মো. সাখাওয়াত হোসেন
প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৩ ০০:৩১ এএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
ভিয়েনা কনভেনশন অন ডিপ্লোম্যাটিক রেলেশনস ১৯৬১-এর অনুচ্ছেদ
৩-এ কূটনৈতিক
মিশন সর্বোপরি কূটনীতিকদের দায়দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে উল্লিখিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হচ্ছে কূটনীতিকরা নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ব্যতিরেকে গৃহীত ও প্রেরিত রাষ্ট্রের আগ্রহ/অনাগ্রহের
ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। গৃহীত রাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মধ্যস্থতায় আসতে হবে। প্রেরিত এবং গৃহীত রাষ্ট্রের মধ্যকার অর্থনৈতিক,
সাংস্কৃতিক এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সম্পর্ক রক্ষায় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সব শেষ আইনগত উপায়ে গৃহীত রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে প্রেরিত রাষ্ট্রকে অবহিত করতে হবে। অর্থাৎ অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিমায় কূটনৈতিক মিশনের দায়দায়িত্বের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে,
সেখানে কোথাও কোনো রাষ্ট্রের ওপর হস্তক্ষেপের বিষয়ে অধিকার প্রদান করা হয়নি। অথচ বাংলাদেশে দায়িত্বরত কূটনৈতিক মিশনের কোনো কোনো কূটনীতিক তাদের বক্তব্যে কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেছেনÑ
এমন অভিযোগ আছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন
রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক
দলের পক্ষে নয়। বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক,
নিরপেক্ষ
ও স্বচ্ছ নির্বাচন চায় যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, সুষ্ঠু
নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব শুধু নির্বাচন কমিশনের নয়, এটি
সরকার, রাজনৈতিক দল, সুশীল
সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের। সহিংস রাজনৈতিক অবস্থায় নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া
সম্ভব নয় এবং আগামী নির্বাচন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মনিটর করবে। ব্রিটিশ
হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন বলেন,
জাতীয়
নির্বাচন ঘিরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে ব্রিটেন। চলমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগমুক্ত
নয় তারা। তবে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন ঘিরে কোনো ধরনের সহিংসতা নয়; বরং
শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেখতে চান তারা। ডিকসন বলেন, বাংলাদেশের
চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা রাস্তাঘাটে
রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটেছে। আমরা সংঘর্ষ নয়,
শান্তি
দেখতে চাই। কথা হলো, তারা যদি সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক
স্থিতিশীলতার পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা পালনে ব্রতী হতেন, তাহলে সব
কটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের বৈঠকে বসা উচিত ছিল। যদিও কূটনৈতিক
শিষ্টাচার অনুযায়ী কোনোভাবেই অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কোনো দেশের
কূটনীতিকেরই নেই। তথাপি প্রয়োজন মোতাবেক নিরপেক্ষ জায়গা থেকে তারা তাদের অভিমত
ব্যক্ত করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবায়নের দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের।
যেকোনো দেশের জন্যই প্রাতিষ্ঠানিক
গণতন্ত্র, সুশাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের বিষয়। বিশ্বের
অনেক দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমাদের দেশের
তুলনায় ভঙ্গুর। সেসব দেশের
কূটনীতিকরা তথা দাতা দেশগুলোর প্রতিনিধিরা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে কথা বলেন, অন্য
কোনো দেশের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। কেবল ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে। আমরা
দেখছি আমাদের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো কোনো কূটনীতিক হস্তক্ষেপ করার বিষয়ে উৎসাহ
দেখাচ্ছেন। বিষয়টি কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কূটনীতিকরা যে দেশে
দায়িত্ব পালন করেন সে দেশের সঙ্গে তার দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বৈশ্বিক
সংকট মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক জোট গঠনে সম্যক ভূমিকা পালন করা উচিত। বাংলাদেশের
রাজনীতি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলবেন বাংলাদেশের
জনগণ ও বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা। এসব ব্যাপারে কূটনীতিকদের কথা বলার অবকাশ আছে কি? এর
বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিতেই পারে। তাদের ডেকে প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি
কূটনৈতিক তৎপরতাও চালাতে পারে।
উল্লিখিত কারণেই সংশ্লিষ্ট
দেশের কূটনীতিকদের ব্যাপারে এ দেশের জনসাধারণ ও
রাজনীতিবিদদের সোচ্চার ও প্রতিশ্রুতিশীল হতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার
পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয়। সেখানে বর্ণবৈষম্য ব্যাপক। জনগণ পুলিশি নির্যাতনের
শিকার। দিনে-দুপুরে শিশু-কিশোরদের
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে হরহামেশাই। এমতাবস্থায় অন্য দেশের
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তাদের কথা বলা কতটা সংগত, এই
প্রশ্ন উঠতেই পারে। কূটনীতিকদের কাজের পরিধি, কাজের ধরন, সীমা-পরিসীমা
প্রভৃতি ভিয়েনা কনভেনশনে যথাযথভাবে উল্লেখ রয়েছে। যেকোনো
বিষয়ে তাদের অভিমত থাকতে পারে, কিন্তু তারা সিদ্ধান্ত জোর করে
কোনোভাবেই চাপিয়ে দিতে পারেন না। তারা পরামর্শ দিতে পারেন, অভিমত
জানাতে পারেন, তবে তা হতে হবে শোভনীয়।
বাংলাদেশের চলমান রাজনীতি ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে কোনো কোনো কূটনীতিকের
বক্তব্য শোভনীয় নয়। এমনটি অতীতেও দেখা গেছে।
কিছুদিন ধরে বাংলাদেশে একটি
কালচার তৈরি হয়েছে। দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ সৃষ্ট সমস্যার
বিষয়ে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারা বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে যাচ্ছেন, সমস্যার
সমাধানে কূটনীতিকদের স্মরণাপন্ন হচ্ছেন। দেশের বাইরের গণমাধ্যমে দেশের
বিরুদ্ধে কলামও লিখছেন অনেকে। এই যে তাদের কার্যক্রম এবং অন্যের
ওপর নির্ভর করার মানসিকতা, নিজেদের মধ্যে আস্থাহীনতা প্রভৃতি বিষয়গুলো পুঁজি করে পশ্চিমা দেশের কূটনীতিকরা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ করার সুযোগ
পাচ্ছেন। এ সুযোগ কিন্তু আমরাই তৈরি করে দিচ্ছি,
তা না
হলে কূটনীতিকরা এ ধরনের আচরণ করতেন না। কূটনীতিকরা সাধারণত রাষ্ট্রীয় পলিসি নিয়ে
কাজ করবেন, তাদের দেশের নীতি-নির্ধারণী
বিষয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফোরামে মন্তব্য প্রদানে সহযোগিতা করবেন। সংশ্লিষ্ট দেশে বিনিয়োগ, অর্থনৈতিকভাবে
সহযোগিতার দ্বার উন্মোচন করা, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে
তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করা, পরামর্শ
দেওয়া ইত্যাদি বিষয়ে কূটনীতিকরা ভূমিকা রাখবেন। তবে কোনোভাবেই তাদের অশোভন হস্তক্ষেপ
কাম্য নয় এবং এমনটি কূটনীতির ব্যাকরণের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কোড অব কনডাক্ট তথা
আচরণবিধি মেনে কূটনীতিকদের বক্তব্য প্রদান করা উচিত।
মোদ্দা কথা হচ্ছে, আমাদের রাজনীতিবিদদের আরও সহনশীল, ধৈর্যশীল হতে হবে। নিজেদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা সুসংহত করা উচিত। এসবের সংমিশ্রণ না হলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শঙ্কার মধ্যে পড়বে। কোনো কোনো রাজনীতিবিদ যৎসামান্য বিষয়ে বিদেশিদের কাছে অভিযোগ জানাতে দ্বিধা করেন না, অথচ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিষয়গুলোর সুষ্ঠু সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্যদের নাক গলাতে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া কারোর জন্যই শুভপ্রদ নয়। সংবিধান মেনে চলতে হবে সবাইকে।রাজনীতিকরা যেন নিজেদের সমস্যা অন্যের হাতে তুলে দিয়ে বৈরী পরিস্থিতি সৃষ্টির দরজা খুলে না দেন। আমাদের নির্বাচন কোন প্রক্রিয়ায় হবে, নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কিভাবে তৈরি করা যায়, নির্বাচন কমিশনের প্রতি সবার গ্রহণযোগ্যতা কিভাবে বাড়োনো যায়, এসব বিষয়ে নিজেদের মধ্যে ঐকমত্য জরুরি। অন্যকে ডেকে এনে নয়।