সম্পাদকীয়
সম্পাদক
প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৩ ১৪:১৫ পিএম
অলঙ্করন : প্রবা
এবার অকালেই ডেঙ্গু
দেখা দিয়েছে। এরপর মৌসুমের শুরুতেই আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, জুন মাসের প্রথম ১০ দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৯৯৯
জন। এই সম্পাদকীয় লেখার সময় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ১৫৬ জন। এর মাঝে ঢাকায় ১৪৮ জন এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন
হাসপাতালে আটজন। তার অর্থ ডেঙ্গু শুধু রাজধানীতেই নয়, ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীর বাইরেও।
অথচ একসময় ডেঙ্গু শুধু রাজধানীবাসীরই আতঙ্ক ছিল। রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ ছিল ডেঙ্গুর বাহক
এডিস মশা। কিন্তু গত এক-দেড় দশকে শুধু এডিস মশাবাহিত প্রাণঘাতী এই জ্বর ছড়িয়ে পড়েছে
দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলাতেও। এমনকি রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও।
গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারে মৌসুমের শুরু থেকেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য
বিভাগের আশঙ্কা ছিল। যথাসময়ে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তাদের সেই শঙ্কাই
বাস্তব রূপ নিতে যাচ্ছে। এরই বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে ১১ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ
‘ডেঙ্গু আক্রান্ত-মৃত্যু বাড়ছে, সত্যি হচ্ছে আশঙ্কা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা
হয়েছে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৫৪৯ জন রোগী, যাদের ৪৭৩ জন ঢাকায়
এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ৭৬ জন। সব মিলিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু
আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে তিন হাজার ২১ জন রোগী। শেষ ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত
একজনের মৃত্যুর খবরও এসেছে। এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জুনের প্রথম ১০ দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত
নয়জনের মৃত্যুর খবর এসেছে এবং এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২
জনে। প্রতিবছরই সরকারের তরফে স্বাস্থ্য দপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থা ডেঙ্গুর বিষয়ে সচেতনতা
ও সতর্কতা জারি করে। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করে,
পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালায়। কিন্তু তাতে যে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমেনি, তা স্পষ্ট। গত কয়েক
বছরে এ রোগের প্রকোপ এতটাই বেড়েছে, যা রূপ নিচ্ছে মহামারির। আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই
লিখেছিলামÑপ্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। সংবাদমাধ্যমেও এ বিষয়ে সচেতনতামূলক লেখালেখি
কম হয়নি। কিন্তু অসারের তর্জন গর্জনই যেন সার। ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে অনিয়ন্ত্রিত এবং অব্যবস্থার
কারণে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে যেসব কার্যকর পদক্ষেপের কথা নানা সময়ের আলোচনায় উঠে এসেছে,
তা বাস্তবায়নের দিকেও আমাদের আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে।
২০২২ সালে ডেঙ্গু
আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৩২১। মৃতের সংখ্যা ছিল ২৮১। ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত
হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দেশের ইতিহাসে এক বছরের হিসাবে রেকর্ড করে। তৈরি হয়েছিল এক দিনে
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার রেকর্ডও। উপচে পড়া রোগীর ভিড়ে হাসপাতালগুলোতে
তৈরি হয়েছিল শয্যাসংকট। আমাদের স্মরণে আছে, স্বজনদের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে
দৌড়াতে হয়েছে রোগী নিয়ে, যা ডেঙ্গু চিকিৎসায়ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছিল। ২০২১ সালেও ডেঙ্গু
আক্রান্ত হয়ে মারা যান ১০৫ জন। ২০১৯ সালে শনাক্ত হয়েছিল এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ ডেঙ্গু
রোগী। আমরা আশা করি, কর্তৃপক্ষের ত্বরিত সিদ্ধান্ত ও দায়িত্বশীলতায় অতীতের এই তিক্ত
ও বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি এবার হতে হবে না।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি
যেন কোনোভাবেই আগের অবস্থাকে ছাড়িয়ে যেতে না পারে কর্তৃপক্ষের সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি
রাখা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে পরিস্থিতি নাজুক হয়ে ওঠার আগেই সর্বত্র সতর্কতামূলক ব্যবস্থা
গ্রহণ করতে হবে। শুধু ডেঙ্গুই নয়, ইতোমধ্যে করোনাও চোখ রাঙাতে শুরু করেছে। করোনা শনাক্ত
রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। ডেঙ্গু ও করোনা উভয়ই যদি একযোগে হামলে পড়ে, তা মোকাবিলা কষ্টকর
হয়ে উঠবে। আমরা সফলতার সঙ্গে করোনা অতিমারিকাল পাড়ি দিলেও সেসময়ে আমাদের স্বাস্থ্য
খাতের নানান অসঙ্গতি চিহ্নিত হয়েছিল। করোনাকাল পাড়ি দিয়ে এসেও আমরা কি সেসব দুর্বলতা
কাটিয়ে উঠতে পেরেছি? স্বাস্থ্য খাত করণীয় কাজগুলো কি করতে পেরেছে? উত্তর প্রীতিকর নয়।
এজন্য দায়ীদের জবাবাদিহির মুখোমুখি করা জরুরি। কারণ কোনোভাবেই আমরা পরিস্থিতি জিইয়ে
রাখতে দিতে পারি না। আমরা মনে করি, দেরি হলেও এখনও সময় আছে। ডেঙ্গু ও করোনা মোকাবিলায়
ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে স্বাস্থ্য বিভাগকে।