× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিশ্ব পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য তিন বিপদ

আনু মুহাম্মদ

প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৩ ০২:২৪ এএম

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

প্রকৃত বৈশ্বিক ক্ষমতা বিন্যাস বিবেচনা করলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নামে পরিচিত যুদ্ধকে আসলে বলা উচিত রাশিয়া-ইউক্রেন-ন্যাটো যুদ্ধ কারণ এই যুদ্ধে একদিকে ন্যাটোই প্রধান পক্ষ এবং রাশিয়া বিরুদ্ধপক্ষ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই যুদ্ধের সূত্রে বহুরকম নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ন্যাটো পক্ষভুক্ত যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর ফলে বিশ্বে খাদ্য জ্বালানিসহ পণ্যের জোগান ব্যবস্থাই জটিল সংকটে পড়েছে পাল্টা রাশিয়াও কিছু করেছে, কিন্তু তার প্রভাব খুবই কম ক্ষতিগ্রস্ত ইউক্রেন, রাশিয়া, ইউরোপসহ পুরো বিশ্ব তবে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের অস্ত্র ব্যবসায়ী ফাটকা ব্যবসায়ীরা লাভবান এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধ থামানোর বা আপস করার বিষয়ে দুই পক্ষের তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি সম্প্রতি চীন কিছু প্রস্তাব দিয়েছে মনে হচ্ছে, এখনও প্রভাবশালী শক্তির বড় অংশ চায় এই যুদ্ধ চলমান থাকুক যুক্তরাষ্ট্র প্রভাবিত ন্যাটো ইউরোপীয় ইউনিয়ন গোটা যুদ্ধটিকে যেভাবে এগিয়ে নিচ্ছে তাতে মনে হয় দীর্ঘদিন এই যুদ্ধ চলবে

ইতোমধ্যে পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন অন্যদিকে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা অর্থাৎ ব্রিকস আঞ্চলিক জোট আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে এই জোটে চীন ভবিষ্যতে বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার দিকে এগিয়ে চলেছে তা ছাড়া ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকাও দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির রাষ্ট্র রাশিয়ার বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ বৃহৎ শক্তি হিসেবে প্রভাবও কম নয় সব মিলিয়ে বিশ্বের এককেন্দ্রিক সাম্রাজ্যবাদী অবস্থার পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে

পরিবর্তন হলেও মতাদর্শিক জায়গা থেকে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পার্থক্য নেই রাশিয়া এখন আর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয় চীন যদিও দাবি করে তারা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, কিন্তু তারা বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ সেজন্য চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মতাদর্শিক লড়াই হচ্ছে, এমনটা বলা যাবে না তারা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার আদি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করলেও এখন এটাই সত্য যে, পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা চীন গভীরভাবে অঙ্গীভূত এখন চীন ছাড়া পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থাও অচল চীনে যদি অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটে, তবে বৈশ্বিক উৎপাদন বাণিজ্যে বিরাট ধস নামবে যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধপক্ষে যতই অবস্থান করুক না কেন, এখনও তাদের দেশে অধিকাংশ বিপণী কেন্দ্রে চীনা পণ্যের আধিপত্য চীনের সঙ্গে ভারতেরও এক ধরনের প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব আছে বলেই আমরা জানি কিন্তু ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারও চীনা পণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছে

বিশ্ব ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত কারা নিয়ন্ত্রণ করবে তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী এক ধরনের অনিশ্চয়তা আছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা হলেও সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক পার্থক্য থাকার কারণে নানা মাত্রায় বিভেদ রয়ে গেছে যদি বিভেদ না থাকত তাহলে রাশিয়াকে বিশ্বকর্তৃত্বের জোটে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিমত তৈরি হতো না সোভিয়েত পতনের শেষ নেতা গর্বাচেভের বক্তব্যের মূল অংশই ছিল আমরা ইউরোপের সঙ্গে যেতে চাই ইউরোপের মূলধারার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষাই তিনি প্রকাশ করেছিলেন এর পরও পশ্চিমা বিশ্ব নেতারা রাশিয়াকে গ্রহণ করতে পারেনি রাশিয়া তখন ন্যাটোর সদস্যপদ চাইলেও দেওয়া হয়নি

একটি বিষয় আমাদের খেয়াল করতে হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্রই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষের হলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে এই রাষ্ট্রের মানুষেরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তার পরও তাদের নেতৃত্ব এই যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে স্বাধীন অবস্থান নিতে পারছে না অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও নানা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে বলা যায়, ডলারের আধিপত্য ধরে রাখাটাও এই যুদ্ধে কোনো মীমাংসার দিকে না নিয়ে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ কারণ সামনে ডলারের আধিপত্য কমে যাওয়ার একটা জোর প্রবণতা দেখা দিচ্ছে অর্থাৎ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে গোটা বিশ্বব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে চলেছে

রাশিয়া-ইউক্রেন-ন্যাটো যুদ্ধ বাদেও গোটা বিশ্বে প্রতিনিয়ত নানা দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছে এসব ঘটনার মধ্যে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনীতি, রাজনৈতিক অবস্থা, সাংস্কৃতিক পরিণতি কেমন তা আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সংকটের কয়েকটি দিক আছে সামষ্টিক অর্থনীতি যেমন : বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতসহ অন্যান্য আরো বিষয়ের পাশাপাশি আমাদের বিচার করতে হবে ব্যাষ্টিক অর্থনীতি মানে ব্যক্তি, পরিবার পর্যায়ে সংকটের বিষয়গুলো

সামষ্টিক অর্থনীতির বিষয়ে আমরা সরকার থেকে নানা তথ্য পাই উদাহরণ হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের কথাই ধরা যাক বিষয়ে তথ্য দেওয়া হলেও তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা যায় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের মধ্যেই আইএমএফ বলছে রিজার্ভ সম্পর্কে সরকারের দেওয়া তথ্য সঠিক নয় ছাড়া তারা আরও কিছু বিষয়ে সংস্কারের কথা বলেছে বাংলাদেশ অবশ্য আইএমএফ থেকে ঋণ পেয়েছে সামনে এই ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে দেশে একাধিক মেগা প্রকল্পের জন্য বিপুল ঋণ জমেছে সব সময় যে সরকারই ঋণ নিয়েছে তা কিন্তু নয় সরকারের গ্যারান্টিতে কিছু প্রাইভেট ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বিভিন্ন ফরেন কারেন্সিতে ঋণ নিয়েছে, যার অধিকাংশই স্বল্পমেয়াদি ঋণ এগুলোও সরকারকেই শোধ করতে হবে বিগত কয়েক বছরে এই স্বল্পমেয়াদি ঋণের অনুপাত বেড়েছে ব্যাপক হারে ঋণের এই চাপ থেকেই শঙ্কা তৈরি হয়েছে মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য নিয়েও সরকারি তথ্য-উপাত্ত নিয়ে প্রশ্ন আছে

বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ স্বল্পমেয়াদি ঋণ পরিশোধের চাপ ঠেকানোর জন্য দুটি পদক্ষেপ নেওয়া হলো প্রথমত, ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান কমানো হলো বর্তমানের ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান ১০৫-১০৭ হলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে ১১০ টাকা মূল্যেও ডলার বেচাকেনা চলছে অর্থাৎ সংকট মোকাবেলার জন্য টাকার মূল্যমান কমানোটা একটি পথ আমাদের অনেক অর্থনীতিবিদও বহুদিন ধরে পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন দ্বিতীয়ত, আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হলো সংকট সমাধানের এই দুটি পন্থা অবলম্বনের সামাজিক প্রভাব কেমন হতে পারে, তাও আমাদের ভেবে দেখতে হবে

দেশে প্রতি দুই মাসে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রেমিট্যান্সের মাধ্যমে আসে, মানে আমাদের প্রবাসী শ্রমিকরা পাঠান, সেই পরিমাণই তিন বছরে ঋণ হিসেবে দেবে আইএমএফ, যাকে বিরাট সাফল্য হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে অনেক কিস্তিতে এই ঋণ তারা দেবে অনেক শর্ত পালনের বিনিময়ে যার জন্য আবার গ্যাস-বিদ্যুৎ-তেল-পানির দাম বাড়াতে হবে অর্থাৎ বিভিন্ন কিস্তিতে বহু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বাংলাদেশ ঋণ পাবে এবং পূরণ করতে ব্যর্থ হলে ঋণ না পাওয়ারও আশঙ্কা থেকে যায়

পরিমাণগত চাপের বিষয় বিবেচনা করলে প্রশ্ন করতেই হয়, সরকার কেন আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে? কারণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট সামনে আরও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে এর সঙ্গে দায়বোধের বিষয়টিও রয়েছে তাই পরিমাণের দিক থেকে আইএমএফের ঋণ কোনো সমাধানের পথ দেখাচ্ছে না তার পরও সরকার কেন এই ঋণ নিচ্ছে? নিচ্ছে, কারণ এই ঋণ নেওয়ার মাধ্যমে সরকার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এক ধরনের স্বীকৃতি পেল যে তার ঋণ পাওয়ার অবস্থা আছে এর মাধ্যমে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে আরও ঋণ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলো আইএমএফের ঋণ পাওয়া মানে অন্যান্য সংস্থাও ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধা করবে না

আরও ঋণ করার সক্ষমতা দেখাতে পেরে সরকার খুশি, ঋণের পরিমাণ এখানে মুখ্য নয় কিন্তু সামাজিক পরিসরে এই অবস্থা খুশির হতে পারে না কারণ সরকার যেসব প্রকল্পে অপচয়ে দুর্নীতিতে ঋণ ব্যবহার করছে তাতে তাদের আরও ঋণ গ্রহণের ক্ষমতা আমাদের মানে দেশের মানুষের জন্য সুখবর নয় রাষ্ট্রীয় ঋণ যত বাড়বে ততই সর্বজনের ওপর চাপ বৃদ্ধি পাবে ঋণ শোধের চাপ দেশের মানুষকেই নিতে হবে

বিগত কয়েক দশকে উন্নয়নের ধারা এমন যে, এতে দেশের মুষ্টিমেয় কয়েকজনের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে, সামাজিক বৈষম্য বেড়েছে এবং তৃতীয়ত, প্রাণপ্রকৃতি নদী-বন-পাহাড়ের ধ্বংসসাধন বেড়েছে গত এক দশকে এর গতি অনেক বেড়েছে দেশে বিদ্যমান উন্নয়ন ধারার এই তিনটি পরিণতিই প্রধান অনিয়ন্ত্রিত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দুর্ভোগ তার একটি ফলাফল সামষ্টিক সংকটও তারই একটি বহিঃপ্রকাশ রাশিয়া-ইউক্রেন-ন্যাটো যুদ্ধ ছাড়াই এই অবস্থার সৃষ্টি, যুদ্ধ তাকে কেবল জোরদার করেছে মাত্র


  • অর্থনীতিবিদ  অধ্যাপক ; সম্পাদক সর্বজনকথা
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা