ড. তৌহিদুল হক
প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৩ ১৪:৩১ পিএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
মানুষের জীবনে দুঃখের পরিধি দেশ, সমাজ ও মানুষের আচরণধারা অনেকটা নির্ধারণ করে। এই ধারার সঙ্গে সময়ের প্রেক্ষাপটে যুক্ত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের বৈশ্বিক নজর। ফলে ক্ষমতাধর দেশ অধিকার ও সাম্যের জয়গান গাইতে গাইতে অন্যের বুকের ওপর উঠে নৃত্য করে। ক্ষমতাকে পুঁজি করে আধিপত্য বিস্তারের মনস্তাত্ত্বিক মনস্কাম যতদূর সম্ভব বৃক্ষের মতো ডালপালা ছড়িয়ে দিয়ে নিজের দখলদারিত্বের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উদ্বাস্তু হওয়ার গল্পের পেছনে দু-একটি ক্ষমতাধর দেশের লোলুপ দৃষ্টি ও তাদের বসবাসকৃত দেশ মিয়ানমারের বিমাতাসুলভ আচরণই মূল দায়ী। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বৈশ্বিক মানবিক মানুষের সমর্থন পেলেও এর পশ্চাতে রাজনীতির কী নিষ্ঠুর খেলা অপেক্ষা করছে, তা বোধগম্য হলেও বলা কঠিন। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও সমন্বিত অগ্রগতির প্রতি হিংসাত্মক দৃষ্টি অনেকেরই রয়েছে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আশ্রয় নিয়ে নিজস্ব প্রশ্রয়ে শরণার্থীর শিষ্টাচার কিংবা শৃঙ্খলার বিধি মেনে কতটা চলছে তা নিয়ে তর্ক-বিতর্কের চূড়ান্ত সীমান্তে পৌঁছানোর আগেই সহিংসতা-সংঘর্ষের ঘটনা নতুন চিন্তার সূত্রপাত করছে। রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রে সহিংসতা সৃষ্টির জন্য গোষ্ঠীগত দূরত্ব ও কোন্দল বেড়ে চলছে। অনেকগুলো উপদল সক্রিয়, এখানেও আধিপত্য বিস্তার। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয়কেন্দ্রে একটি নিয়মনিষ্ঠার মধ্যে রাখা এবং প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত করার কাজটি পেশাগতভাবে করা প্রয়োজন। অর্থ এলো, খাদ্য এলোÑ আসুক, তবে এটি দীর্ঘস্থায়ী স্বস্তি সৃষ্টি করবে না। শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ, অপহরণের ঘটনা, ধর্ষণ, উপদলকেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তার ও সহিংসতা, মানব পাচার, মাদক ও অস্ত্রের উপস্থিতি কী ইঙ্গিত দিচ্ছে তা সহজেয়ই অনুমেয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে, ২০২২ সালে রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রে বিভিন্ন সহিংসতার কারণে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং এই সংখ্যাটি তাদের আগমনের পর থেকে উল্লেখ্য বছরে সর্বোচ্চ। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন যত বিলম্বিত হবে সহিংসতা-সংঘর্ষের ঘটনা তত বাড়তেই থাকবে।
মিয়ানমার সরকার যে সংগঠনকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলছে, সেই আরসা রোহিঙ্গা শিবিরে
সক্রিয় ও নিয়ন্ত্রণের কৌশলী কর্মপন্থা নির্ধারণ করছেÑ যা গণমাধ্যমে নানা সময়ে প্রকাশিত।
আরসার সঙ্গে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান এবং ফলে আহত-নিহতের ঘটনা
বেড়েই চলছে। সর্বশেষ পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে আরসার কমান্ডার নিহত হয় এবং নিহত
কমান্ডার চারটি মামলার আসামি ছিল। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বর্তমান জীবনব্যবস্থার সঙ্গে
সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় প্রকাশ্য যে, আরসা নানাবিধ অপরাধ করছে, নিয়ন্ত্রণের
সন্ত্রাসী চেষ্টা চলমান এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম বেগবান করছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
কৌশলী ভূমিকায় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, কিন্তু আরসার কলকাঠি যদি অন্য জায়গা থেকে নড়ে,
তবে তা সফল হবে না। অস্তিত্বের জানান দেওয়া এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য আরসাও কৌশল
পাল্টাবে, নতুন রূপে জেগে উঠবে।
ভয়ের রাজত্ব সৃষ্টি করে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার নব্য ঘাত-অভিঘাতের
সংযোজন করে একটি ‘আমলযোগ্য’ দল হিসেবে নিজেদের সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। বাস্তবতা হলো সবচেয়ে
বড় আলামত যা জানান দেয় কী করতে হবে। শরণার্থীদের অধিকার আছে, কেউ অস্বীকার করছে না।
তবে আশ্রয় প্রদানকৃত দেশ সেই অধিকার কিংবা নিরাপত্তাসহ জীবনের নিশ্চয়তার পরিধি বা সীমা
নির্ধারণ করবে। অন্যকিছু করতে গেলেই বিপদ বাড়বে। অতি মানবিকতা বর্তমান যুগে কিংবা মনুষ্য
ইতিহাসে বিপদ ডেকে এনেছে। বাংলাদেশ নিশ্চয়ই এই ঐতিহাসিক সত্যটি ভুলে যাবে না কিংবা
নিশ্চুপ থাকার সংস্কৃতি অনুসরণ করবে না। এই কারণে বলছি, যারা রোহিঙ্গাদের নিয়ে নানা
মানবিক সবক দিচ্ছে, তারা রোহিঙ্গাদের কিছু অংশ তাদের দেশে কী আশ্রয় দেবে? বাংলাদেশই
ঠিক করবে রোহিঙ্গাদের চলমান জীবনে অধিকারের পরিধি কতটা দীর্ঘ হবে। কিংবা রোহিঙ্গাদের
জীবনপ্রবাহ পরিচালনের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া।
রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের ২০২২ সালে চিত্রপট প্রকাশ করে যে, ১,২২০টি মামলা
হয়েছে। এসব মামলায় ২,৫৩১ জন গ্রেপ্তার হয়। মামলাগুলোর মধ্যে ৯০ শতাংশ মামলা ছিল হত্যা,
অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার, চুরি-ডাকাতি, মাদক ব্যবসা, ধর্ষণ, অপহরণ, মানব পাচার ও পুলিশের
ওপর হামলা। আশ্রয়কৃত রোহিঙ্গাদের অপরাধের বিষয়বস্তু জানান দেয়, শরণার্থী হলেও তাদের
জীবন গঠন প্রক্রিয়া নানাবিধ কারণে অপরাধপ্রবণতা দ্বারা আবৃত। গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব জন্মের
মতো সত্য এবং পরিবারকেন্দ্রিক ভুল বোঝাবুঝি থেকে বড় ধরনের সহিংসতা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের
মধ্যে অপরাধী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জঙ্গিবাদ, যা বাংলাদেশের জন্য মাথাব্যথার
নতুন কারণ। সম্প্রতি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির থেকে দুজন জঙ্গি নেতা আটক হয়। এর মানে হলোÑ
জঙ্গিগোষ্ঠী তাদের প্রশিক্ষণ, নিরাপদ আশ্রয় এবং মতাদর্শগত ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ানোর
জন্য রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্র বেছে নিয়েছে। একে তো রোহিঙ্গা শিবিরে সংঘটিত অপরাধ এবং
এর সঙ্গে জঙ্গি সংগঠনের উপস্থিতি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের তৎপরতা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার
ক্ষেত্রে সংকট তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। তবে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রত্যাবাসনের
ব্যবস্থাটি সময়ের পালাবদলে কঠিন হয়ে পড়ছে। আশাহত না হওয়ার মন্ত্র থেকে বলা যায়, হয়তো
একদিন তারা ফিরে যাবে তাদের দেশে। কিন্তু আর কত! মানবিক হতে গিয়ে নিজেদের ভূখণ্ডে অপরাধ
নামক অমানবিকতার আলামত বাড়লে বাংলাদেশকে কঠিন দৃষ্টান্ত ও উদাহরণ স্থাপন করা অপরিহার্য
হয়ে পড়বে।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কার্যক্রমের গতিবিধি এবং তৎপরতায় শক্তিধর দেশগুলো
‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ ধরনের পদক্ষেপ খুব বেশি আশাবাদী করে না। কিছু গবেষণা আর গণমাধ্যম
কভারেজ কি ফল দেবে তা অনুমান করা দুঃসাধ্য। লক্ষণীয় যে, যেভাবে অপরাধ বাড়ছে, বাড়ছে
জঙ্গি ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতা ও আধিপত্য বিস্তার, কর্মহীন জীবন এবং অবৈধ উপায়ে
মাদক ও অস্ত্রের সংগ্রহশালা তৈরি হচ্ছে, তা বেপরোয়া গতিতে বাড়তে থাকলে বাংলাদেশের জন্য
‘উভয় সংকট’ সৃষ্টি করবে। রোহিঙ্গা শিবিরে শৃঙ্খলা ভঙ্গের উৎসে নজর দিতে হবে।