× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নগর পরিকল্পনায় যেসব অনুশীলন জরুরি

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৩ ১০:৫৮ এএম

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু প্রকৃতিই নয়, পড়ছে জনজীবনেও। একদিকে নগরায়ণ এবং অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার মতো সমস্যা থাকায় আমাদের নানা জটিলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। মানবসৃষ্ট কাঠামো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানানসই না হওয়ায় এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে আমাদের শরীরে। খেয়াল করলে দেখা যায়, গ্রামীণ এলাকার তুলনায় নগর এলাকায় গাছপালা কম থাকায় তাপমাত্রাও বেশি। নগরের অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে নগর পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক এবং আবাসন ভবন তৈরির কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব আছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের নগর পরিকল্পনায় কিছু ত্রুটি রয়েছে। দেখা যাবে, নগরের কিছু কিছু এলাকায় মানুষের উপস্থিতি বেশি। এসব এলাকায় জনসমাগম বাড়ার মূল কারণ অবকাঠামোর ঘনত্ব বেড়ে যাওয়া। কিন্তু এই ঘনত্ব কীভাবে বাড়ে? একসময় আবাসিক এলাকায় বহুতল ভবন এত বেশি ছিল না। তখন আবাসিক ভবনগুলো ছিল এক বা দুই তলাবিশিষ্ট। পরবর্তী সময়ে কিছু কিছু এলাকায় ছয় তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে একদিকে মানুষকে মাথা গোঁজার একটি ব্যবস্থা করে দেওয়া হলো, সঙ্গে জনসংখ্যার ঘনত্বও বাড়াল। সত্যিকার অর্থে, আবাসিক এলাকায় পরিকল্পনা অনুসারে ভবন নির্মিত হচ্ছে না।

একটি আবাসন ভবন নির্মাণের সময় সেটির পার্শ্ববর্তী ভবনের সঙ্গে ওই ভবনের দূরত্ব নির্ধারিত থাকে। এই সামান্য ফাঁক দিয়ে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু আমাদের দেশে ভবনগুলোর মধ্যকার দূরত্ব অল্প। একে তো ভবনের উচ্চতা বেশি, অন্যদিকে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাব। ফলে আমাদের আবাসন এলাকাগুলোতে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কংক্রিটের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তাপমাত্রা হয় বেশি। তা ছাড়া দাবদাহ আমাদের ভবনের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। দাবদাহে অতিষ্ঠ সচ্ছল ও সামর্থ্যবানরা গরম থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য এয়ারকন্ডিশন কিনছেন। এসি ব্যবহারেরও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এতে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা বাইরে নির্গমন করা হচ্ছে। ফলে আবাসিক এলাকার তাপমাত্রা বাড়ছে। এবার যদি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত এলাকার দিকে আমরা চোখ ফেরাই তাহলে দেখব সেখানে এক আবাসনের থেকে অন্য আবাসনের দূরত্ব আরও কম। এসব এলাকায় জনগণ আরও বেশি তাপমাত্রাজনিত সমস্যায় ভুগছে। বস্তি এলাকায় অধিকাংশ ঘর টিনের তৈরি। টিন প্রচুর তাপ শোষণ করে বিধায় সেখানে মাত্রাতিরিক্ত গরম থাকে। অর্থাৎ বাণিজ্যিক অবকাঠামো বাদে বসবাসের জন্য নির্মিত অবকাঠামোতেই বড় ধরনের সমস্যা রয়ে গেছে।

বাণিজ্যিক ভবনগুলোর ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড অনুসরণের কথা বলা হলেও আবাসন ভবনের ক্ষেত্রে এই ভবন নির্মাণ নীতিমালা একেবারেই অনুপযোগী। বিল্ডিং কোডে এক ভবন থেকে অন্য ভবনের দূরত্ব কীভাবে গড়ে তুলতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে যা যা নির্দেশনা রয়েছে তা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নির্ধারণ করা হয়েছে। একটি ভবনের ভেতর পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ঢোকার জন্য যে পরিমাণ জায়গা প্রয়োজন তা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নির্ধারণ করতে হয়। আমাদের নগর পরিকল্পনায় এখনও বিজ্ঞানচর্চার যথেষ্ট অভাব আছে। ১৯৯৬ সালের আগে ভবন নির্মাণসংক্রান্ত নীতিমালায় ছিল, যেখানে ভবন নির্মাণ করা হবে তার সামনে থাকা রাস্তার প্রশস্ততার ওপর ভিত্তি করে ভবনের উচ্চতা নির্ধারিত হবে। কারণ এই রাস্তাঘাট আমাদের আলো-বাতাসের অন্যতম বড় উৎস। ওই সময় রাস্তার প্রশস্ততার দ্বিগুণ উচ্চতার ভবন নির্মাণ করার অনুমোদন ছিল। বিজ্ঞানসম্মত উপায় অনুসারে, রাস্তার প্রশস্ততা অনুসারে আবাসিক ভবন নির্মাণ করতে হবে। অথচ ২০০৮ সালে আবার এ নিয়মের পরিবর্তন করা হলো। রাস্তার প্রশস্ততাকে পুরোপুরি এড়িয়ে নতুন পরিকল্পনা করা হলো। বলা হলো রাস্তার প্রশস্ততার সঙ্গে অবকাঠামোর উচ্চতার সম্পৃক্ততা নেই। তারপরই উঁচু উঁচু ইমারত নির্মাণ শুরু হলো। তখন থেকেই আমাদের ভবনগুলোতে আলো-বাতাসের অভাব দেখা দিতে থাকল। ছোট ছোট রাস্তার পাশে উঁচু উঁচু ইমারত নির্মাণের ফলে আলো-বাতাসের স্বল্পতা বেড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে বাঁচতে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে নগরের ইমারত নির্মাণ বিধিমালার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করা এবং সঠিকভাবে তা বাস্তবায়ন করে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ও দূষণমুক্ত পরিবেশ নির্মাণ করা গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবগুলো এড়ানো যাবে। কারণ অতিরিক্ত গরম ঠেকাতে অনেকে এসি ব্যবহার করছেন, যা বাইরের তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এমনটি কোনোভাবেই সুখকর কিছু হতে পারে না। আবাসিক এলাকার ভবনগুলো এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে, যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পাওয়া যায় এবং পাশাপাশি প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই প্রাকৃতিক আলো-হাওয়ার ব্যবহারের দিকে গুরুত্ব না দিয়ে ফ্লোর স্পেস বাড়ানোর দিকেই মনোযোগ দেওয়া হয় বেশি। নগর এলাকাকে নষ্ট না করে প্রয়োজনের ভিত্তিতে তা বাড়ানো যেতে পারে। নগরের কিছু কিছু এলাকায় অনেক পুরোনো ভবনও জীবনযাপনের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করে নির্মাণ করা হয়নি। আর জীবনযাপনের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত না হলে তা আমাদের স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলবেই। এমনকি নতুন করে যেসব এলাকায় নগরায়ণ হচ্ছে, সেখানেও আমরা একই ভুল করছি।

জলবায়ু পরিবর্তন এখন একটি বড় সমস্যা। পুরো বিশ্বই জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা ঠেকানোর জন্য নানা পরিকল্পনা ও উদ্যোগ সামনে নিয়ে এসেছে। এই মুহূর্তে জলবায়ু পরিবর্তনের যে নেতিবাচক প্রভাবগুলো রয়েছে, সেগুলোকে বিবেচনায় রেখে নগরায়ণ পরিকল্পনায় রদবদল আনা জরুরি। সে ক্ষেত্রে আমাদের একটি জোরদার ও টেকসই পরিকল্পনা জরুরি। আমাদের ভবনগুলো সেই অর্থে টেকসই হচ্ছে কি না, এমনকি ভবনে অবস্থানরতরা এই ভবনে পর্যাপ্ত আরাম ও সুবিধা উপভোগ করতে পারবে কি না, তাও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রতিটি পর্যায়ের মানুষের কথাই ভাবতে হবে। শুরুতেই তিনটি ভিন্ন শ্রেণির মানুষের অবস্থানের কথা বলেছি। তাদের সুবিধার কথাও পরিকল্পনা নির্ধারণের সময় গুরুত্ব দিতে হবে। আবাসন সুবিধা সবার মৌলিক অধিকার। এই বিষয়ে আপসের কোনো অবকাশ নেই।

ভবনের ভেতরে আলো-বাতাসের অভাবকে আমরা কৃত্রিম উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করে চলেছি। ভবনকে আলোকসজ্জায় রাঙিয়ে না হয় এসির বাতাসে ঠান্ডা করে স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু ভবন থেকে বের হওয়ার পর যে ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তার জন্য দায়ী আমরা নিজেরাই। আর এই চর্চা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ক্ষতিকর। আবাসন অবকাঠামোর সঙ্গে শিশুর বিকাশ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক, করোনা মহামারির সময়ে কোয়ারেন্টাইনে থাকার ফলে অনেককে ভিটামিন ডি ক্যাপসুল খেতে হয়েছে। কারণ সরাসরি রোদের সংস্পর্শে না এলে ভিটামিন ডি-এর অভাবে ভুগতে হয়েছে আমাদের। বিশ্বের অনেক দেশেই আলো-বাতাস অধিকার আইন রয়েছে। আমাদেরও এই বিষয়ে এবার এগিয়ে আসা খুব জরুরি। এ বিষয়ে অনেক কিছুই বলা যেতে পারে। কিন্তু এই সমস্যার সমাধান তখনই হবে, যখন নগর পরিকল্পনায় বিজ্ঞানভিত্তিক অনুশীলন চালু হবে।

আমাদের দেশে এই মুহূর্তে ব্লক সিস্টেমে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এখনও আমাদের দেশে ব্লক সিস্টেমে আবাসন প্রকল্প ভাগ করা হয়, কিন্তু সেখানেও অনেক ক্ষেত্রেই ভবনগুলো অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে। অথচ উন্নত বিশ্বে আমরা একেবারে ভিন্নচিত্র দেখতে পাই। ভবন নির্মাণের কারিগরি দিকটি আমরা দেশে নিয়ে আসতে পেরেছি। কিন্তু নির্মাণের সঙ্গে ভাবনা ও সমন্বয়ের যে আঁতাত রয়েছে তা যেন আমরা এখনও বুঝতে পারিনি। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশই আমাদের সামনে উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। তবু আমরা যেন বরাবরই তা এড়িয়ে যাচ্ছি। যেসব এলাকায় নগরায়ণ হচ্ছে, সেখানে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষজন যেন খুব সহজেই জমি সংগ্রহ করে নিজের জন্য বাড়ি গড়ে নিতে পারে, সে ব্যবস্থাও করা জরুরি। আবাসিক এলাকায় শুধু ভবনই নয়, তাপমাত্রা কমানোর জন্য পার্ক, উদ্যান, জলাশয় গড়ে তোলা যেতে পারে। এ ছাড়া পরিকল্পিত উপায়ে গাছ লাগানো যেতে পারে। এমন অনেক পরিকল্পনারই বাস্তবায়ন সম্ভব যদি সদিচ্ছা থাকে। কিন্তু যা-ই করা হোক না কেন, পরিকল্পনা করতে হবে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে। নতুবা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।


  • নগর পরিকল্পনাবিদ ও নির্বাহী পরিচালক, আইপিডি। অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা