ফকির ইলিয়াস
প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৬:৫১ পিএম
পবিত্র রমজান মাস এলেই
কিছু মুনাফালোভী ব্যবসায়ী মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ান। আসছে রমজান মাসে
বাজারে পণ্যদ্রব্যের চাহিদার অনুপাতে জোগান কম থাকার খবর পাওয়া গেছে সংবাদমাধ্যমে।
এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ তো আছেই, খাদ্যদ্রব্যে ভেজালের বিষয়টিও
এড়িয়ে যাওয়ার নয়। ভেজাল ও নকল পণ্য একদিকে সরবরাহিত হচ্ছে; অন্যদিকে লাগামহীন পণ্যের দামে পিষ্ট জনজীবন। প্রতিনিয়তই
সংবাদমাধ্যমে খাদ্যে ভেজাল বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন যেমন পাওয়া যায়, তেমনি
মোবাইল কোর্ট কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে শাস্তি বিধানের খবরও
মেলে। তারপরও থামানো যাচ্ছে না খাদ্যে ভেজালের দৌরাত্ম্য। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন
দৈনিকে এক ধরনের নিয়মিত কলাম ছাপা হয়। এই কলামটি ‘ডাইনিং আউট’ বা ‘বাইরে কোথায় খাবে’ এই বিভাগে ছাপা হয়।
কলামটির শিরোনাম ‘গত সপ্তাহে যেসব রেস্টুরেন্ট স্বাস্থ্য নীতিমালা
লঙ্ঘন’ করেছে। শুধু তাই নয়, সেসব রেস্টুরেন্টের নাম,
ঠিকানা, ফোন নম্বর থাকেÑ যারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবিধি ভঙ্গ করেছে। এমনকি কীভাবে
তারা স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন করেছেন, সে খবরও থাকে। যেমন তাদের রান্নাঘরে বাসি খাবার
পাওয়া গেছে, রান্নাঘরে ছোট ইঁদুর কিংবা পোকার উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, কিংবা
রেস্টুরেন্টের টয়লেট-ওয়াশরুম ময়লা ছিল ইত্যাদি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রেস্টুরেন্টের
রান্নাঘরে পুরোনো-বাসি খাবার, পোকার উপস্থিতি প্রভৃতিই বেশি লক্ষ্য করা যায়। সিটি
কর্তৃপক্ষের হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ইন্সপেক্টররা প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন
রেস্টুরেন্ট পরিদর্শন করে রিপোর্ট দেন। ওই রিপোর্ট অনুসারে হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন
তা-ই সংবাদপত্রে সরবরাহ করে। তথ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে তা ছাপা হয় সংবাদ
প্রতিবেদনে।
পাঠক, অনুমান করুন যদি
নিউইয়র্কের একটি সংবাদপত্রে একটি রেস্টুরেন্টে বাসি খাবার বিক্রির রিপোর্ট ছাপা
হয়, তবে আর কোনো খদ্দের কি ওই রেস্টুরেন্টের বারান্দায় গিয়ে পা ফেলবে? না, অবশ্যই
ফেলবে না। এমনও দেখা গেছে, হেলথ কোড ভঙ্গের রিপোর্ট ছাপা হওয়ার কারণে অনেক
রেস্টুরেন্টে লালবাতি জ্বলে গেছে চিরদিনের জন্য। কারণ মার্কিনিরা খাবারের ব্যাপারে
অত্যন্ত সচেতন। গাঁটের ডলার খরচ করে তারা ফাঙ্গাসযুক্ত বাসি খাবার কিনে খাবেন কেন?
তার ওপর কোনো রেস্টুরেন্টে বাসি খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে ওই রেস্টুরেন্টের বিরুদ্ধে
আদালতে মামলা করার সুযোগ তো রয়েছেই। অর্থাৎ রেস্টুরেন্টের মালিকপর্যায় থেকে কর্মীÑ
প্রত্যেকেই সতর্ক থাকেন যেন তাদের রেস্টুরেন্টের নাম ওই কলামে দেখতে না হয়।
এক পরিচিত মার্কিনি
একবার একটি চায়নিজ রেস্টুরেন্ট থেকে ফ্রাইড চিকেন খেয়েছিলেন। কিন্তু ওই ফ্রাইড
চিকেনের ভেতরের হাড় ভালোভাবে পরিষ্কার করা হয়নি এবং ভালোভাবে না ভাজায় ভেতরে রক্ত
থেকে গিয়েছিল। রক্তাক্ত হাড় চিবিয়ে গিলে ফেলায় তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। শরীরের
একাংশ প্যারালাইজড হয়ে যায়। চিকিৎসায় তার কারণ ধরা পড়ে। তিনি ওই রেস্টুরেন্টের
বিরুদ্ধে মামলা করে ক্ষতিপূরণ পান দুই মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ একটি পত্রিকার
রেস্টুরেন্ট রিভিউ, একটি রেস্তোরাঁকে যেমন ব্যাপক জনপ্রিয়তা দিতে পারে, তেমনি
অস্বাস্থ্যকর খাদ্য পরিবেশনের কথা ছাপা হলে ওই রেস্তোরাঁটির ব্যাপক আর্থিক ক্ষতিও
হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে হেলথ ইন্সপেক্টররা যাতে কোনো রেস্টুরেন্ট মালিক কর্তৃক
প্রভাবিত হতে না পারেন, তার জন্যও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। দায়িত্বরতদের কার্যবিধি
গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য থাকে অন্য আরেকটি গোয়েন্দা দল। কারণ তারা কাজ ঠিকমতো
করছেন কি না, কিংবা কোনো দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছেন কি না তা দেখার দায়িত্ব হলো ওই সব
গোয়েন্দা কর্মকর্তার।
মোট কথা হচ্ছে, কোনো ইন্সপেক্টর যাতে
দুর্নীতিগ্রস্ত হতে না পারেন, সে জন্যই এ ব্যবস্থা। এই যে সততার অভিযান, তা
সংস্কৃতির একটি অংশ। মানুষ টাকা দিয়ে বাজে দ্রব্য কিনবে না। রাষ্ট্র মানুষের
অধিকার নিশ্চিত করবে। আমি মনে করি, রাজনৈতিকভাবে বদলাবার আগে সাংস্কৃতিকভাবে
বদলানো দরকার। এই সময়ে, গোটা বিশ্বজুড়ে সংস্কৃতির বিবর্তন সাধিত হচ্ছে। মানুষ ফিরে
যাচ্ছে তার মৌলিকতার দিকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপে ফোকলোর সাহিত্য
নিয়ে, লোকজ আবহের সংস্কৃতি নিয়ে যে ব্যাপক গবেষণাকর্ম শুরু হয়েছে, তা আমাদের
অবশ্যই আশার আলো দেখায়। অপসংস্কৃতি কিংবা অপসভ্যতা যেকোনো সমাজে ঢুকে না কিংবা
ঢুকতে পারে না তা কিন্তু নয়। ঢুকতে অবশ্যই পারে। কিন্তু বেশিদিন টিকে থাকতে পারে
না। অপসংস্কৃতিকে বিদায় নিয়ে চলে যেতে হয়। একইভাবে অপরাজনীতিও কোনো রাষ্ট্রের মূল
নিয়ামক হতে পারে না। তাকেও বিদায় নিতে হয়।
বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিবর্তনবাদী কবি ইউসেফ কমুইয়াকা। ইউসেফ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যারা আমার কবিতা পড়বে তাদের আগে আমার সংস্কৃতি জানতে হবে। কারণ আমার কবিতা, আমার পঙক্তিমালার উত্থান হয়েছে আমার মাটি থেকে। যারা আমার মাটিকে চিনবে না, তারা আমার সংস্কৃতি কী বুঝবে? পাঠক বিবেচনা করুন, তার কথাগুলো কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি, বাঙালী জাতির একটা উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে। এটাকে শাণিত করা দরকার। প্রজন্মকে জাগানো দরকার নীতির পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে। বাংলাদেশের বড় দুর্ভাগ্য হচ্ছে, ইতিহাসের বিকৃতি। তা রাজনৈতিক হোক, আর সামাজিক হোক। হঠাৎ করে বদলে গিয়েছে পোশাক-আশাকের আদলও। সংস্কৃতির যোগসূত্রকারী যিনি তাকেই আমরা রাজনীতিবিদ হিসেবে শনাক্ত করতে পারি। তবে রাজনীতিকরা তাদের দায় সম্পর্কে কতটা ওয়াকিফহাল তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। রাজনীতিবিদকে পড়তে হবে, জানতে হবে সমসাময়িক রাজনৈতিক বিশ্বকে। বাংলাদেশে রাজনীতির, সংস্কৃতির বিবর্তন আমরা অবশ্যই চাই। তবে তা হতে হবে দীনতাবিহীন। আগে আমাদের সৎ মনোবলে বলীয়ান, দক্ষ সমাজ সংস্কারক এবং বিজ্ঞ বিবেচক হিসেবেই প্রতিষ্ঠা পেতে হবে। মনে রাখতে হবে, যারা রাষ্ট্রের প্রকৃত রাজনৈতিক চেতনাকে, সৃজনশীল শিল্পকে পৃষ্ঠপোষকতা করবেন, তারাই কিন্তু এর প্রধান শক্তি। এভাবেই আমরা আমাদের চলমান সংকটগুলোকে দূর করতে পারব। না হলে জনদুর্ভোগ বেড়েই চলবে।
- নিউইয়র্ক প্রবাসী লেখক ও কবি