ড. ইমতিয়াজ আহমেদ
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৩ ১৩:০২ পিএম
অলঙ্করন: জয়ন্ত জন
২৫ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের এক বিজ্ঞপ্তিতে পাওয়া গেল স্বস্তিকর
সংবাদ। এর সূত্র ধরে পরদিন অর্থাৎ ২৬ এপ্রিল প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ অন্য সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা
যায়, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জেনোসাইড স্কলার্স (আইজিএস) বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে
মহান মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার স্বীকৃতি দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যার এই স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে
বড় প্রাপ্তি। আমরা এখনও আন্তর্জাতিকভাবে গণহত্যার স্বীকৃতি পাইনি। এমনকি আইজিএসও স্বীকৃতি
দিয়েছে অনেক পরে। তার পরও এই স্বীকৃতির তাৎপর্য ও গুরুত্ব এড়িয়ে যাওয়ার নয়। মুক্তিযুদ্ধে
গণহত্যার স্বীকৃতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মহলের জানাশোনার পরিধি কম। এই স্বীকৃতির পর
একাত্তরে গণহত্যার বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাবে। এমনকি জাতিসংঘের
স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রেও এই ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি অবদান রাখবে বলে মনে করি। একাত্তরে
গণহত্যার স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি জরুরি প্রচার-প্রচারণা চালানো। এ জন্য
বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় আমাদের গণহত্যার ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে হবে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক এখন
পর্যন্ত প্রচুর বই লেখা হয়েছে। অধিকাংশ বই প্রচুর মূল্যবান দলিলাদি ও তথ্যে সমৃদ্ধ
হলেও এই বইগুলোর অধিকাংশই লেখা হয়েছে বাংলায়। ফলে বিদেশিদের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত
ইতিহাসের খুঁটিনাটি তথ্য জানার সুযোগ এখনও কম। সম্প্রতি ইংরেজিতেও এ বিষয়ে অনেক বই
লেখা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দৃষ্টি আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের সঙ্গে কূটনৈতিক
সম্পর্ক ভালো এমন দেশগুলোর ভাষায় এ বিষয়ে বইয়ের ঘাটতি রয়েছে, সেসব ভাষায় বই রচনার মাধ্যমে
গণহত্যার বিষয়টিকে তাদের সামনে নিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে আরবি, ফরাসি, পর্তুগিজ, স্প্যানিশ
ভাষায় বই প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা অনেক। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি
বুকলেট প্রকাশ করেছে। বুকলেটটি তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। এই বুকলেটটি এখন
ইংরেজি ভাষায়ও পাওয়া যায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এই বুকলেটটি বিভিন্ন ভাষায়
প্রকাশের একটি উদ্যোগ নিয়েছে, যা সাধুবাদযোগ্য। তা বাদেও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বইয়েরও
ভাষান্তর করতে পারলে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলে সচেতনতা সৃষ্টি করা সম্ভব।
বই-পুস্তক ইংরেজি অনুবাদ করলেই সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে, তা আমাদের বহুদিনের ভ্রান্ত
ধারণা। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, আরব অঞ্চলের বাসিন্দারা আরবি বাদে অন্য ভাষায় অত পারঙ্গম
নন। একই কথা বিশ্বের আরও অনেক অঞ্চলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আমাদের
গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা, বইÑ এমনকি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বুকলেটটি বিভিন্ন
ভাষায় প্রচার করতে পারলে গণহত্যার বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সচেতনতা তৈরি হবে। তখন ওইসব
দেশের গণমাধ্যমেও বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। আমি মনে করি, দেশের জরুরি প্রয়োজন ও স্বার্থে
এ মুহূর্তে বড় ধরনের সাংস্কৃতিক বিনিয়োগ জরুরি।
এ কথা সত্য, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলে সচেতনতা
বাড়াতে সরকারের একার উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বৈশ্বিক সংকটের কথা বিবেচনায় রেখে সরকারের পক্ষে
সম্ভবত তা কঠিনও বটে। এক্ষেত্রে সচেতন নাগরিক মহল ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের এগিয়ে
আসতে হবে। বিশেষত বিশ্বের নানা প্রান্তে আমাদের দেশের যে ডায়াসপোরা আছেন, তারা এগিয়ে
এলে দ্রুত ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিগত কয়েক দশকে অনেক মূল্যবান গবেষণা
হয়েছে। সেগুলো বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় ভাষান্তর করার কাজটি সরকারের একার পক্ষে
অসম্ভবই বলা চলে। তাই সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে এসে এসব
তথ্য বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে। তবে আপাতত আমাদের পক্ষে যেটুকু সম্ভব তা হলো, বিষয়টি
নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলা। জনগণের কাছে যখন ইতিহাস পৌঁছবে তখন এর গুরুত্ব বাড়বেই।
রাষ্ট্রীয়ভাবে বিষয়টি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলে সচেতন মহলের অনেকেই এগিয়ে
আসার সুযোগ পাবেন। বাংলাদেশের প্রায় ৮০টি দূতাবাস রয়েছে বিভিন্ন দেশে। এসব দূতাবাস
যদি ওই সব দেশের দাপ্তরিক ভাষায় মুক্তিযুদ্ধ পর্বের ঘটনাগুলো প্রচারের দায়িত্ব নেয়,
তা হলেও আমরা অনেকটাই সফল হব। ওইসব অঞ্চলের বাঙালি কমিউনিটি বা ডায়াসপোরার সঙ্গে সম্পর্ক
গড়ে তুলতে হবে প্রচারের স্বার্থে। এ মুহূর্তে প্রচারই বেশি জরুরি। যত বেশি প্রচার হবে,
তত আমরা গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারব।
স্বাধীনতা লাভের দীর্ঘদিন পর, অনেক বিলম্বে হলেও যুদ্ধাপরাধীদের
বিচারের বিষয়টি নিশ্চিত করা গেছে। মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন
হয়ে ইতোমধ্যে কয়েকটি রায় কার্যকর হয়েছে। এখনও অনেকের বিচারপ্রক্রিয়া চলমান। গণহত্যার
স্বীকৃতির বিষয়টি বিলম্বিতও হলে পাকিস্তানের যেসব সামরিক সেনা যুদ্ধে জড়িত ছিল, তাদের
বিচার সম্পন্ন হবে কি নাÑ এটিও একটি বড় প্রশ্ন। আমরা আশা করি, এই বিচারপ্রক্রিয়াও সম্পন্ন
হবে। পাকিস্তানে অনেকেই এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। তারাও হয়তো তখন আরও জোরালোভাবে
এগিয়ে আসবেন। ভুলে গেলে চলবে না, গণহত্যার পক্ষে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এলে তার প্রভাব
পাকিস্তান রাষ্ট্রে না পড়ার কারণ নেই। তখন পাকিস্তানের সচেতন মহল থেকেও যুদ্ধাপরাধের
বিচারের দাবি জোরালোভাবে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। আপাতত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়টি
যত ত্বরান্বিত করা যায় ততই আমাদের জন্য ভালো। আইজিএস ইতোমধ্যে পাকিস্তানকে গণহত্যার
জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। এমনকি জাতিসংঘকেও তারা দ্রুত গণহত্যার স্বীকৃতি
দেওয়ার কথা বলেছে। আমরা তাদের সাধুবাদ জানাই।
আইজিএসের মন্তব্য দ্রুত ব্যাপক প্রচারের উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের
মন্তব্যের ওপর ভিত্তি করেই জনমত গঠনের কাজ এগিয়ে নিতে হবে। বিষয়গুলো আমাদের দেশের মানুষের
কাছে তো প্রচার করতেই হবে, একই সঙ্গে বহির্বিশ্বের গণমাধ্যমকেও ব্যবহার করতে হবে। এমন
অনেক দেশ আছে, যেখানে এখনও এ বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। সেসব দেশের ভাষায় আইজিএসের মন্তব্য
ছড়িয়ে দিয়ে তাদের মাঝে আগ্রহ বাড়াতে হবে। এটি জরুরি। কারণ, ভবিষ্যতে একাত্তরে গণহত্যার
স্বীকৃতির প্রস্তাব জাতিসংঘে উত্থাপন করা হতে পারে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এই
ভূখণ্ডে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক ইতিহাসের জঘন্য ও নৃশংসতম গণহত্যা সংঘটিত হয়েছেÑ
এই তথ্যটি যদি আন্তর্জাতিক বিশ্বে বেশিরভাগ দেশই না জানে, তা হলে তারা এই গণহত্যার
বিচারের দাবিতে সোচ্চার হবে কী করে? তারা আমাদের পক্ষে অবস্থানই বা নেবে কীভাবে? আমাদের
এখন বহির্বিশ্বকে জানানোর বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের অনেক
বড় কাজ এখনও বাকি রয়ে গেছে।
বিভিন্ন দেশের ইতিহাসে গণহত্যার বিষয়টি পাওয়া যাবে। এসব দেশে
গণহত্যার বিচারের বিষয়টি যেভাবে এসেছে তা খতিয়ে দেখা জরুরি। অনেকে প্রশ্ন করেন, ২৫
মার্চ দিনটি আমরা গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করি। কিন্তু গণহত্যা দিবসের কেন এখনও আন্তর্জাতিকভাবে
স্বীকৃতি আদায় করে নিতে পারেনি। গণহত্যার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসার জন্যও কিন্তু স্বীকৃতি
জরুরি। জাতিসংঘ থেকে রুয়ান্ডা এ বিষয়ে স্বীকৃতি আদায় করেছে। যদি আমরাও তা করতে পারি,
তা হলে গণহত্যা দিবসের বিষয়টি সহজেই তুলে ধরা যাবে। তবে এও মনে রাখতে হবেÑ রুয়ান্ডা,
কাম্পুচিয়া, আর্মেনিয়ায় গণহত্যার যে ইতিহাস আছে, এসব গণহত্যা ছাপিয়ে ২৫ মার্চ গণহত্যা
দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে আগে আমাদের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে হবে।
এ জন্যই প্রয়োজন সাংস্কৃতিক বিনিয়োগ বাড়ানো। আন্তর্জাতিক মহলে যখন প্রচার বাড়বে, তখন
মীমাংসার পথও উন্মুক্ত হবে। আমাদের ধরে নিতে হচ্ছে, একাত্তরে গণহত্যার পক্ষে আন্তর্জাতিক
স্বীকৃতি না পাওয়ার পেছনে পাকিস্তানের রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতির পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ হচ্ছিল। তখন পাকিস্তানের পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
এবং চীন ছিল। সেই দিক বিবেচনায় মার্কিন সরকার এই স্বীকৃতি কতটা চাইবে, তা প্রশ্নের
বিষয় বটে। যুদ্ধের সঙ্গে তারা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকায় কিছুটা জটিলতা তো তৈরি হয়ই।
ওই সময়ের অনেকেই এখনও জীবিত, এ বিষয়টিও বিবেচনার বাইরে রাখা যাবে না। কিন্তু ভূ-রাজনীতির
কথা চিন্তা করলে তো আমাদের পক্ষে কাজের কাজ কিছুই করা সম্ভব হবে না।
আমরা বরাবরই ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান করব। একাত্তরে বিপুলসংখ্যক
নিরপরাধ মানুষ বিনা কারণে প্রাণ দিয়েছেÑ এমনটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার নয়। জনসচেতনতা
বাড়াতে পারলে অনেক রাষ্ট্রই জনগণের চাপে সমর্থন দিতে বাধ্য হবে। সত্তরের দশকের
বিশ্ব আর বর্তমানের বিশ্ব এক নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের
সম্পর্কের অনেক উন্নতি হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে
আমাদের এই ভূখণ্ডে সংঘটিত গণহত্যার বিষয়ে তারাও তৎপর হবে যখন তাদের জনগণ এ বিষয়ে আগ্রহ
দেখাবে। এ জন্যই প্রথম থেকে বারবার প্রচারের বিষয়টিতে জোর দিয়েছি এবং এখনও দিচ্ছি।