অলঙ্করন : প্রবা
১৯৪৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত ভাগের আগেই উভয় রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এ সময় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর প্রস্তাব করেন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ। এ নিয়ে তিনি একটি প্রবন্ধ লেখেন। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা উর্দু না হওয়ায় ভাষার প্রশ্নে ড. জিয়াউদ্দিনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ শীর্ষক পাল্টা প্রবন্ধে ড. জিয়াউদ্দিনের প্রস্তাবের অসাড়তা প্রমাণ করেন। তৎকালীন দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধে ড. শহীদুল্লাহ লিখেছিলেন, ‘বাংলা দেশের কোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দী ভাষা গ্রহণ করা হইলে তাহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে।’ তৎকালীন সরকারি ইন্টারমিডিয়েট কলেজের (বর্তমান ঢাকা কলেজ) ছাত্রাবাস ‘নূপুর ভিলায়’ ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বিকাল ৪টায় অনুষ্ঠিত ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও উর্দু’ শীর্ষক এক ঘরোয়া সেমিনারেও সভাপতিত্ব করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তার সভাপতিত্বে ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় সাহিত্য সম্মলন। এই সম্মেলনের সভাপতির ভাষণে তিনি সেদিন বলেছিলেন, ‘… আমাদের মনে রাখতে হবে ভাষার ক্ষেত্রে গোঁড়ামি বা ছুঁৎমার্গের কোনো স্থান নেই।’
ভাষার প্রশ্নে বিতর্কের শুরু থেকেই একদল বাংলাকে সংস্কৃতঘেঁষা করে তুলতে চাইছিল। তৎসম ও তদ্ভব শব্দের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের মাধ্যমে ইচ্ছেকৃতভাবে এ দলের সদস্যরা বাংলাকে সংস্কৃতঘেঁষা হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেয়। অন্যদিকে আরেক দল চাইছিল—ভাষার গায়ে আরবি-ফারসির
প্রলেপ লাগাতে। তারা ভাষাকে ইসলামীকরণের দিকে মন দিয়ে হরমামেশা বাংলায় মিশিয়ে দিতে থাকে আরবি-ফারসি
শব্দ। এমনকি একদল আরবি হরফে বাংলা লেখারও প্রস্তাব দিয়েছিল। যার সমর্থনে এগিয়ে এসেছিল অনেকে। ড.
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সেদিনের সাহিত্য সম্মেলনে নিজের ভাষণে এই দুদলের কর্মকাণ্ড দেখে বলেছিলেন,
‘ঘৃণা
ঘৃণাকে জন্ম দেয়। গোঁড়ামি গোঁড়ামিকে জন্ম দেয়। একদল যেমন বাংলাকে সংস্কৃতঘেঁষা করতে চেয়েছে,
তেমনি আর একদল বাংলাকে আরবী-পারসীঘেঁষা
করতে উদ্যত হয়েছে। একদল চাচ্ছে
খাঁটি বাংলাকে ‘বলি’ দিতে, আর একদল
চাচ্ছে ‘জবেহ’ করতে। একদিকে কামাড়ের খাঁড়া, আর
একদিকে কসাইয়ের ছুরি।’
ভাষার গতিপথ স্বতঃস্ফূর্ত। ব্যাকরণ মেনে ভাষা তার পথ চলে না। ভাষা মানুষের মুখ থেকে তার গতিপথ চিনে নেয়। মানুষের মুখ থেকে কেড়ে নেওয়ায় ভাষা তার গতিপথ হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে,
ভাষার ইতিহাসে এমন নজির অনেক। বিষয়টি উপলব্ধি করেই ড.
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন,
‘নদীর
গতিপথ যেমন নির্দেশ করে দেওয়া যায় না,
ভাষারও তেমনি। একমাত্র কালই ভাষার গতি নির্দিষ্ট করে। ভাষার রীতি
(স্টাইল)
ও গতি কোনো নির্দিষ্ট ধরাবাঁধা নিয়মের অধীন হতে পারে না।…
মোট কথা,
ভাষা চাই সহজ,
সরল এবং ভাষার রীতি
(স্টাইল)
হওয়া চাই স্বতঃস্ফূর্ত,
সুন্দর ও মধুর।’
ভাষার ওপর যদি বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়,
ভাষা তার স্বাভাবিকতা হারায়। মানুষ যে ভাষা বোঝে,
সে ভাষাতেই তার মনের ভাব প্রকাশ করে। সেখানে সে আরোপিত কোনো কিছু মেনে নিতে চায় না। সাধারণের পক্ষে তা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হওয়ার প্রতিবাদে ড.
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ গায়ের কালো আচকান কেটে প্রথম কালোব্যাজ ধারণ করেন। পরে ঢাকা জেলা শিক্ষক সম্মেলনে একুশের হত্যাযজ্ঞ ও হতাহতের প্রসঙ্গ টেনে বলেন— ‘ছাত্ররা এসব ব্যাপারে
জড়িত,
আমরা সে সম্পর্কে নীরব থাকতে পরি না। আমরা আশা করি,
একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির দ্বারা এ ঘটনা সম্পর্কে তদন্তের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ভাষা
আন্দোলনের মনস্তাত্ত্বিক পর্ব থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বেও সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এই জ্ঞানতাপস প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।
গ্রন্থনা
: মামুন রশীদ