প্রেক্ষাপট
সাজিদ হাসান
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৩ ০০:৪৭ এএম
অলঙ্করন : প্রবা
প্রচ্ছদের গায়ে মনকাড়া এক
নামলিপি। দুই মলাটের মাঝে ফর্মা
ফর্মা
অক্ষরের স্তূপ। ব্যস, হয়ে গেল একখানা বই। এবার বাজারে নেওয়ার পালা।
সে জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা
চালানো হয়। অনেক সময় লেখক নিজেও অংশ নেন। দরজায় কড়া নাড়ছে অমর
একুশে বইমেলা। বইপ্রেমীদের চোখ নিবদ্ধ থাকে ওই আয়োজনের দিকে। নানা বয়সের মানুষ
ছাড়াও আয়োজনে শামিল হন স্বয়ং লেখকরা। ওই
আয়োজনকে উপলক্ষ করে প্রকাশকরা তাদের পরিকল্পনা সাজিয়ে থাকেন। এমন হওয়াই স্বাভাবিক।
তবে একটা বই ছাপানোর আগে প্রকাশকদের যে কয়েকটি প্রধান দায়িত্ব থাকে, তা
পালন করায় তাদের অনেকেরই লক্ষ্য করা যায় অনীহা। কোন দায়িত্বের কথা বলা হচ্ছে?
প্রথম, বইয়ের বিষয়বস্তু নির্ধারণ। যে লেখকের পাণ্ডুলিপি তিনি ছাপাখানায় পাঠাবেন, তার বিষয়বস্তু একবার যাচাই করা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ক্ষেত্রবিশেষে প্রকাশকদের অনেকেই এই বিষয়ে উদাসীন। তারা যাচাই করেন পাণ্ডুলিপি জমা কে দিচ্ছেন। লেখকের সামাজিক অবস্থান অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ভক্তসংখ্যা দেখে প্রকাশের জন্য বই বেছে নেওয়া মোটেও ঠিক নয়। আবার দেখা গেল, পাণ্ডুলিপি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি প্রকাশক করেননি। কিন্তু বাছাই করার পর সম্পাদনার বিষয়টিও তো থেকে যায়। লেখার বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্য ঠিকঠাক রাখাও একটা বড় বিষয়, তা হোক উপন্যাস কিংবা প্রবন্ধ। সঙ্গে আছে, প্রুফ দেখা। বাংলা ভাষা যতটা শ্রুতিমধুর, এর বানানরীতি রপ্ত করা ততটাই কষ্টসাধ্য। নির্ভুল বানানে দুটো পৃষ্ঠাজুড়ে বাংলা লিখে ফেলা অত সোজা নয়। বই ছাপানোর আগে এই বানানগুলোকে, বাংলা একাডেমির প্রণীত বানানরীতি অনুসারে শুদ্ধ করাটাও অত্যন্ত জরুরি। এ কথা সত্য—দেশে অনেক পাঠক আছেন, যারা বাংলা একাডেমির বানানরীতি খুঁজতে যান না, ছাপার অক্ষরে পাওয়া যেকোনো মাধ্যমে দেখা বানানকেই তারা আদর্শ হিসেবে ধরে নেন। তাই বানানে সতর্কতা বই ছাপানোর ক্ষেত্রে একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। আবার যারা বানান সম্পর্কে সচেতন, তারা মুদ্রণে এত ভুল দেখে বিরক্ত হয়ে যান। তখন পড়ার আগ্রহ আর ধরে রাখতে পারেন না। এ জন্য একজন দক্ষ সম্পাদনা সহকারী নির্বাচন করা জরুরি। অথচ কিছু উদাসীন প্রকাশক এসব কিছুরই ধার ধারেন না।
ক’দিন আগে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত একখানা বই হাতে
এসেছিল। পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলা বই। বইজুড়ে ‘য়’ এবং ‘ই’-এর
ব্যবহারে ব্যস্তানুপাতিক প্রতিযোগিতা। আবার দুই দিন ধরে ফেসবুকে একজন লেখকের বইয়ের
বিজ্ঞাপন চোখের সামনে এসে পড়ছে বারবার। প্রচ্ছদে ব্যবহৃত নামলিপিতেই বিরাট গলদ। ‘কী’-এর
জায়গায় ‘কি’ লেখা
হয়েছে। অথচ প্রুফ দেখার ক্ষেত্রে সামান্য গুরুত্ব দিলে এত ভুল হতো না। বানান ভুলের কারণে অনেক সময় পড়ার গতি যেমন কমে যায়, তেমনি
বইয়ের প্রতি আগ্রহও কমে যায়। আমাদের প্রকাশনা শিল্পে অনেক প্রকাশনীই ধুঁকে ধুঁকে
টিকে আছে। সে অন্য বিষয়। কিন্তু বই ছাপানোর ক্ষেত্রে প্রকাশনীর মনোযোগ কেমন হতে
পারে, তা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, বিশেষত
কলকাতার দিকে লক্ষ করলেই দেখা যাবে।
সে জন্য পাঠকসমাজের দিকে তাকিয়ে, প্রত্যেক
প্রকাশকের উচিতÑ
স্বীয় অবস্থান
থেকে প্রকাশনার কাজটি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া। একুশে বইমেলার লক্ষ্য কিন্তু শুধুই
পাঠকের হাতে বই পৌঁছে দেওয়াই নয়। বাংলা ভাষার শুদ্ধতা ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্বও বই
প্রকাশের সংশ্লিষ্ট সবার।
লেখক : চাকরিজীবী