× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

উপসম্পাদকীয়

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ

ড. আমেনা মহসিন

প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৩ ১৫:১১ পিএম

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

পাইলট প্রকল্পের অধীনে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্থগিতের আহ্বান বাংলাদেশকে জানিয়েছেন জাতিসংঘে মিয়ানমারের পরিস্থিতিবিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার টম অ্যান্ড্রুস। ৮ জুন জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ তার বক্তব্য সংবলিত এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ মিয়ানমারে রোহিঙ্গা শরণার্থী ফেরাতে বিভ্রান্তিকর ও জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। টম অ্যান্ড্রুসের মতে, মিয়ানমারের পরিস্থিতি আর যা-ই হোক নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত নয়। এ ছাড়া তিনি বেশ কিছু অভিযোগ তুলে ধরেছেন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে পাইলট প্রকল্প বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। তাদের এই বতব্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধের যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ থাকতে পারে না। কিছু বিষয় আমাদের বাস্তবসম্মতভাবে বিবেচনা করতে হবে। রোহিঙ্গা ইস্যু একটি জটিল সমস্যা। আমাদের কূটনৈতিক চ্যানেল বহুদিন ধরে এ সমস্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তৎপরতা চালাচ্ছে।

বাস্তবতা বিবেচনায় রোহিঙ্গারা এখানে আজীবন থাকতে পারে না। এমনকি রোহিঙ্গারাও চায় স্বদেশে অর্থাৎ মিয়ানমারে ফিরে যেতে। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা নেতারা জাতিসংঘের এই আহ্বানের বিরুদ্ধে নিজেদের শক্ত অবস্থান তুলে ধরেছে্ন। দাবি আদায়ের কথা বলে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিন বাংলাদেশে আটকে রাখার চক্রান্ত চলছে বলে অভিমত জানিয়েছে্ন তারা। রোহিঙ্গা নেতারা জানিয়েছেন, দেশে ফেরার আগে নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে তারা যে দাবি জানিয়েছে তা বাংলাদেশে সম্ভব নয়। প্রত্যাবাসনবিরোধী ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে ৮ জুন কক্সবাজারে ডজনখানেক ক্যাম্পে বিক্ষোভ সমাবেশ করে রোহিঙ্গারা। তাই রোহিঙ্গাদের দাবির ভিত্তিতে এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার কথা ভেবে তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে মানবাধিকারের বিষয়গুলো অবশ্যই প্রাধান্য পাবে। মিয়ানমারের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। তবে মানবাধিকার, মর্যাদাপূর্ণ, টেকসই ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার দায় মিয়ানমারের। এজন্য বাংলাদেশের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার যুক্তিসঙ্গত কোনোই কারণ নেই। এক্ষেত্রে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে।

বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। মিয়ানমারে ভয়াবহ গণহত্যার পর রোহিঙ্গাদের জীবন ও ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে মানবিক বিবেচনায় তাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। তারপর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে বাংলাদেশ কূটনৈতিক তৎপরতা চালু রেখেছিল। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকা কিছুটা হলেও বিস্ময়কর। আমরা দেখছি, এই দীর্ঘ সময়ে আন্তর্জাতিক মহল সব সময় বাংলাদেশের ওপর নানা দোষ চাপিয়ে দিয়েছে। এরই সাম্প্রতিক উদাহরণ টম অ্যাান্ড্রুর বক্তব্য। বাংলাদেশের তৎপরতাকে জবরদস্তিমূলক বলার পেছনে যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। আমরা বরাবরই দেখছি আন্তর্জাতিক মহলকে সব দোষ বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিতে। অথচ গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় মিয়ানমারের ওপর পড়ে। এর আগেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ রোহিঙ্গারা গণহত্যার শিকার এ বিষয়টিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দায় মিয়ানমারের ওপরই পড়ে। অথচ তাদের কোনো চাপ দেওয়া হচ্ছে না। যে রাষ্ট্রগুলো রোহিঙ্গা বিষয়ে মতামত দিচ্ছে তারা মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। শুধু তাই নয়, মিয়ানমারের বিনিয়োগও বন্ধ নেই। ভূরাজনীতি বা ভূ-অর্থনীতি যে নামই দেওয়া হোক না কেন, মিয়ানমারের কিছুই তো থেমে নেই। মুখে বললে তো কোনো সমাধানে পৌঁছানো যাবে না।

আজ হোক কাল হোক, একসময় রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে হবে। রোহিঙ্গাদের পর্যায়ক্রমে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে পরিকল্পনার মাধ্যমে। বিষয়টি বাংলাদেশের সামর্থ্যের কথা নয়। এটি নিয়মের বিষয়। আন্তর্জাতিক আইন বা নীতি অনুসারে কোনো দেশের নাগরিক অন্য একটি রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বেশি সময় থাকতে পারে না। একটি দেশ মানবাধিকার লঙ্ঘন করে তাদের নাগরিকদের দেশচ্যুত করেছে। সেখানে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে এবং একটি গোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন করে অন্য একটি দেশের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই যে দেশ এমন অপরাধ করেছে তাদের অপরিণামদর্শিতার দায় তাদেরই। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে অবশ্যই তৎপর হতে হবে এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মহলকে বুঝতে হবে, মিয়ানমার তাদের দেশের মানুষকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করেছে এবং মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য বাধ্য করতে নানা চাপ প্রয়োগ করতে হবে। এই মুহূর্তে জাতিসংঘকে এমন দৃঢ় অবস্থান নেওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, জাতিসংঘ একা কাজ করে না। আন্তর্জাতিক শক্তি এখানে বড় প্রভাব রাখছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কথাই ধরা যাক। যুদ্ধ সংগঠিত করার জন্য রাশিয়ার ওপর একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এসব স্যাংশনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের কোনো অবস্থান দেখতে পাওয়া যায় না। নাম উল্লেখ নাই বা করলাম, যে রাষ্ট্র গণহত্যা বা মানবাধিকার লঙ্ঘন করে এমন রাষ্ট্রের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক রাখার বিষয়ে সব সময় অনীহা প্রকাশ করা হলেও মিয়ানমারের ক্ষেত্রে এমন কিছু তো দেখা যাচ্ছে না। যদি মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক মহলে এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতো তাহলে মিয়ানমার সতর্ক অবস্থান নিতে বাধ্য হতো। যদি তা না করা হয় তাহলে সেখানকার পরিস্থিতির উন্নতির প্রত্যাশা দুরাশাই থেকে যাবে। মানবাধিকার এবং গণহত্যা দুটি বিষয়ের প্রভাব আলাদা। মিয়ানমারে একটি গণহত্যা সংঘটিত হলেও এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ একেবারে নেই বললেই চলে। যদিও এ বিষয়ে পালটা যুক্তি আসতেই পারে। টম অ্যান্ড্রু পাইলট প্রকল্প বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এক্ষেত্রে একাধিক যৌক্তিকতাও দেখিয়েছেন। তবে তার যৌক্তিকতাগুলো ঠিক না বেঠিক তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

পাইলট প্রকল্প বন্ধে টম অ্যান্ড্রুর যৌক্তিকতাগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করতে পারি। কিন্তু এই প্রকল্প বন্ধ করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। মিয়ানমারে ফিরতে যে রোহিঙ্গারা রাজি হয়েছেন তাদের অধিকার সেখানে নিশ্চিত হবে কি না তা আলোচনা পক্ষে নিশ্চিত করতে হবে। এমন পথে না গিয়ে ইউএনএইচসিআর ২৩ রোহিঙ্গার খাদ্যসহায়তা বন্ধ করে দিয়েছিল। কেন এই সহায়তা বন্ধ করা হয়েছে, তার সঠিক কারণ জানানো হয়নি। সে সময়ও বাংলাদেশ বিকল্প পদ্ধতিতে তাদের খাদ্যসহায়তার ব্যবস্থা করেছে। এখানে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের দায়বদ্ধতার জায়গা সুষ্ঠুভাবে পালন করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, জাতিসংঘ কি এক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে না। আমি মনে করি, পাইলট প্রকল্প বন্ধ না করে প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলকে ইতিবাচক ভূমিকা নিতে হবে। বাংলাদেশ বরাবরই স্বেচ্ছাসেবী এবং স্বচ্ছ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার পক্ষাবলম্বন করে আসছে। আমরা যেন এই অবস্থান ধরে রাখতে পারি তা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের বিরুদ্ধে টম অ্যান্ড্রুর অভিযোগগুলোর সাপেক্ষে তথ্য, পরিসংখ্যান কিংবা আপেক্ষিকতার ভাব রয়েছে। ৯ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে প্রকাশ, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ এনেছেন টম অ্যান্ড্রু। এই তথ্য তিনি কীভাবে পেলেন তা এখনও জানা যায়নি। অথচ ৮ জুন রোহিঙ্গা নেতারা সমাবেশে জানিয়েছেন, ছয় বছর ধরে তারা বাংলাদেশে জীবনযাপন করছেন। তারা দ্রুত নিজের বসতভিটায় ফিরতে চান। রোহিঙ্গাদের স্বতস্ফূর্ততা এবং টম অ্যান্ড্রুর এই অভিযোগ সাংঘর্ষিক। সন্দেহ করা হচ্ছে, একটি মহল প্রত্যাবাসন প্রকল্পের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। বিষয়গুলো আমাদের খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ রোহিঙ্গারা আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন সীমাবদ্ধ জীবনযাপন ও নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত হওয়ায় তারা নানা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এ ছাড়া তারা নানাভাবে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রয়েছে নিরাপত্তা ঝুঁকিও। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ওপর অযৌক্তিক চাপ তৈরি হচ্ছে যা আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে যথেষ্ট।

পাইলট প্রকল্প বন্ধের বিরুদ্ধে টম অ্যান্ড্রুর অভিযোগগুলোর উৎস আমাদের জানা নেই। আমাদের তরফেও জানা প্রয়োজন, তারা কীভাবে এবং কেন এসব তথ্য বের করে পাইলট প্রকল্প বন্ধ করতে চাচ্ছেন। জোরপূর্বক নানা অভিযোগ জাতিসংঘ আমাদের চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। আমাদের এই তথ্যগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। টম অ্যান্ড্রু যে অভিযোগ এনেছেন, তা সঠিক না ভুল তা যাচাই করার জন্যও আলোচনা করতে হবে। পাইলট প্রকল্প বন্ধ নয় বরং সমস্যা সমাধানে কী করা যায় তার পথ আমাদের খুঁজে নিতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা, বিশ্বনেতৃত্ব বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের এবং বাংলাদেশের ভূমিকাকে মানবিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে মূল্যায়িত করবে। 


  • কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা