তৌহিদুল হক
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৩ ০৬:৫৫ এএম
অলঙ্করন : প্রবা
মানুষ পরিবর্তন দেখতে চায়, পছন্দ করে। পরিবর্তিত জীবন পরিশুদ্ধ জীবন, এগিয়ে থাকার জীবন ও সার্থক জীবন। সময় পরিবর্তন, উন্নয়নযজ্ঞসহ মানুষের ভিত পুনর্নির্মাণ করে। যে বা যারা পরিবর্তনের কথা বলেন সেখানে সম্পর্কসূত্র সৃষ্টি করা মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা। করোনার অভিঘাত মানুষকে পৃথিবী সম্পর্কে নতুন ধারণার মধ্যে ফেলেছে। বাঁচার প্রেরণায় এগিয়ে থাকার প্রত্যয়ে পরস্পর সহযোগিতা-সহমর্মিতার মধ্য দিয়ে মানুষ অর্থবহ জীবনের অনুসন্ধান করছে। পক্ষান্তরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরম্পরা মানুষকে জীবনের পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হোঁচট খাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, চলতি বছর বৈশ্বিক আর্থিক প্রবৃদ্ধি ১.৭ শতাংশ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত লক্ষণীয়। ফলে শুরু হয়েছে মিতব্যয় নীতি বা নির্দিষ্ট সময়ে গৃহীত প্রকল্পের সমাপ্তকরণ এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে আর্থিক সাশ্রয়ী মনোভাব পোষণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়া এবং তা বহু পর্যায়ে উল্লিখিত হওয়ার উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। বাস্তবিক দৃশ্যে এটি মৌখিক পর্যায়ে বেশি আলোচিত উপজীব্য। সংবাদমাধ্যমের খবর বিশ্লেষণে লক্ষ করা যায়, প্রকল্পে দুর্নীতি বেড়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার গীত আরও দীর্ঘ হচ্ছে। কাল্পনিক কায়দায় খরচের সারণি কাউকে আর্থিকভাবে ভালো থাকার ব্যবস্থা করতে পারলেও দেশকে কতটা ভালো রাখতে পারছে? অতীতের বালিশকাণ্ড, কলার গুণাগুণ, পর্দার পর্দানশিনতাসহ অসংখ্য দুর্নীতির চিত্র উদাহরণ হিসেবে উপস্থিত করা যায়।
উন্নয়ন প্রকল্পে বিভিন্ন পণ্যের অতিরিক্ত দাম ধরে একটি প্রকল্প প্রস্তাবে একেকটি বালিশের দাম ২৭ হাজার টাকা ও বালিশ কাভারের দাম ২৮ হাজার টাকা ধরার কথা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। অন্য একটি প্রকল্পে একজন ক্লিনারের মাসিক বেতন ধরা হয়েছিল ৪ লাখ টাকা। আরেকটি প্রকল্পে একটি স্যালাইন স্ট্যান্ডের দাম ধরা হয়েছিল ৬০ হাজার টাকা। কৌশলে অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের বা সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লাভবান হওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। এসব দুর্নীতির পেছনের পরিপ্রেক্ষিত কার্যত যৌগিক যোগসূত্রের বন্ধনে আবদ্ধ। অর্থাৎ মিলেমিশে দুর্নীতির উপন্যাস রচনা এবং বাজারজাতকরণ। বাংলাদেশ বিশ্বের বেরে বাজারজাতকরণ ৩৫তম অর্থনীতির দেশ।
অর্থাৎ স্বাধীনতার একান্ন বছরোত্তর পর্যালোচনায় সাধারণ মানুষের অনুভূতি হলো- আমাদের আরও এগিয়ে থাকার কথা। কিন্তু যারা নীতিতে, নৈতিকতায়, বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখবেন তাদের মধ্য থেকে একটি অংশ অভিনব অনৈতিকতা অবলম্বন করে পয়সাকড়ি হাতিয়ে নিলে বা অপ্রয়োজনীয় খরচ বাড়ালে ভিন্ন সমীকরণ তৈরি হয়। বাংলাদেশে সমীকরণের গাঁথুনি অনেক গভীরে প্রোথিত বলে অনেকের বিশ্বাস। তা না হলে দুর্নীতির সমীকরণ নির্মূল করা যাচ্ছে না কেন?
দুর্নীতি আজ সংস্কৃতির পর্যায়ে উপনীত, এটি বলতে কষ্ট হলেও তো বাস্তবতা। সরকারের নীতি-নির্ধারকদের স্পষ্ট উচ্চারণ- দুর্নীতির খবর তথ্য-উপাত্তসহ প্রকাশ করলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুদ্ধি অভিযানের মতো প্রত্যাশিত বিষয় হঠাৎ জ্বলে উঠলে একটি ধাক্কা হয়তো লাগে তবে তার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে না। রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর স্থান থেকে সর্বসতর্ক হয়েও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পরিবেশ বা সংস্কৃতি রাষ্ট্রের সর্বত্র চর্চা করা সম্ভব হচ্ছে না। অর্থাৎ জনগণের মধ্যে যারা শিক্ষিত এবং উচ্চ পর্যায়ে আসীন, তাদের মধ্য থেকে একটি অংশ দুর্নীতিকে সহজ করে ফেলেছে। তারা জানে কীভাবে খেলতে হয়। ফলাফলও মুখস্থ। দুর্নীতির প্রভাব সে তো জীবনের বিনোদন!
'গ্লোবাল ভিলেজ' ধারণার সঙ্গে তাল রেখে বাংলাদেশ তার সব অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ সহজ ও নিশ্চিত করার গৃহীত প্রকল্পের বাস্তবায়নে ও উদ্বোধনে জনমনে প্রশান্তি ডেকে আনলেও প্রকাশিত দুর্নীতির চিত্র হতবাক করে। উন্নয়নে অনুন্নয়নের রেখা বেশি দীর্ঘায়িত বা পরিপুষ্ট হলে জনগণের মননে প্রশান্তির হাস্যরেখা ফোটে না। বরং বিষাদ ভর করে। প্রশ্ন জাগে, এসব প্রকল্পের টেকসইতু নিয়ে। এসব সড়ক, সেতু বা অবকাঠামোয় কতটা নিরাপদ থাকা যাবে? প্রশ্ন যখন অধিক হয় উত্তর তখন নিস্প্রয়োজন। কারণ চারপাশের দৃশ্য চলচ্চিত্রের মতো একের পর এক চোখের সামনে হাজির হয়। কখনও সাদাকালো, কখনও রঙিন। পার্থক্য শুধু এখানেই।
আশার কথা হলো, কিছু দুর্নীতির বিচার হয়েছে এবং হচ্ছে। রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর দূরদৃষ্টি ও কর্মদক্ষতা একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন, ন্যায্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেশকে এগিয়ে রাখে। এর সফল উদাহরণ আজকের বাংলাদেশ। তবে সিদ্ধান্ত বা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে কর্মরত ব্যক্তি কিংবা অর্থ বণ্টনের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের অনেকেরই অর্থের প্রতি চক্ষুচাহিদা নিয়ন্ত্রিত না। এর অর্থ হলো, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে একটি বড় অংশ নৈতিকতাকে নিজস্ব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে ফেলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সৃষ্টি করছে।
ফলে উন্নয়ন তার কাঙ্ক্ষিত মাত্রা ছুঁতে পারছে না। সময়ের প্রেক্ষাপটে উন্নয়নের প্রভাব জনগণের জীবনে সরাসরি সত্যায়িত না হলে নৈতিকতার প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ উন্নয়ন প্রকল্পে মানুষের অংশগ্রহণের মাত্রা কমে যায়। একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবনার প্রয়োজন, উন্নয়নে জনসম্পৃক্ততা না হলে তা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকাঠামো ও নিজস্বতা দাবিদারের সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে পারে না। বরং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির পর্যালোচনাসম সমালোচনায় বিশ্বাস ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। উন্নয়ন ও পরিবর্তনে নিজস্বতা একীভূতকরণের পর্যায়মানতা গড়ে ওঠে না। ফলে উন্নয়নকাঠামো ব্যবহারে নাগরিক দায়িত্ববোধের ঘাটতি বা অবহেলা লক্ষ করা যায়। আমাদের উন্নতিরেখায় বিদেশি অর্থায়ন কিংবা নিজস্ব অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণে প্রকল্পের ন্যায্যতা নিরূপণ ও উপযোগিতা যাচাইয়ে ন্যায়পালসম নৈতিক মানদণ্ডের প্রচলন জরুরি। দুর্নীতির বিচারে রাষ্ট্র নির্মোহ অবস্থান নিশ্চিত করবে জনগণের মঙ্গলার্থে। একটি উন্নত উন্নয়ন ভিত রচনার লক্ষ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধও প্রয়োজন।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়