× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মেধাবীদের কর্মসংস্থান রোধ করতে পারে মেধা পাচার

শেখ ইউসুফ হারুন

প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৩ ০০:৩৩ এএম

অলঙ্করন : প্রবা

অলঙ্করন : প্রবা

‘ব্রেইন ড্রেন বা মেধা পাচার’ বলতে উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশ থেকে দক্ষ ও প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তিদের উন্নত দেশে দেশত্যাগ বা স্থানান্তরকে বুঝানো হয়ে থাকে। ‘ব্রেইন ড্রেনশব্দটি ১৯৬০ সালে প্রথম ব্রিটেনে ব্যবহৃত হয়েছিল যখন উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলো থেকে উন্নত দেশগুলোতে (প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতে) দক্ষ কর্মিবাহিনীর অভিবাসন শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশ থেকেও ষাটের দশকে প্রচুরসংখ্যক দক্ষ ও প্রতিভাবান বাংলাদেশি ইউরোপ ও আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন, তারা কেউ আর দেশে ফিরে আসেননি। দেশে ফিরে না আসার অনেক কারণ রয়েছে তবে মুখ্য কারণগুলো হলোদেশে দক্ষ ও বিশেষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের অভাব, বিদেশে উন্নত জীবনযাপনের হাতছানি ও নিরাপত্তা আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এরা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গেলে তো বাংলাদেশেরই লাভ তাতে জনসংখ্যা যেমন কমে যায়; অন্যদিকে তারা বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সবল করে তোলেন এটি আসলে পুরা সত্য নয়, আধা সত্য বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশে পড়ালেখা করতে যান, তাদের বেশিরভাগ অংশ সেখানে নাগরিকত্ব বারেসিডেন্স পারমিটপাওয়ার চেষ্টা করেন একবার নাগরিকত্ব বা অবস্থানের সুযোগ পেলে ওই দেশে বা তৃতীয় কোনো দেশে স্থায়ীভাবে থেকে যায় এরপর পরিবারের সদস্যদেরও ওই দেশে নেওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা করেন সফল হলে দেশে আর টাকা পাঠানোর প্রয়োজন হয় না

মধ্যপ্রাচ্য বা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা অবৈধভাবে ইউরোপের কোনো কোনো দেশে গমন করেন, তারাই প্রকৃত অর্থে রেমিট্যান্স যোদ্ধা পরিবার নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে তারা দেশে রেমিট্যান্সপ্রেরণ করেন তাদের পাঠানো অর্থেই আমাদের অর্থনীতি সবল হয় অথচ তাদের জন্য সরকারের বিনিয়োগ খুবই কম দুবাই থেকে ঢাকা আসার সময় দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত রেমিট্যান্সযোদ্ধারা তাদেরইমবারকেশন ফরমটি পূরণ করতে পারছেন না ফ্লাইটের মধ্যে বিভিন্ন যাত্রীর কাছে ছোটাছুটি করেন আমি তো একবার ১০ জনের ফরম পূরণ করে দিয়েছিলাম হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়েরপ্রবাসীকল্যাণ ডেস্কইমিগ্রেশনের বাইরে ভিতরে থাকলে অন্তত এসব রেমিট্যান্সযোদ্ধাদেরইমবারকেশন ফরমটি পূরণ করে কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করা যেত

সত্তরের দশকের শেষে আমরা যখন এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি তখন শিক্ষা বোর্ডগুলো বিভাগভিত্তিক মেধাতালিকায় সর্বোচ্চ স্থান পাওয়া ২০ জন শিক্ষার্থীর ফলাফল আলাদাভাবে প্রকাশ করত তাদের স্টান্ডকরা ছাত্র বলা হতো তারা ভালো ছাত্র হিসেবে সবার সমাদর পেতেন আমরাও তাদের বেশ সমীহ করতাম কারণ তারা তো বোর্ড কর্তৃক স্বীকৃত ভালো ছাত্র স্টান্ডকরা ছাত্রদের নিয়ে বিভিন্ন দৈনিকে সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হতো কত ঘণ্টা পড়ালেখা করেছেন, কে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, ভবিষ্যতে কী হতে চান ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তাদের প্রশ্ন করা হতো সঙ্গে পত্রিকায় তাদের মা-বাবার ছবিও প্রকাশিত হতো সাক্ষাৎকারে কেউ কেউ ভবিষ্যতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক বা চ্যাটার্ড অ্যাকাউনটেন্ট হওয়ার আশা প্রকাশ করতেন একটি প্রশ্নে সবাই একই রকম উত্তর দিতেন সেটি হলো, দেশের জন্য তারা কী করতে চান? সবাই বলতেন, ভবিষ্যতে তারা দেশের মানুষের সেবায় কাজ করতে চান আমরাও সেগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়তাম তাদের সাক্ষাৎকার পড়ে অন্যরাও উৎসাহিত হতেন উচ্চ মাধ্যমিকের পরে স্টান্ডকরা ছাত্ররা দেশের ভালো ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে বুয়েট, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মেডিকেল কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতেন এরপর সেখান থেকে নীরবে-নিভৃতে পাস করে জীবিকার অন্বেষণে কে কোথায় চলে যেত তার খবর কেউ রাখেননি এমনকি দেশের প্রতি দেওয়া তাদের সেই অঙ্গীকার কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন বা পারেননি, সে খবরও কেউ রাখেননি তথাকথিতস্টান্ডকরা এসব ছাত্র দেশ ও জনগণের প্রতি কতটুকু অবদান রাখতে পেরেছেন, সে সম্পর্কে দেশে কোনো গবেষণা পরিচালিত হয়েছে বলে শোনা যায়নি

 

বর্তমানে গ্রেডিং সিস্টেম চালু হওয়ায় বোর্ড হতে কেউ স্টান্ডনা করলেও হাজার-হাজার শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ প্রাপ্ত হয়ে থাকেন ২০২১ সালের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) সমমান পরীক্ষায় জিপিএ- পেয়েছে লাখ ৮৯ হাজার ১৬৯ জন ধরে নেওয়া যায়, এরাই সময়ের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থী স্টান্ডকরা ছাত্রদের মতো তারাও একদিন পাস করে নীরবে-নিভৃতে জীবিকার অন্বেষণে কে কোথায় চলে যাবেন, তার খবর আর কেউ রাখবেন না এ কথা নিশ্চিত বলা যায়, তাদের বিপুলসংখ্যক বিদেশে পড়ালেখা, চাকরি বা উন্নত জীবনের নেশায় দেশত্যাগ করবে ইউনেস্কোর এক প্রতিবেদনে হতে দেখা যায় প্রতিবছর ৭০ থেকে ৯০ হাজার শিক্ষার্থী প্রতিবছর বাংলাদেশে থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গমন করেন

যেসব শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ প্রাপ্ত হন তারা সাধারণত মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে থাকেন ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী আমাদের দেশে মোট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা যথাক্রমে ৫৩টি, ১০৯টি ও ০৩টি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিভুক্ত কলেজ, মাদ্রাসাগুলো বাদে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মোট শিক্ষার্থী লাখ ১৪ হাজার ৯৩০ জন মাদ্রাসাসহ মিলিয়ে উচ্চশিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী আছেন ৪৩ লাখ ৬২ হাজার ১৮৭ জন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৪ লক্ষাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ পরিচালনার জন্য সরকারি অনুদান দিতে না হলেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ পরিচালনার জন্য সরকার প্রচুর ভর্তুকি প্রদান করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতি, অবস্থান, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, সরকারের আস্থা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এ ভর্তুকির পরিমাণ নির্ভর করে ইউজিসির ২০২০ সালের তথ্যানুযায়ী শিক্ষার্থী প্রতি বার্ষিক সর্বোচ্চ ব্যয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটিতে ৭.৫২ লাখ টাকা এবং সর্বনিম্ন ব্যয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ১,১৫১.০০ টাকা কৃষি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীপ্রতি বার্ষিক ব্যয় তুলনামূলকভাবে একটু বেশি হলেও সাধারণ বিশ্বদ্যিালয়ে এ ব্যয় অনেক কম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ব্যয় তো নগণ্য বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক জরিপে উঠে এসেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ৬৬% শিক্ষার্থী বেকার থাকছে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, শিক্ষায় বিনিয়োগের সঙ্গে কর্মসংস্থানের একটি সম্পর্ক রয়েছে

বিদেশে পড়তে যাওয়ার সেকাল ও একাল পর্যালোচনায় দেখা যায়, আমাদের সময়ে স্টান্ডকরা বা স্টারপাওয়া শিক্ষার্থীরা আন্ডারগ্রাজুয়েশনকরার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার তেমন সুযোগ পেতেন না তখন দেশে এত কোটিপতি ছিলেন না যে তারা ছেলেমেয়েদের বিদেশে পড়াতে পারেন এখন কোটিপতির সংখ্যা এত বৃদ্ধি পেয়েছে যে, ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় ছেলেমেয়ে পড়ানো যেন মাছ-ভাত সে সময় ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এখনকার মতো ব্যবসায়িক মনোবৃত্তিও ছিল না এখন তো ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় ব্যাঙের ছাতার মতো বিশ্ববিদ্যালয় গজিয়ে উঠেছেÑ যেখানে পড়ালেখার মান অতি নিম্ন এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকা হলেই ছেলেমেয়েদের পড়ানো যায় ছেলেমেয়েকে বিদেশে পড়ানো এখন সামাজিক স্টাটাসের পর্যায়ে চলে গিয়েছে এখন অনেক মা-বাবা উঁচু গলায় বলতে ভালোবাসেন তার ছেলে বা মেয়ে অমুক দেশে অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে! ইউরোপ-আমেরিকার এসব মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি পড়ালেখা করেন উপমহাদেশ হতে আগত ছেলেমেয়েরা ব্রিটেনের ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক আস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় পর বলেছিলেন, ব্রিটেনে মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বন্ধ করে দেওয়া হবে এখন আর তিনি সে কথা বলছেন না কারণ এসব বিশ্ববিদ্যালয় হতে ব্রিটেনের এক্সচেকারে প্রচুর পরিমাণ পাউন্ড স্ট্রার্লিং জমা হয়ে থাকে

দেশ থেকে প্রচুরসংখ্যক মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষার্থী বিদেশে চলে যাওয়া দেশের জন্য বিরাট ক্ষতি শিক্ষায় বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করে এর সুফল পাচ্ছে না বাংলাদেশ আমরা তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছি না অথচ প্রায় ২.৫ লাখ বিদেশি কর্মী এ দেশে কাজ করছে আমাদের কষ্টার্জিত বৈদিশিক মুদ্রার এক বিরাট অংশ বাইরে চলে যাচ্ছে ১০ বছর আগে কারিগরি শিক্ষার হার ছিল শতাংশের মতো এখন কারিগরি শিক্ষার হার প্রায় ১৬ শতাংশ ২০৩০ সালে হার ৩০ শতাংশে আনায়নের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে কিন্তু বর্ধিত কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে শিল্পায়ন হচ্ছে না শিল্পায়ন যদি না হয়, তবে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে না, বেকারত্বের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়ে যাবে দক্ষ ও মেধাবীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করতে পারলে মেধা পাচার বন্ধ না হয়ে বরং বৃদ্ধি পাবে


 লেখক সিনিয়র সচিব ও নির্বাহী চেয়ারম্যানবাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষপ্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা