রাশিয়া
ডেভিড ইগনাটিয়াস
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৩ ০৫:৫৩ এএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
২৪ জুন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যেন মহাকালের অন্ধকারে ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে গিয়েছিলেন। তবে চোখের পলকেই তার ঘোর ভাঙে। প্রথমে সামরিক বিদ্রোহের ঘোষণা দিয়ে কঠোর প্রতিকার নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি সমঝোতার পথে যান। পুতিনের নড়বড়ে অবস্থা নিয়ে ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞরা অনেক মন্তব্য করেছেন। কিন্তু তার অবস্থা যে তার চেয়ে করুণ, এমনটি সাম্প্রতিক ঘটনাটিই প্রমাণ করে। ওয়াগনার মিলিশিয়া বাহিনী প্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোজিনের সঙ্গে পুতিন সমঝোতার পথে হেঁটেছেন। তবে এই সমঝোতা সাময়িক সময়ের জন্য। ধারণা করা হচ্ছিল, প্রিগোজিন বেলারুশের দিকে যাবেন। বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার লুকাশেঙ্কোর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব অনেক দিনের। সম্ভবত লুকাশেঙ্কোর সহায়তায় তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো তিনি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। তবে তিনি আফ্রিকার দিকে এগোলেন।
শুরুতে এই পরিস্থিতি বিদ্রোহ না ভাবলেও এটি সত্যিই সামরিক বিদ্রোহ হয়ে উঠেছিল। ২১ জুন প্রিগোজিন তার ২৫ হাজার ওয়াগনার মিলিশিয়া বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে মস্কো অভিমুখে মার্চ করে এগোচ্ছিলেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, রাশিয়ান এফএসবি প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। তবে তা খুব কার্যকর হয়নি। যদিও পুতিন মস্কো প্রতিরক্ষার সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। পুতিন শীতলকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমরা সম্ভবত ১৯১৭ সালের মতোই কোনো ঘটনা ঘটতে দেখছি। তখন রাষ্ট্র একটি ভুল যুদ্ধে নিপতিত হয়েছিল।' পুতিনের মতে, ওই সময় রাশিয়ানরাই রাশিয়ানদের মারছিল। ২১ জুন ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ সব জায়গায় একটি প্রশ্নই ভেসে বেড়াচ্ছিল, প্রিগোজিন আদৌ তার 'ন্যায়বিচারের কুচকাওয়াজ' চালু রাখবেন কি না এবং পুতিন বিদ্রোহ দমনে সামরিক বাহিনীকে গুলি চালনার নির্দেশ দিবেন কি না। যতটুকু জানা গেছে, ওয়াগনার বাহিনী উত্তরের দিকে এগোয় এবং সামরিক বাহিনী তাদের কোনো বাধা দেয়নি।
পাগল ছাড়া আর কেউ এমন সময়ে পথ হারায় না। পুতিন কিংবা প্রিগোজিন এই দুজনের কাউকেই পাগল বলা যাবে না। দুজনই চাল চালার চেষ্টা করেছেন যেখানে দুজনেরই হারানোর কিছু নেই। পুতিনের কাছে সামান্য কিছু সিদ্ধান্ত ছিল। প্রতিটি সিদ্ধান্তই খারাপ এবং তিনিও এ ব্যাপারে সচেতন। রস্তভে ওয়াগনার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার ক্ষেত্রে তিনি চেচেন ফোর্সের কমান্ডার রামজান কাদিরভকে ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু এর পরিণতি হতো নৃশংস। তা ছাড়া সামরিক বাহিনীর ওপর নিজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েও পুতিনের সন্দেহ ছিল। তিনি এমন এক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে চলছিলেন যেখান থেকে মুক্তি নেই । সচরাচর পুতিন ভুল চাল চালেন না যদি আমরা ইউক্রেন হামলার বিষয়টি বাদ দেই।
এই বিদ্রোহের উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুতিন এই বিদ্রোহ দমাতে সক্ষম হয়েছেন। এজন্য তাকে সামরিক বাহিনী ব্যবহার করতে হয়নি। এই সত্য অনস্বীকার্য যে, প্রিগোজিন তার জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। পুতিনের একটি গুণ হচ্ছে, যদি আমরা এটিকে গুণ হিসেবে মেনে নিই, তাহলে একচ্ছত্র শাসক হিসেবে তিনি গুণী। অন্তত তার অভিব্যক্তি কখনও মলিন হয় না। যেন প্রতিবারই বলতে চান, ‘নিজের দুরবস্থা কাউকে বুঝতে দিও না।' তার অধস্তন সবার মধ্যে মনোমালিন্য থাকলেও তিনি পাত্তা দেন না। সম্ভবত ছোটখাটো বিষয় নিয়ে এত মাথা ঘামান না। কারণ বিগত এক বছর ধরেই প্রিগোজিন রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শিগুর সমালোচনা করে আসছেন। পুতিন এসব নিয়ে কখনও মন্তব্য করেননি। ২৪ জুনের হিসাব অবশ্য আলাদা। ১৯১৭ সালের গৃহযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বিদ্রোহ দমনের জন্য প্রিগোজিন যে বাণী উচ্চারণ করেছেন সেদিকে নজর দেওয়া দরকার। তবে প্রিগোজিন কৌশলগতভাবে দোষ চাপিয়ে দিয়েছেন পশ্চিমা শক্তির ওপর। তিনি বলেছিলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে এখন পশ্চিমা সামরিক, অর্থনৈতিক এমনকি প্রযুক্তিগত যন্ত্রও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আমাদের ভেতরে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনিরাপত্তা এবং জাতীয় গৌরবের ভাবনার বিষক্রিয়ার কারণে পুতিন ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে পারছে।'
বাইডেন প্রশাসনও এই বিদ্রোহের বিষয়ে মতামত দিয়েছে। তবে তাদের বক্তব্য অনেকটা নেপোলিয়নের ওই বাণীর মতো শুনিয়েছে, ‘নিজের শত্রু যখন ভুল করে তখন তাতে বাধা দিও না।' বাইডেন এবং তার দল অন্য দেশের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। তাদের মূলনীতি একটাই— মিত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং সব সময় প্রস্তুত থাকা। তবে তারা কোয়াড থেকে শুরু করে বিভিন্ন বৈশ্বিক শক্তিকে একটি বার্তাই দিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে বেশি হাঙ্গামা না করাই ভালো। রাশিয়ার পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে অবস্থা আরও ভয়ংকর মোড় নেবে। তাদের অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে লাভ খোঁজার প্রয়োজন নেই। বলা বাহুল্য, বার্তাটি ইউক্রেনের জন্যই বেশি প্রযোজ্য। ইউক্রেন যেন রাশিয়ার বিদ্রোহের পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো বড় সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা না করে। যদি তা করা হয় তাহলে সামরিক বাহিনী অন্তর্ভুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও বাজে দিকে মোড় নেবে।
ইউক্রেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পরামর্শ মেনে নিয়েছে তা আমরা দেখতে পেয়েছি। প্রশ্ন হচ্ছে, সামনে কী হতে চলেছে। পুতিনের সামনে সমস্যার পাহাড়। সমস্যা না বলে বিপদ বলাই ভালো। মস্কোতে মার্চ করার সময় প্রিগোজিন সোজাসাপ্টা বাস্তবতা তুলে ধরেছিলেন। ইউক্রেন রাশিয়ার জন্য বিপদ হয়ে ওঠেনি। বরং এই আক্রমণের যৌক্তিক কারণ নেই। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ যে বড় ভুল তা নিয়ে আর সন্দেহ নেই। পুতিনের মতো শীতলমানবও এই অশান্তির আগুন সহজে নেভাতে পারবেন কি না সন্দেহ রয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন