
আমাদের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু যেভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে তাতে জলবায়ুকে
নির্ধারিত সংজ্ঞায় বেঁধে ফেলা এখন মুশকিল। বিশেষত, বছরের মৌসুম বিবেচনায় কিছু বিচার
করা কঠিন। কোন মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে তা এখন আর বলা যাচ্ছে না। যেকোনো সময় যেকোনো
পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটতে পারে। তবে যেহেতু প্রতিবছরই ডেঙ্গুর প্রকোপ একটি নির্দিষ্ট সময়ে
বাড়ে, সেহেতু আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সতর্ক থাকা প্রয়োজন ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের
বিরূপ প্রভাব আমরা উপলব্ধি করতে পারছি। কদিন আগেই তীব্র দাবদাহে আমাদের জীবন অতিষ্ঠ
হয়ে উঠছিল। তারও আগে শৈত্যপ্রবাহের ঝাপটাও পড়েছিল। আর বর্ষায় বৃষ্টি হচ্ছে তার স্বাভাবিক
নিয়মে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না সারা দেশে জলাশয়, নদ-নদী, খাল-বিল ইত্যাদি সংরক্ষণের
অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব হিসেবে দেশের অনেক স্থানেই বন্যার আশঙ্কা
দেখা দিচ্ছে। তা ছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলস্বরূপ সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক জায়গায়
জলাবদ্ধতাও দৃশ্যমান বাস্তবতা। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার কারণগুলো আমাদের অজানা নয়। এখন
নির্মাণাধীন ভবনে সারা বছরই পানি জমে থাকে। তাই এডিস মশা সহজেই ডিম পাড়তে পারে। তাই
শুধু মৌসুম বা পানি জমে থাকার দৃশ্যমান জায়গার দিকে তাকিয়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বিস্তারকে
যাচাই করা যাবে না।
কোনো দেশে জনসংখ্যার
ঘনত্ব আয়তনের তুলনায় অনেক বেড়ে গেলে স্বাস্থ্য খাত সঠিকভাবে সেবা দিতে পারে না। বিশ্বের
অনেক দেশেই আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা অনেক কম। সেসব দেশে স্বাস্থ্য খাত যতটা নিয়ন্ত্রিত
আমাদের মতো জনবহুল দেশে তা সম্ভব নয়। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এ জন্যই এত গুরুত্বপূর্ণ।
সারা দেশেই ঘনবসতি বেড়েছে। আর আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ডেঙ্গু একটি শহরভিত্তিক সমস্যা
ছিল। কিন্তু এখন তা বলতে গেলে যেন সর্বব্যাপী। সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হওয়ায় পলিথিন ও প্লাস্টিক
সামগ্রীর ব্যবহার বেড়েছে। অনুন্নত অনেক দেশেই প্লাস্টিকের ব্যবহার বেশি হয়। মূল সমস্যা
হলো, যেখানে-সেখানে প্লাস্টিক বা পলিথিন ফেলে দেওয়া। ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে।
আমরা সেসব ব্যবহার করি না। ফলে জলাশয়, ড্রেন, বাড়ির আনাচকানাচে পলিথিন বা প্লাস্টিকের
স্তূপ দেখা যায়। পার্বত্য অঞ্চলে পর্যটনশিল্পের বিস্তার ঘটেছে। সেখানেও অনেকেই যেখানে-সেখানে
প্লাস্টিক ফেলছেন। আমরা জানি, প্লাস্টিকই ডেঙ্গুর একমাত্র কারণ নয়। কিন্তু প্লাস্টিকের
মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে সারা দেশে ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে। এমনকি গ্রামাঞ্চলেও মূলত এই
প্লাস্টিকের কারণেই ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে বেশি মাত্রায়। স্মরণে আছে, অতীতে সরকার প্লাস্টিক
বা পলিথিন পণ্য ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে
তারা ব্যাপক কড়াকড়িও আরোপ করেছিল। তা কিছুদিনের জন্য বাস্তবায়ন করাও সম্ভব হয়েছিল।
কিন্তু জনগণের মধ্যে সচেতনতার অভাব থাকায় প্লাস্টিক-পলিথিন পণ্যের ব্যবহার বন্ধ করা
যায়নি।
চাহিদার নিরিখে
আমরা প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করতে পারব না। তাই আমাদের মূল সমস্যার দিকে নজর গভীর
করতে হবে। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব রয়েছে। কীভাবে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত
করা যায় এর প্রাথমিক ধারণা অনেকেরই নেই। কর্তৃপক্ষ এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে বরাবরই প্রত্যয়
ব্যক্ত করে আসছে। তারা এ জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নিচ্ছে। কিন্তু তাদের কাজের পরিসরের
কথাও আমাদের ভাবতে হবে। কারও ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবন বা বাড়ির আঙিনা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন
রাখার দায়টা কিন্তু নিজেরই। মশারি অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। শিশুরা দিনে ঘুমালে তাদের
মশারির নিরাপত্তাবেষ্টনীর ভেতর রাখতে হবে। তা ছাড়া বাইরে বের হলে ফুলস্লিভ জামা পরার
পাশাপাশি মশা নিরোধক ক্রিম গায়ে মাখতে হবে। ডেঙ্গু ঠেকাতে যেসব স্বাস্থ্য সতর্কতা রয়েছে
সেগুলো মেনে চলা জরুরি। বাড়িতে কোথাও পানি জমলে তা দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে
হবে। ছাদবাগান কিংবা বারান্দায় যারা টবে গাছ লাগান তাদেরও বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে। এসব
বিষয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ক্ষেত্রে জনসচেতনতা
বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রচারকার্য চালাতে পারে।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র
ভারতের দিকেই তাকানো যাক। তারা যেকোনো চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আগে ধূমপানের ক্ষতি সম্পর্কে
সচেতনতা কার্যক্রম চালায়। এমনকি জনস্বাস্থ্য বিষয়েও তারা ব্যাপক প্রচারণা চালায়। জনসচেতনতা
বাড়াতে আলাদা পরিকল্পনা নিতে পারে। মিডিয়াকে ব্যবহার করে খুব সহজেই ডেঙ্গু স্বাস্থ্য
সচেতনতা কার্যক্রম চালানো যেতে পারে। এ কথাও সত্য, যতই ওষুধ ছিটানো হোক আর কামান দাগানো
হোক, মশা মরবে সামান্য ও সাময়িককালের জন্য, এটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। কয়েক দিন পর
আবার মশা হবে। আবার ডেঙ্গু হবে। মানুষও মরবে। এই দুঃখজনক বিষয়গুলো ইতোমধ্যে আমাদের
সামনে দফায় দফায় প্রতিভাত হয়েছে। মশা প্রতিরোধের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন পরিবেশ সংরক্ষণ।
কিন্তু সেই কাজ কি হচ্ছে? অন্য নগর-মহানগর তো বটেই, ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন স্থানে আবর্জনাময়
ও অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি জিইয়ে থাকার পেছনে সবারই কমবেশি দায় রয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণের
মাধ্যমে স্বাস্থ্য সচেতন বলে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকত এবং একই সঙ্গে পরিবেশের
সুরক্ষা কিংবা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজটি যদি লাগাতারভাবে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে চলে
তাহলে এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার উৎসগুলোর পথ বন্ধ করা কঠিন কিছু নয়। সংবাদমাধ্যমে
প্রায়ই দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জলাশয় দূষণের শিকার হচ্ছে। তবে এই জলাশয়গুলোতে
শুধু মশার ওষুধ ছিটালে হবে না। জলাশয়ের পানি পরিষ্কার এবং সংরক্ষণের পদক্ষেপ নিতে হবে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ ঠেকানোর জন্য সারা বছরই কাজ করতে হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধ সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। ডেঙ্গুর কারণগুলো অচিহ্নিত নয়। কিন্তু এই চিহ্নিত কারণগুলো জানা সত্ত্বেও ডেঙ্গু ঠেকানো যাচ্ছে না শুধু জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবের কারণে। বিশেষত বিদ্যালয়ে আমরা ভারি ভারি বিষয়ে পাঠদান করি। কিন্তু স্বাস্থ্য সতর্কতার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের মনোযোগ কম। আমরা যেন অতীত ভুলে না যাই। সময়ের কাজ যদি সময়ে না করা যায়, তাহলে এর মাশুল কতটা ভয়াবহভাবে দিতে হয়Ñ এমন নজিরও আমাদের সামনে আছে। বিদ্যমান পরিস্থিতির আলোকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জোরদার পদক্ষেপ নিতে হবে। তা ছাড়া দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে। জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনা করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যক্রম চালাতে হবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে সারা বছরই যেন ডেঙ্গুর বিস্তার রোধ করা যায় এই পরিকল্পনাও সমগুরুত্বপূর্ণ। কথা নয়, কাজ দেখতে চাই। প্রতিরোধমূলক সব ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির পথও মসৃণ করতে হবে।