× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাঙালির বিকল্পহীন অবলম্বন রবীন্দ্রনাথ

আহমদ রফিক

প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৩ ১২:৩৮ পিএম

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পর্যালোচনার দিক রয়েছে অনেক। বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথের কোন অধ্যায় ছেড়ে কোন অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করা যায়Ñ এমন প্রশ্নের জবাব দেওয়া নিজের কাছেই নিজের জন্য খুব কঠিন। রবীন্দ্রমানসের শিল্পসাহিত্য প্রকৃতি গঠনে গ্রামবাংলার অবদান, বিশেষ করে শিলাইদহ-শাহজাদপুর-পতিসরের জীবন-জনপদ ও প্রাকৃত রূপের প্রভাবে, তা অবশ্যই সাহিত্যক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ও সৃষ্টিকর্মের মূল্যায়নে ও বিশ্লেষণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর জীবনসত্যের দার্শনিকতা অনেকাংশে এই গ্রামীণ রূপকল্পের প্রভাবে সৃষ্ট। এক্ষেত্রে ভাববাদ ও বাস্তবতার এক অবিশ্বাস্য, অদ্ভুত মিশ্রণ। সরস কৌতুকে, কখনও গভীর দার্শনিকতায় তাঁর এই গভীর ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে ছিন্নপত্রাবলীতে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রবীন্দ্রনাথ এ সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। বুঝেশুনে, ভেবেচিন্তেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর গ্রামীণ প্রবাসী জীবনের অনুভূতিগুলোকে ভিন্নমাত্রায় চিহ্নিত করেছেন, ভিন্ন সুরের তারে বেঁধেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর বোধের গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো পাওয়া না-পাওয়ার হিসাব মেলাতে, না চাওয়ার নিরাবেশ নিরাসক্তি। তাই গানের কলিতে এমন সুরে শোনাতে পেরেছেন : ‘কী পাইনি তারি হিসাবে মিলতে মন মোর নহে রাজি’ কথাগুলো। কয়জন পারেন জীবনের হিসাব মেলাতে, না চাওয়ার নিরাসক্তি প্রকাশ করতে? কিন্তু পেরেছেন রবীন্দ্রনাথ। এখানেও কি এ অঞ্চল থেকে আহরিত বাউলচেতনার প্রভাব প্রধান হয়ে থেকেছে?

‘ছিন্নপত্রাবলী’তে ধৃত এ অঞ্চল থেকে লেখা চিঠিগুলোতে অধিকমাত্রায় প্রাকৃত আবেগ পরিস্ফুট, যার পেছনে রয়েছে প্রকৃতির বিচিত্র রূপের প্রকাশ। যেমনÑ ঝড়-বৃষ্টির তুমুল উদ্দামতায়, তেমনই শরতের স্বচ্ছ নীল আকাশ ও অনুরূপ তরল রোদের রোমান্টিকতা ভিন্নমাত্রায় পরিস্ফুট বসন্তের দখিন হাওয়ার মন-মাতানো গানে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, রবীন্দ্রমানসে বর্ষা ও বসন্ত ঋতুর প্রভাব সর্বাধিক, এর পরই শারদপ্রকৃতি। গানে গানে এ উপলব্ধির প্রকাশ সর্বাধিক। আরও একটি সত্য রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যেই প্রকাশ পেয়েছে যে তাঁর ‘সুখ-দুঃখের দিনরাত্রিগুলি’ এখানকার মতো অন্য কোনো স্থানের লেখায় এতটা প্রকাশ পায়নি। ‘ছিন্নপত্রাবলী’ তাই রবি-জীবনের বিশেষ এক অধ্যায়ের বাস্তবিক গীতিকাব্য, যদিও চিঠিগুলো সাদামাটা গদ্যেই লেখা। এখানে বসে ঝুমবৃষ্টিতে তাঁর মাঝেমধ্যে মনে হয়েছে, চিঠিগুলো গদ্যে নয়, কবিতায় লেখা। চঞ্চলা জলস্রোত ও নিবিড় তুমুল বৃষ্টি তাঁর চেতনায় আলোড়ন তুলেছে। মনে হয়েছে, ‘কী জানি পরান কী যে চায়…।’ যার প্রভাবে লেখা হয়েছে বর্ষার একাধিক গান; যেমনÑ‘আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে’ কিংবা ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’র মতো গান।

এ অঞ্চলের রবীন্দ্রনাথের অভিজ্ঞতা এবং অভিজ্ঞতার উপলব্ধি দার্শনিকতার ভাবনারূপে প্রকাশ পেয়েছে মূলত তাঁর গানে, অংশত কবিতায়। সেসবের বাস্তব রূপচিত্রণ ছোটগল্পে যেখানে, তা কবির মনোগহনে ধৃত পদ্মাপ্রকৃতিরÑ‘শাস্তি’ কিংবা ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন বা ‘মেঘ ও রৌদ্র’ প্রভৃতি গল্পে তা প্রত্যক্ষভাবে পরিস্ফুট এবং একইভাবে পরিস্ফুট পদ্মাবিষয়ক কবিতায় এবং ছিন্নপত্রাবলীর পাতায় পাতায়। সেখানে তাঁর ‘সুখদুঃখের দিনরাত্রিগুলি’ আশ্চর্য সজীবতায়, জীবনের ঐশ্বর্যে প্রতিফলিত। তা সে জীবন যত সাদামাটা বা আটপৌরে হোক। প্রমত্ত পদ্মার মেঘ-বৃষ্টি-ঝড়ো প্রকৃতির পরিবেশ প্রকৃতি প্রেমের অনুষঙ্গে ফুটে উঠেছে তাঁর বিখ্যাত, অতি আধুনিক বিষয়-প্রকরণ-সিদ্ধ গল্প ‘অতিথি’তে। তিনি লিখেছেন, শাহজাদপুরের দুপুরবেলা তাঁর গল্পের দুপুরবেলা। প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর সত্তার গভীর একাত্মতায় এসব গল্পে যেমন প্রধান হয়ে উঠেছে প্রাকৃত অনুষঙ্গ, তেমনি পরিস্ফুট সাদামাটা জীবনের হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা বা জীবনযন্ত্রণার বাস্তবরূপ। কখনও সেখানে দার্শনিক চিন্তার উদয়, জীবনকে ‘অনিত্য’ জ্ঞান করে, মানব সম্পর্কগুলোকে একইভাবে মূল্যায়ন করে। যেমন প্রকাশ পেয়েছে বিখ্যাত ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পটিতে। কিংবা ভিন্নধারার চেতনার প্রকাশ ‘ছুটি’ বা ‘সমাপ্তি’র মতো গল্পগুলোতে।

এগুলোর ধারাবাহিকতায় লেখা পরবর্তী পর্বের গল্প মধ্যবিত্ত বা এলিট শ্রেণির জীবনসত্য নিয়েÑ সব মিলিয়ে বাঙালির উপভোগ্য ও উপলব্ধির এক আশ্চর্য গল্পভুবন তৈরি করেছেন রবীন্দ্রনাথ, যা শিল্পমূল্যে ও জীবনবাস্তবতায় অসাধারণ। আর সে কারণে বিশ্বগল্প সাহিত্যের দুই ‘গ্রেট মাস্টার’ মপসাঁ ও চেকভের সঙ্গে তুলনীয় সূচানলগ্নে বাংলা ছোটগল্পের গ্রেট মাস্টার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এ বঙ্গের গ্রামবাংলার জীবন-জনপদ-প্রকৃতি রবীন্দ্রনাথের শিল্পী মানসগঠনে যে দ্বিমাত্রিক প্রভাব রেখেছিল, রবীন্দ্রনাথ সে প্রভাব থেকে আমৃত্যু মুক্তি পাননি। তাই রাঢ়বঙ্গে বসে শীর্ণ জলস্রোতের ‘কোপাই’কে নিয়ে কবিতায় মনে মনে দেখেছেন প্রমত্তা পদ্মাকে, যে চঞ্চলা পদ্মা একদা তার প্রিয় সঙ্গিনী। রবীন্দ্রজীবনের গ্রামবাংলা পর্ব তাই তাঁর তাত্ক্ষণিক রচনাতেই সম্পূর্ণ হয়ে ওঠেনি। বাস্তব সত্য হলো, এই প্রভাব তাঁর গোটা শৈল্পিক জীবনকে ভিন্ন তারে বেঁধে দিয়েছে। আর এ কথাও সত্য যে, এখানে বসেই যুবক কবি তাঁর স্বদেশ ও প্রকৃতিকে চিনেছেন তা-ই নয়, বিশ্বপ্রকৃতি ও মানববিশ্বকে তাঁর মতো করে চেতনায় ধারণ করেছেন। তাঁর সে বিশ্ব নিঃসন্দেহে মানবিক বিশ্ব, বিজ্ঞানের বিশ্ব; কিন্তু বিজ্ঞানীর একমাত্রিক বিশ্ব নয়।

দেশ ভাগের পর থেকে এই বাংলায় রবীন্দ্রনাথ এক আলোচিত নাম, কখনও রবীন্দ্রচর্চায় সরকারি বাধার কারণে আর প্রায়ই সরকারি প্রতিক্রিয়ার বিকার ঠেকাতে বাঙালির প্রতিরোধের প্রধান অবলম্বন হিসেবে। এ দেশে যাঁরা রবীন্দ্রচর্চায় নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন তাঁদের মধ্যে আবুল মোমেন তাঁর বিশ্লেষণধর্মী প্রজ্ঞাপূর্ণ লেখার জন্যে গুণগ্রাহী পাঠকের কাছে সমাদৃত। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এক লেখায়  তিনি বলেছেন, “কেন রবীন্দ্রনাথই বাঙালির বিকল্পহীন অবলম্বন, সে ভাবনাটি পাঠকেরও মনে পৌঁছে দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ যতই বলে থাকুন, ‘আমি তোমাদেরই লোক’, তিনি এখনও ‘আমজনতার লোক’ হয়ে উঠতে পারেননি, অথবা আমজনতা তথা সাধারণ মানুষ তাঁর একান্তজন হয়ে উঠতে পারেনি এবং তাঁর মৃত্যুর এত বছর পরও। এই না-পারার দায় রবীন্দ্রনাথের নয়, এ দায় এবং ব্যর্থতা আমাদের। কারণ আমরা তাঁকে বিনোদনের সঙ্গী করেই খুশি থেকেছি, রবীন্দ্রসংগীতে প্রাণমন ভরে নিয়ে চরম উপভোগ্যতায় পরমার্থ খুঁজেছি। তা কী পশ্চিমবঙ্গে, কী বাংলাদেশে! পশ্চিমবঙ্গে তুলনামূলকভাবে অধিক মাত্রায় যে রবীন্দ্রচর্চা চলছে, তা একাডেমিক চরিত্রের, শিক্ষিত এলিটবৃত্তে বাঁধা। সেখানে আমজনতার সংশ্লিষ্টতা নেই।”

রবীন্দ্রনাথকে অর্থাৎ তাঁর সৃষ্টির সারাৎসার, তার ভাবনাচিন্তার মর্মবস্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার আন্তরিক চেষ্টা শিক্ষিত রবীন্দ্রপ্রেমীদের পক্ষ থেকে করা হয়নি। তাই ভুবনডাঙা পার হয়ে শান্তিনিকেতনের অদূরবর্তী গ্রামের সাধারণ মানুষও ঠাকুরকবির দূরদর্শী চিন্তার আলো থেকে বঞ্চিত। তাদের কেউ তাঁর নাম শুনে, কেউ না শুনেই খুশি। পরবর্তী সময়ে শিক্ষিত প্রজন্ম জানবে, এমন একটি ভরসা কারও কারও মনে। আমার ধারণা ভুল ছিল না, প্রমাণ করে দিলেন পঙ্কজ সাহা তার গোপন ক্যামেরা ও শব্দগ্রহণের কেরামতিতে। এদিক থেকে বাংলাদেশ আরও পিছিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ বা স্কুল শিক্ষায়তনের চৌহদ্দির বাইরে রবীন্দ্রনাথ এই নামটি, শব্দটি প্রায় অচেনা সাধারণ মানুষের কাছে, অশিক্ষিত বা আমজনতার কাছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কি আমাদের নয়, অবসান ঘটল এই বিতর্কের। অবিসংবাদিতভাবে রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠলেন আমাদের কবি। এমনকি একদিন যারা ছিলেন রবীন্দ্রনাথবিরোধী, তারাও হয়ে উঠলেন রবীন্দ্রপ্রেমিক। বিশিষ্ট এক প্রাবন্ধিক লিখেছেন : ‘পাকিস্তানকালে যারা পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে কিংবা বিবৃতি দিয়ে জাতীয় স্বাতন্ত্র্যের কিংবা সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের কথা বলে রবীন্দ্রসাহিত্য ও রবীন্দ্রসংগীত বর্জনের দাবি তুলেছেন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সবার আগে তাদেরই কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথকে মহিমান্বিত করে বই লিখেছেন।’ কিন্তু বাংলাদেশে, বিতর্ক রবীন্দ্রনাথকে পরিত্যাগ করল না। বস্তুত রবীন্দ্রনাথ নিজে এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম সর্বদাই বিতর্ক পরিবেষ্টিত। এ বিতর্ক তাঁর জীবদ্দশাতেই শুরু, মৃত্যুর পরও বহমান। কিন্তু তাতে রবীন্দ্রনাথের কিছু যায়-আসে না, বরং কারও কারও মানসিক দৈনই তাতে প্রকটভাবে দেখা দেয়।

রবীন্দ্রনাথকে ধারণ করতে সেই রকম সক্ষমতা অবশ্যই জরুরি। এই সক্ষমতা দরকার নানা আঙ্গিক ও পর্যায়ে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কত রকম মন্তব্য করেছেন হীনস্বার্থবাদীরা, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য কতটা অবিকল্প ও অপরিহার্য এর প্রমাণ কি যথেষ্টই নেই? তিনি সব সময়েই এই একই অবস্থানে থাকবেন আমাদের কাছে। আমাদের প্রয়োজনেই তাঁকে প্রয়োজন, খুব প্রয়োজন। 


  • ভাষা সংগ্রামী, রবীন্দ্র গবেষক, কবি ও প্রাবন্ধিক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা