ড. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৩ ০২:৪৩ এএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথ দিবস হিসেবে পরিচিত। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীনতার বাস্তব রূপদানের জন্য এক কঠিন রক্তক্ষয়ী অজানা যাত্রা শুরু হয়েছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হিসাব ছিল বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার এবং অপারেশন সার্চলাইট নামিয়ে গণহত্যা শুরু করা হলে পূর্ব বাংলায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের কেউ থাকবে না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বের বিশালতা বুঝতে তারা অক্ষম ছিল। তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা জানতেন বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার পরিকল্পনা। তারাই সেই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে গিয়েছিলেন, দ্রুত সমবেত হতে থাকলেন বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য। বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা তাজউদ্দীন আহমদ সীমান্তে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে সসম্মানে প্রথমে কলকাতায়, পরে দিল্লিতে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ৪ এপ্রিল ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করেন। এর পর ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে দ্রুত একটি সরকার গঠনের জন্য তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। কারণ একটি নির্বাচিত সরকার ব্যতীত পাকিস্তানিদের গণহত্যার বিপরীতে দাঁড়িয়ে জনগণের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে সশস্ত্র যুদ্ধ চালানোর প্রয়োজন, সেটি কোনোভাবেই সংগঠিত করা সম্ভব হবে না Ñ সেটি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।
সে জন্যই জনপ্রতিনিধিদের কলকাতায় জড়ো করে দ্রুত ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমেদকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকে অর্থ-শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী, এএইচএম কামরুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্র, সরবরাহ, ত্রাণ-পুনর্বাসন ও কৃষিমন্ত্রী এবং কর্নেল এমএজি ওসমানীকে সেনাবাহিনীর প্রধান করে একটি সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। ১০ তারিখের আগেই রাষ্ট্রপতিশাসিত একটি সাংবিধানিক কাঠামোর খসড়া তৈরি এবং তা আইনসম্মতভাবে যাচাই-বাছাই ও গ্রহণ করা হয়। এর ভিত্তিতেই ১০ এপ্রিল সরকার গঠিত হয়। সেদিনই ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে ‘একটি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রও’ রচিত ও গৃহীত হয়। এর পর ১১ তারিখ নতুন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী অজ্ঞাত স্থান থেকে জাতির উদ্দেশে বেতার ভাষণ দেন। তখনই গোটা জাতি আস্থার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে থাকে। ২৫ মার্চের পাকিস্তানিদের গণহত্যা শুরুর পর বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত স্বাধীনতার কথা শুনে সাড়ে সাত কোটি মানুষ যেভাবে উদ্বেলিত হয়েছিল, সেটির অবলম্বন হিসেবে সরকার গঠনের ঘোষণা এবং ভাষণ প্রদান ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের বৈধ, সাহসী, বিচক্ষণ এবং সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ।
কিন্তু আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক শক্তির সমর্থন, সহযোগিতা এবং স্বীকৃতি লাভে প্রবাসী সরকারের পরিচয়টি মোটেও যথেষ্ট নয়। তা বুঝতে পেরেই সরকার দ্রুত বাংলাদেশের যেকোনো মুক্তাঞ্চলে শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। সেটি করা হচ্ছিল খুবই গোপনীয়ভাবে। প্রথমে দুটি স্থান বাছাই করা হয়েছিল। একটি রাজশাহী, অন্যটি কুষ্টিয়ার বৈদ্যনাথতলায়। তবে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত কেউই বুঝতে পারেনি যে শপথ অনুষ্ঠানের গোপন আয়োজন চলছিল। কেননা এর সামান্যতম গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে গেলে সরকারের নেতৃত্বকেই পাকিস্তানি বাহিনী বোমারু বিমান ব্যবহার করে হত্যা করত। এক্ষেত্রে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়া হয়েছিল। ১৬ এপ্রিল রাত ৪টায় কলকাতাস্থ ভারতীয় ও বিদেশি সাংবাদিকদের প্রস্তুত থাকার জন্য বলা হয়েছিল। ৮২ জন সাংবাদিক, ছবি সংগ্রাহক ও টিভি চিত্রগ্রাহককে ১৮টি জিপ ও কার এবং দুটি বাসে করে অজানা উদ্দেশ্যে গমনের জন্য নিয়ে যাত্রা করা হয়।
বৈদ্যনাথতলাকে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের জন্য বাছাই করা হয়েছিল এর ত্রিভুজাকৃতির ভূখণ্ডের সুবিধা বিবেচনা করে। ভারত সীমান্তের খুবই নিকটবর্তী হওয়ায় এবং পাকিস্তানি বোমারু বাহিনী সেখানে কোনোভাবেই আক্রমণ করতে না পারার কথা গভীরভাবে বিবেচনা করা হয়। মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, ঝিনাইদহ মহকুমা পুলিশপ্রধান মাহবুব উদ্দিন, মাগুরার তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক ওয়ালিউল ইসলাম, পাবনার প্রশাসক নুরুল কাদেরসহ বেশ কয়েকজন গোপনে স্থান নির্ধারণের কাজটি ১৫-১৬ তারিখ থেকে করছিলেন। ১৭ এপ্রিল মূল অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা ছিল সকাল ১০টায়। বৈদ্যনাথতলা গ্রামের ঘন আমবাগানের পাশের মিশনারি হাসপাতাল থেকে চেয়ার-টেবিল এনে তাড়াতাড়ি মঞ্চ স্থাপন করা হয়। বঙ্গবন্ধুর চেয়ারটি খালি রাখা হয়। ততক্ষণে সেখানে প্রায় ১৫ হাজারের মতো মানুষ উপস্থিত হয়ে যায়। বেলা ১১টায় কলকাতা থেকে আসা সাংবাদিকদের বহর প্রবেশ করে। অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত এবং সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়। এর পরই মঞ্চে আসীন হন নবগঠিত সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ অন্য সদস্যবৃন্দ। সংসদের স্পিকার ইউসুফ আলী রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের শপথগ্রহণ করান এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন। আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল নবগঠিত সরকারকে গার্ড অব অনার প্রদান করবেন কর্নেল ওসমান চৌধুরী। কিন্তু তিনি সময়মতো এসে পৌঁছাতে না পারায় ঝিনাইদহ মহকুমা পুলিশপ্রধান মাহবুব উদ্দিন উপস্থিত আনসার বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে সরকারকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।
শপথগ্রহণের পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ ইংরেজিতে প্রদান করেন। এর মাধ্যমে তিনি সারা বিশ্বকে নতুন রাষ্ট্র ও সরকারের বক্তব্য জানিয়ে দিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তার ভাষণে কষ্ট স্বীকার করে যেসব দেশি-বিদেশি সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন তাদেরকে ধন্যবাদ জানান। সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দীনের ভাষণ শেষে উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধারা গগনবিদারী কণ্ঠে, ‘তোমার নেতা, আমার নেতা/ শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’ বলে স্লোগান প্রদান করেন। এই স্লোগানের দৃশ্য এখনও ধারণকৃত ভিডিওর মাধ্যমে আমরা দেখতে পাচ্ছি। বিদেশি সাংবাদিকরা এই প্রথম বাংলাদেশ সরকারের নেতৃবৃন্দ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসী স্লোগানের ধ্বনিসংবলিত অডিও-ভিডিও ধারণ করেন। স্থান ত্যাগ করার আগে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ শপথগ্রহণের জায়গাটির নামকরণ করেন মুজিবনগর এবং সরকারেরও পরিচয় তখন থেকে প্রবাসীর বদলে মুজিবনগর সরকার হিসেবে পরিচিতি পায়। সাংবাদিকদের সম্মুখে একটি সংবাদ সম্মেলনও করা হয়। কোনো ধরনের আড়ম্বরতা এই সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে না থাকলেও ছিল সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রাণের স্পন্দন ও স্বাধীন রাষ্ট্র লাভের আকাঙ্ক্ষার দৃঢ়তা। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যেই নেতৃবৃন্দ এবং সাংবাদিকরা কলকাতায় নিরাপদে পৌঁছান। মূল অনুষ্ঠানের নিরাপত্তাদানে বিপুলসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা শুধু বৈদ্যনাথতলাতেই নয়, সড়কপথ এবং দূরবর্তী রাস্তা ও শহরেও পাহারারত ছিলেন। একই সঙ্গে সীমান্ত অঞ্চলে ভারতীয় নিরাপত্তা ও অন্যান্য বাহিনীর ছিল বড় ধরনের পাহারাদান। কোনোভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণ ঘটলে সেটিকে প্রতিহত করা, উপস্থিত নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকদের জীবন যাতে হুমকির মুখে না পড়ে, সেই ব্যবস্থাও করা ছিল। বলা চলে কঠোর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ১৭ এপ্রিল অজানা, অখ্যাত বৈদ্যনাথতলা মুহূর্তের মধ্যে হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সবচাইতে প্রসিদ্ধ এবং শ্রদ্ধা পরিপূর্ণ জায়গার নামÑ মুজিবনগর। মুহূর্তের মধ্যেই গণমাধ্যমের কল্যাণে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সরকারের শপথগ্রহণের দৃশ্য এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণসংবলিত সব আনুষ্ঠানিকতা সারা বিশ্ব প্রথম প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হলো।
বিশ্ব গণমাধ্যমের কল্যাণে দেশের অভ্যন্তরে প্রতীক্ষায় থাকা সাড়ে সাত কোটি মানুষ মুজিবনগর সরকারের শপথগ্রহণের কথা জানতে পারে। মানুষ বুঝতে পারে এই সরকার দ্রুতগতিতে একের পর এক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে একটি সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চলছে। এর ফলে মানুষের আস্থা নতুন সরকারের ওপর বহুগুণে বেড়ে যায়, হতাশা কেটে যায়। দলে দলে মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করার বীরত্ব প্রদর্শন করতে থাকে। বলা চলে এসব পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি অজানা, অচেনা স্বাধীনতার জনযুদ্ধ বাস্তবায়নের পথ জনগণের কাছে উন্মোচিত হতে থাকে। সরকার সে পথেই মানুষকে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়। সরকারের পথচলা ১৭ এপ্রিলের পর থেকে নতুনভাবে, নতুন নামে শুরু হয়। সমগ্র প্রক্রিয়াটিই ছিল আইনানুগ, বৈধ, দেশের জনগণের সমর্থিত এবং বিদেশি গণতান্ত্রিক শক্তির কাছ থেকেও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। সে কারণেই ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আরেকটি মাইলফলক সৃষ্টির ঘটনাবহুল দিন, যা স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সরকারকে ইতিহাসে সম্মানীয় স্থান করে দিয়েছে। এই সরকারের আস্থা ও ভালোবাসা যেমন ছিল জনগণের প্রতি, জনগণও ছিল এই সরকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। ওই সরকার ছিল বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত সহযোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত। বঙ্গবন্ধুর নামেই গোটা নয় মাস মানুষ পাকিস্তানিদের সব অত্যাচার, নির্যাতন উপেক্ষা করে স্বাধীনতার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে কতটা প্রস্তুত ছিল তা ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা।