এম এ খালেক
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৩:০২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
করোনা-উত্তর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক
সংস্থা এবং অর্থনীতিবিদরা বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে আশার বাণী শোনাচ্ছিলেন। তারা ভেবেছিলেন,
অর্থনীতি আবারও তার স্বাভাবিক গতিতে ফিরে আসবে। কিন্তু গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে অপ্রত্যাশিতভাবে
রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করলে অর্থনীতিবিদদের সমস্ত হিসাব-নিকাশ বদলে যায়।
অনেকেই মনে করেছিলেন, এই অসম যুদ্ধ বেশি দিন স্থায়ী হবে না। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা
আরোপ করায় রাশিয়ার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে এবং দেশটি যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হবে।
কিন্তু সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হতে সময় লাগেনি। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবরোধের
প্রতি কোনো তোয়াক্কা না করে রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ
কমিয়ে দেয়। ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
আন্তর্জাতিক বাজারে যেসব দেশ রাশিয়ার জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ওপর
নির্ভরশীল, তাদের নিকট জ্বালানি তেল বিক্রির ক্ষেত্রে রুবলের (রাশিয়ান মুদ্রা) মাধ্যমে
মূল্য পরিশোধের জন্য রাশিয়া শর্তারোপ করে। ফলে রাশিয়ান মুদ্রা রুবলের বিনিময় হারে তেজী
ভাব সৃষ্টি হয়। নিকট অতীতে আর কখনোই রাশিয়ান রুবল এতটা শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। অবশ্য
একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মুদ্রা ডলারও অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী
হয়ে ওঠে। রাশিয়া বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের একÑদশমাংশ জোগান দিয়ে থাকে। রাশিয়া ইউরোপীয়
ইউনিয়নভুক্ত অনেক দেশে গ্যাস রপ্তানি করে। এ ছাড়া রাশিয়া এবং ইউক্রেন মিলিতভাবে বিশ্ব
খাদ্য চাহিদার ৩০ শতাংশ পূরণ করে থাকে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ২০ শতাংশ
কমিয়ে দেয়। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের মূল্যও অনেকটা বাড়িয়ে দেয়, যা সম্প্রতি আরও একদফা
বেড়েছে। দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের
কারণে অনেকেই নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। অনেকেই কর্মচ্যুত হয়েছেন। কেউ-বা
বেতন হ্রাসের শিকারে পরিণত হয়েছেন। সাধারণভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সাংঘাতিকভাবে কমে
গেছে।
২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্যের যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রত্যক্ষ
করা যায়, তার পেছনে উৎপাদন হ্রাসজনিত সমস্যা তেমন কোনো ভূমিকা পালন করেনি। কারণ গত
মৌসুমে বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন অনেকটাই স্বাভাবিক ছিল। যেমনÑ রাশিয়া এবং ইউক্রেন
বিশ্ববাজারের খাদ্যপণ্যের মোট চাহিদার ৩০ শতাংশ পূরণ করে থাকে। গত মৌসুমে ইউক্রেনে
৮ কোটি ৬০ লাখ টন খাদ্যপণ্য উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে দেশটি অনেক দিন আন্তর্জাতিক
বাজারে খাদ্যপণ্য রপ্তানি করতে পারেনি। খাদ্যভর্তি জাহাজ বন্দরে আটকে ছিল। যুদ্ধের
কারণে ইউক্রেনীয় খামারিরা তাদের উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের ৩০ শতাংশ তুলতে পারেনি। চলতি মৌসুমে
দেশটির খাদ্যপণ্য উৎপাদন সাংঘাতিকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ বছর পরিবহন সংকটের
পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের উৎপাদন হ্রাসজনিত সমস্যাও যুক্ত হবে। উৎপাদন হ্রাস শুধু যে ইউক্রেনের
ক্ষেত্রে ঘটবে তা নয়, বিশ্বব্যাপী কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে স্বাভাবিকভাবেই
উৎপাদন কমে যাবে। যেসব দেশ তাদের জনগণের খাদ্য চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে থাকে,
তারা সবচেয়ে বিপদে পড়বে। এ বছর বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্য কমার কোনো কারণ থাকবে
না, বরং আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলো অস্বাভাবিক উচ্চমাত্রার
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সবচেয়ে সহজ পন্থা অবলম্বন করছে। বিশ্বের অন্তত ৭৭টি দেশের
সেন্ট্রাল ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে সুদহার বাড়িয়েছে। নীতি সুদহার বাড়ানোর উদ্দেশ্য হলো,
এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শিডিউল ব্যাংকগুলোর ঋণ গ্রহণের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং এর অনিবার্য
প্রভাব পড়ে ব্যাংকঋণের সুদের ওপর। ব্যাংকঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পেলে উদ্যোক্তা এবং
ব্যক্তিপর্যায়ে ঋণগ্রহণের মাত্রা কমে যায়। এতে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ কমে যায়। ফলে
ভোক্তারা চাইলেই আগের মতো পণ্য কিংবা সেবা ক্রয় করতে পারে না।
এ অবস্থায় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা ক্রমেই প্রকট হলে বাংলাদেশের
অবস্থা কেমন হবে তা নিয়ে প্রশ্ন জাগতেই পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃতি একটু ভিন্ন
ধরনের। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে। তবে সরকারের গৃহীত উদ্যোগে
মূল্যস্ফীতি বর্তমানে কিছুটা কমে এসেছে। অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহার
৫ শতাংশ ছিল। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতি সুদহার দুই দফায় দশমিক ৭৫ শতাংশ বাড়ানো
হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকঋণের আপার ক্যাপ আগের মতোই ৯ শতাংশ রয়ে গেছে। ফলে ব্যক্তিখাতে
ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেনি। মুদ্রানীতিতে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। গত অর্থবছরের (২০২০-২১) জুলাই-সেপ্টেম্বর
পর্যন্ত ব্যক্তিখাতে শিল্পে ব্যবহার্য ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি)
খোলা হয়েছিল ১৭৭ কোটি মার্কিন ডলারের। গত বছর একই সময়ে মধ্যবর্তী পণ্য আমদানির জন্য
এলসি খোলা হয়েছিল ১৭৫ কোটি মার্কিন ডলারের। এবার তা ১৪৯ কোটি মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে।
অর্থাৎ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ শতাংশের বেশি। শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল আমদানির
জন্য আগের বছর একই সময়ে এলসি খোলা হয়েছিল ৭৪৭ কোটি মার্কিন ডলারের। এবার তা ৬৩৮ কোটি
মার্কিন ডলারে হ্রাসপ্রাপ্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে সুবিধা হচ্ছে সংকটকালের
খাদ্য উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি.) তথ্যমতে,
২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট ৩ কোটি ৯৭ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়েছে। দেশে বার্ষিক
খাদ্য চাহিদার পরিমাণ হচ্ছে ৩ কোটি ৫৫ লাখ টন। অর্থাৎ খাদ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে ৪২ লাখ টন। এর মধ্যে
জনগণের খাদ্য চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হচ্ছে ২ কোটি ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার টন। বৈশ্বিক সংকটকালেও
বাংলাদেশের রপ্তানি আয় অর্থবছরে বেড়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কার্যত নির্ভর করে তৈরি
পোশাকের ওপর। বাংলাদেশ প্রধানত স্বল্পমূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। আন্তর্জাতিক
বাজারে ক্রেতাদের ভোগ ব্যয়ের চাহিদা এবং সামর্থ্য হ্রাস পাওয়ায় তারা তুলনামূলক স্বল্পমূল্যের
তৈরি পোশাক ক্রয় করছে। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য ‘শাপে বর’ হয়েছে। আন্তর্জাতিক
মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, আগামীতে বিশ্বের
৩৩ শতাংশ দেশ মন্দাকবলিত হতে পারে। এই তালিকায় বাংলাদেশ থাকবে না এটা দৃঢ়তার সঙ্গেই
বলা যেতে পারে।