× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সংকটেও অর্থনীতি অনেকটা নিঃশঙ্ক, তবে…

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০০:৩০ এএম

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

অলঙ্করন : জয়ন্ত জন

সম্প্রতি অর্থনৈতিকভাবে সংকটগ্রস্ত দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দেওয়া ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে বৈশ্বিক ঋণদাতা সংস্থাটি শেষ অবলম্বন হিসেবে সংকটে পড়া কয়েকটি দেশকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য ঋণ দেয়, যা দিয়ে দেশগুলো আর্থিক সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করে চলমান বৈশ্বিক সংকটে অর্থনৈতিক খাতে অস্থিতিশীলতা ঠেকাতে বাংলাদেশেরও আইএমএফ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয় ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে আইএমএফ সব সময়ই বেশকিছু শর্ত দিয়ে থাকে বাংলাদেশকেও আইএমএফ অনেকগুলো শর্ত দিয়েছে শর্তগুলোর কিছু শর্ত আইএমএফ বলুক বা না বলুক, আমাদের স্বার্থেই পূরণ করা উচিত এগুলোর মধ্যে প্রথমটি হলো কর-ব্যবস্থার উন্নতি জন্য করের পরিমাণ নির্ধারণ, কর আদায় থেকে শুরু করে কেউ যেন কর ফাঁকি দিতে না পারে এই বিষয়ে সতর্ক নজর রাখা জরুরি দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আমাদের ব্যাংকিং খাত এক সংকটময় মুহূর্ত পাড়ি দিয়ে চলেছে করোনা দুর্যোগের পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এবং ডলারের বিপরীতে টাকার নিম্নমুখী মানের কারণে ব্যাংকিং খাত নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে তবে এক্ষেত্রে আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহির অভাবের পাশাপাশি দুর্নীতির বিষয়টিকেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই তৃতীয়ত, দ্রব্যমূল্য কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না জন্য জ্বালানি খাতে সংস্কার জরুরি বিভিন্ন কারণে এই খাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।

কর-ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক এবং জ্বালানি খাতে সংস্কার এই তিনটি শর্ত নিয়ে আমাদের অবশ্যই কাজ করা উচিত। তবে  আইএমএফের প্রতিটি শর্ত আমাদের যথাযথভাবে মানতে হবে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। তারা সার এবং অন্যান্য পণ্যে ভর্তুকি কমানোর কথা বলেছে। এর খুব একটা প্রয়োজন নেই। সরকারের ভর্তুকি ম্যানেজমেন্ট এক্ষেত্রে কৌশলী হলে আইএমএফকে রুটিন চেকে ভর্তুকি না দেওয়ার বিষয়টি দেখাতে পারবে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির ক্ষেত্রে ভর্তুকি অত্যন্ত জরুরি। এমনটি কৃষকের জীবনমানের উন্নয়ন সার্বিকভাবে দেশের উন্নয়নের পথ সুগম করতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশের সামনেই আইএমএফের ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে কৃষি উপকরণে ভর্তুকি বন্ধের শর্ত আসেতারা এ বিষয়ে কৌশলী হওয়ায় শর্তপূরণ করতে পারে সহজেই। আমাদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি কঠিন নয়। একথ সত্য, নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি মোটামুটি একটা ভালো ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই অর্থনৈতিক শক্তি ধরে রাখতে হবে। এ জন্য চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তেমনটা না হলে সমস্যা বাড়বে। ইতঃপূর্বে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ লিখেছিলাম, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এই মুহূর্তে আইএমএফের সব শর্ত আমাদের পক্ষে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তখন এ আশাবাদও ব্যক্ত করেছিলাম, এ ঋণ আমরা হয়তো পাব এবং তা আমাদের দরকার কারণ এই ঋণের সঙ্গে অবধারিতভাবে কিছু সংস্কারের পথ সৃষ্টি হবেবহুদিন ধরে আমরা এসব সংস্কারের কথা বলে আসছিএ মুহূর্তে আইএমএফের ঋণের জন্য এসব সংস্কার হবে। এটি অবশ্যই একটি ভালো দিকতবে আমাদের অর্থনীতির যেন ক্ষতি না হয়, তেমন সিদ্ধান্ত নীতিনির্ধারকদের নিতে হবে। আমরা খুব দ্রুত আত্মতুষ্টিতে ভুগি। এই ঋণ পাওয়ায় অন্য সংস্থার ঋণ পাওয়া সহজ হবে এমন ভাবনা থেকে বের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো সেরে ফেলতে হবে।

যেহেতু আইএমএফ কিছু শর্ত দিয়েছে, সেহেতু সঙ্গত কারণেই এ প্রশ্নও নানা মহলে দেখা দিয়েছে, এসব শর্ত কতটা আমাদের অনুকূলে। প্রথমেই বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছি। আইএমএফের সব শর্ত আমাদের পূরণ করার প্রয়োজন নেই। তাদের মূল শর্তগুলোর ওপর জোর দিতে হবে। বৈশ্বিক সংকট ক্রমেই অর্থনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল এ বিশ্বে অনেক রাষ্ট্রেরই অর্থনৈতিক অবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। সংকটাপন্ন মুহূর্তেও বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি ভালো অবস্থানে আছে। আইএমএফ এ শর্তগুলো না দিলেও এগুলোর দিকে নজর দেওয়া এবং বাস্তবায়ন করা দরকার এবং আমরা বহু আগে থেকেই এই সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে আসছি। বৈশ্বিক সংকটে অনেক দেশই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কিছুটা টালমাটাল অবস্থানে আছে। কিন্তু এও সত্য, পরিবর্তনশীল এ বিশ্বে যেকোনো মুহূর্তে অবস্থা্র ইতিবাচক পরিবর্তনও ঘটতে পারে। আজ যে দেশের অর্থনীতি খারাপ অবস্থানে আছে, আগামী কয়েক বছরে তার উন্নতি হতেই পারে। এখন পর্যন্ত আমাদের অর্থনীতি ভালো অবস্থানে আছে, কিন্তু আগামী বছরেও ভালো থাকবে এর নিশ্চয়তা নেই। তাই অর্থনীতির অবস্থা ভালো রাখার জন্য আইএমএফের মূল শর্ত মোতাবেক দেশের কর, জ্বালানি এবং আর্থিক খাতে সংস্কার জরুরি। পাশাপাশি অর্থনীতির বিকাশে প্রতিবন্ধক এমন সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। আমরা জানি, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার ফলে আমাদের রপ্তানি ও প্রবাসী আয় কমছে ছাড়া রাশিয়া ও ইউরোপীয় দেশগুলো লেনদেন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে রাখায় আর্থিক লেনদেনেও নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, আমরা এখনও অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে এসব সমস্যা আমরা নিজেরাই সমাধান করে নিতে পারব বলে মনে করিকিন্তু অভ্যন্তরীণ যে বিষয়গুলোর কথা বলেছি, সেগুলোর সমাধান আগে করলে আমরা আরও স্থিতিশীলতা পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে সক্ষম হব।

অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন বিশেষত অর্থনীতির অবস্থা স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতেই হবে বর্তমান সরকার বিষয়ে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি ঘোষণা করেছে এবং চলতি বছর ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই লক্ষ্যে ২৫টি নির্দেশনাও দিয়েছেন প্রতিটি খাতে যদি সুশাসন-স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায় তাহলে আর্থিক খাতেও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে আর্থিক খাতের ব্যাপারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আন্তরিক প্রতিশ্রুতি থাকলে অনিয়ম-দুর্নীতি ঠেকানো কঠিন কিছু নয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রতিশ্রুতি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচলিত আইন মোতাবেক কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাধ্য হবে আর্থিক খাতে অনিয়ম বন্ধে আমাদের আইন যে নেই, তা তো নয় কিন্তু সমস্যা হলো, এসব আইন প্রতিপালন কিংবা মেনে চলার বিষয়ে অনেকেরই সচেতনতা কিংবা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না

খেলাপি ঋণ এবং দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার খবর প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধিবদ্ধ আইনগুলো অনুসরণ করলে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনতা দিতে পারলে আর্থিক খাতের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির অনেকটাই নিরসন হতো যেহেতু সরকার অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা ঘোষণা দিয়েছে সেহেতু যারা এসব অপকর্মে যুক্ত তাদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় এনে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে কঠোর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা করলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে তবে আমাদের নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে মামলা সাজানোর জন্য বিভিন্ন অনুষঙ্গ খুঁজে বের করতে হয় তখন তদন্তের নামে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অসাধুরা সহজেই পার পেয়ে যায় আর্থিক খাতে অনিয়মের বহু মামলা এখনও বিচার প্রক্রিয়াধীন কিংবা দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে অভিযুক্তরা যদি শাস্তির আওতায় না আসে, তাহলে আর্থিক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি ঠেকানো যাবে না

আগেই বলেছি, আমরা খুব সহজেই আত্মতুষ্টিতে ভুগি আইএমএফের ঋণ পাওয়ার পরও এমনটা হয়েছে তার আগে দেশের আর্থিক খাতের অনিয়ম নিয়ে যে উদ্বেগ ছিল তা যেন মিইয়ে গেছে যেমন আছে তেমন চলতে থাকুকÑ এই প্রবণতা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে ভুলে গেলে চলবে না, দেশে এখনও খেলাপি ঋণের ওপর কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ আসছে না খেলাপি ঋণের সমস্যাগুলো অচিহ্নিত নয় আমাদের আর্থিক খাতের ঝুঁকি হলো— দায়িত্বশীল কতিপয় অসাধুর অদক্ষতা, দুর্নীতিপ্রবণতার পাশাপাশি ঋণগ্রহীতার অসচেতনতা এবং কারসাজি ব্যাংকগুলো সঠিক খাতে ঋণ দিলে ঋণখেলাপির তালিকা এত দীর্ঘ হতো না আমাদের দেখতে হবে কারা ঋণ খেলাপ করছে উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন কারণ তাদের কারো কারো নিজেদের দোষ ছাড়াও অভ্যন্তরীণ বৈশ্বিক পরিবর্তনের ফলে তাদের উদ্যোগ ক্ষতির মুখে পড়ে ক্ষেত্রে তারা ঋণখেলাপি হতেই পারে কিন্তু ঋণগ্রহীতার কারসাজিতে ঋণখেলাপি হলে তা আর্থিক খাতের অদক্ষতা এবং অনিয়মের কারণেই হয়ে থাকে এও সত্য, আমাদের দেশে অনেক উদ্যোক্তা ফান্ড ডাইভার্ট করেন বা ঋণ নিয়ে শিল্পে বিনিয়োগ না করে অন্য কাজে ব্যবহার করেন আবার ঋণ নিয়ে অর্থ পাচারের অভিযোগও অসত্য নয় এক্ষেত্রে ব্যাংকের দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই ব্যাংক মূলত সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান আর্থিক খাতের উজ্জ্বল্যের জন্য এবং অর্থনীতির বিকাশে সর্বাগ্রে জরুরি সুশাসন এর কোনো বিকল্প নেই


  • বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা