অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
ভাড়া নিয়ে যাত্রী-কন্ডাক্টরের বচসা নতুন নয়। অভ্যস্ত যাত্রীরা কন্ডাক্টরের দাবিমতো ভাড়া দিলেও মাঝে মাঝে বেঁকে বসেন কোনো যাত্রী। তিনি ভাড়া দিতে চান দূরত্ব হিসাব করে, যা মানতে নারাজ কন্ডাক্টর। ফলে বাসের ভেতরে হুমকি-ধমকি, শার্টের কলার চেপে ধরা, ঘুসি পাকানো, বাস থেকে নামিয়ে দেওয়াসহ অপমান-অপদস্থের চূড়ান্ত। ভাড়ার তালিকা দেখতে চাইলে আত্মসম্মানই শেষ। সরকারি নির্দেশিকা নিয়েই এ হট্টগোল, তবু অধিকাংশ যাত্রীই নীরব দর্শক। কেউই এগিয়ে আসেন না মধ্যস্থতায়। যাত্রী এবং কন্ডাক্টরের বচসা নিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙেনি। আদৌ ভাঙবে এমন আশাও হয়তো কেউ করেন না। মাঝ থেকে কাগজ-কালির অপচয়। সেই অপচয়ের রেশ ধরেই আবারও পুরোনো কথাগুলো বলার চেষ্টা, কারণ মানুষ আশাবাদী। মানুষ স্বপ্ন দেখে সুদিন-সুসময়ের। স্বপ্ন দেখে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনের, যে জীবনে থাকবে নিয়ম-শৃঙ্খলা।
সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের কয়েকদফা মূল্য বাড়া-কমার পর, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) রাজধানীতে বড় বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে কিলোমিটার প্রতি ১ টাকা ৭০ পয়সা। সবার সম্মতিতেই নির্ধারিত হয় এ ভাড়া। এ ছাড়া গণপরিবহনের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা নির্ধারণ হলেও যাত্রীর থেকে আদায় হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি। ১ ফেব্রুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সে তথ্যই উঠে এসেছে। ভাড়া ৩ টাকা অথচ আদায় ৩০ টাকা শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, গুলশান-২ থেকে নতুনবাজার বাসস্ট্যান্ড এবং গুলশান-১ থেকে পুলিশ প্লাজা পর্যন্ত সড়কের দূরত্ব ১ দশমিক ৪ কিলোমিটার। হিসাব অনুযায়ী ভাড়া আসে ৩ টাকা ২৯ পয়সা, অথচ নেওয়া হয় ২৫ টাকা। আইনের ফাঁক গলে এই যে ‘গলাকাটা’ ভাড়া আদায়, এ দৃশ্য রাজধানীর সব রুটেই।
সম্প্রতি ভাড়া নৈরাজ্যরোধে ই-টিকিটিং চালু হয়েছে। কিন্তু সেখানেও শুভঙ্করের ফাঁকি। দু-একটি বাড়তি উদাহরণ দেই। মিরপুর-২ থেকে যমুনা ফিউচার পার্কের গেট পর্যন্ত আদায় হয় ৩০ টাকা। একই ভাড়া নেওয়া হয় মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ এবং পল্লবী থেকেও। আবার মিরপুর-১২ থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত যে ভাড়া, একই ভাড়া আদায় হয় মিরপুর-১১ এবং মিরপুর-১০ থেকেও। শ্যামলী হয়ে এয়ারপোর্টগামী পরিবহনে শ্যামলী বা আগারগাঁও যেখান থেকেই যাত্রী উঠুন এবং কুর্মিটোলা, শ্যাওড়া, কুড়িল বিশ্বরোড, খিলক্ষেত যেখানেই নামুনÑ ভাড়া ৪০ টাকা; যা নির্ধারিত রয়েছে শ্যামলী থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত দূরত্বের জন্য। একইভাবে রাজধানীর নাবিস্কো বাসস্ট্যান্ড থেকে কড়াইলের দূরত্ব সাড়ে চার কিলোমিটার হলেও আদায় হয় ২০ টাকা।
সড়কে এই যে বাড়তি ভাড়া আদায়, এ অন্যায় রোধে আইন রয়েছে। সড়ক পরিবহন আইনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের শাস্তি এক মাস কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান। এর মানে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় আইনের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাহলে চোখের সামনে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলেও কেন আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই? কেন অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেই? এভাবে অনিয়ম জিইয়ে রেখে কাকে সুবিধা দেওয়া হয়? আক্ষরিক অর্থেই সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। গণপরিবহনের নৈরাজ্য বন্ধে কার্যকর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এমন খবর কিন্তু সংবাদমাধ্যমে নেই। উল্টো সব দোষ নন্দ ঘোষের মতো সব দোষ যে যাত্রীদেরই ওপরই চাপানো হয়। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ একই প্রতিবেদনে এইচআর ট্রান্সপোর্টের প্রজেক্ট ইনচার্জ নজরুল ইসলাম প্রতিবেদককে বলেছেন, ‘দূরত্ব অনুযায়ী কম ভাড়া নির্ধারণ করলে অনেক সময় যাত্রীরা ফাঁকি দেন। তাই বেশিরভাগ কাউন্টারেই কাছাকাছি দামের টিকিট রেখেছি।’
বাসভাড়া নিয়ে নৈরাজ্যরোধে আইন আছে; কিন্তু এর প্রয়োগ নেই। কেন? এই যে প্রতিদিন যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে, এই যে মাঝপথের টিকিট না রেখে, যাত্রীকে অতিরিক্ত পথের ভাড়া গুনতে বাধ্য করা, এ কি অন্যায় নয়? অভিযোগগুলো তো প্রায়ই পত্রপত্রিকার পাতায় স্থান পেলেও আমাদের কর্তাব্যক্তিদের নজর এড়িয়ে যায়। আর তাই হয়তো বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি) প্রতিদিনের বাংলোদেশ-এর প্রতিবেদককে বলেছেন, ‘আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। এখনও এ-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। এলাকাবাসী কেউ যুক্তিসংগত অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ আমাদের প্রশ্ন, যাত্রী বা এলাকাবাসীকে কেন অভিযোগ করতে হবে? বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে যে অভিযোগ দাখিলের কথা বলা হচ্ছে, আমাদের সবিনয় জিজ্ঞাসা, যাত্রী এক্ষেত্রে কোথায় অভিযোগ করবেন? তার কি কোনো নির্দেশনা বাসের ভেতরে টানিয়ে রাখা হয়? বা কখনও এ নিয়ে গণমাধ্যমে কোনো বিজ্ঞাপন এসেছে? বিআরটিএর মনিটরিং ব্যবস্থা কি স্বপ্রণোদিত হয়ে দায়িত্ব পালনে অক্ষম? তাদের দায়িত্ব কি শুধু নির্দেশনাতেই সীমাবদ্ধ? তারা কি শুধু সড়ক পরিবহন আইনের ৩৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণ করেই দায়িত্ব শেষ করবেন? তাহলে যাত্রীর দিকটি কে দেখবেন? এ দায়িত্ব তো সরকারের।
সরকার দায়িত্ব দিয়েছে নির্ধারিত সংস্থাকে। সেই সংস্থা যদি দায়িত্ব এড়িয়ে যায়, তা দেখার দায়িত্ব কার? দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাটি কি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন? তারা কি নিজেদের কাজের প্রতি নিবেদিত? এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই সমস্যা সমাধানের বিষয়টি নিহিত। ভাড়া নিয়ে সাধারণের ক্ষোভ থাকলেও মানুষ যেহেতু একাট্টা নয়, তাই বিক্ষোভ নেই। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোও নানান ইস্যুতে কর্মসূচি দিলেও এ বিষয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকাই পালন করেন। সাধারণ মানুষ ভাড়া কমানোর পক্ষে আর বাসমালিকরা বাড়ানোর পক্ষে। আমরা চাই এই কমানো-বাড়ানোর যুক্তিতর্কের বাইরে এসে সঠিক ভাড়া আদায় হোক, আইনের প্রয়োগ হোক। সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও অধিকারের বিষয়ে সচেতন হতে হবে। অন্যথায় যতই অভিযোগ বাক্স খুলে রাখা হোক, সেখানে অভিযোগ জমা পড়বে না। তা জমা হতে থাকবে মনের বাক্সে, জমা হতে থাকবে ক্ষোভের বাক্সে। গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য থামতে হবে। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রয়োজন আইনানুগ পদক্ষেপ।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক