× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রবাসী শক্তির জাগরণ: বাংলাদেশের জন্য কি সময় এসেছে ‘পুনরুত্থান বাংলাদেশ বন্ড’-এর?

কাজী জিয়া উদ্দিন

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৫ মিনিট আগে

কাজী জিয়া উদ্দিন। ফাইল ছবি

কাজী জিয়া উদ্দিন। ফাইল ছবি

কোনো রাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন উন্নয়নের প্রচলিত পথগুলো আর যথেষ্ট থাকে না। তখন নতুন সম্ভাবনার সন্ধান করতে হয়, নতুন আস্থার ভিত্তি গড়ে তুলতে হয় এবং নতুন অংশীদারিত্ব সৃষ্টি করতে হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অনেক জাতি সেই সন্ধিক্ষণে নিজেদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে আবিষ্কার করেছে দেশের সীমানার বাইরে ছড়িয়ে থাকা মানুষদের-প্রবাসী নাগরিকদের।

রাষ্ট্রের প্রকৃত সম্পদ সব সময় খনিজ, গ্যাস কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়। একটি জাতির সব চেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ; আর সেই মানুষ যদি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, পুঁজি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হন, তাহলে তারা শুধু রেমিট্যান্স প্রেরক নন, জাতীয় উন্নয়নের কৌশলগত অংশীদারও।

বাংলাদেশ আজ এমনই এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে আরও শক্তিশালী করা, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন নিশ্চিত করা, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু অভিযোজন এবং শিল্পায়নের জন্য বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন। একই সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতা নতুন অর্থায়নের উৎস খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক-বাংলাদেশ কি বিশ্বের সফল অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে একটি ‘পুনরুত্থান বাংলাদেশ বন্ড’ চালু করতে পারে?

এই ধারণা নতুন নয়। ১৯৯৮ সালে পারমাণবিক পরীক্ষার পর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর তীব্র চাপের মুখে ভারত বিদেশে বসবাসরত ভারতীয়দের জন্য চালু করে ‘পুনরুত্থান ভারত বন্ড’। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেশটি প্রায় ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউএস ডলার সংগ্রহ করে। পরে ‘ভারত সহস্রাব্দ আমানত’ কর্মসূচির মাধ্যমেও কয়েক বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হয়। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, আস্থা সৃষ্টি করা গেলে প্রবাসীরা দেশের অর্থনৈতিক অভিযাত্রার নির্ভরযোগ্য অংশীদার হয়ে উঠতে পারেন।

চীনের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন হলেও সমান শিক্ষণীয়। তারা আনুষ্ঠানিক প্রবাসী বন্ড চালু না করলেও বিদেশে অবস্থানরত চীনা উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য এমন পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল, যাতে তারা দেশের শিল্পায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। দেং শিয়াওপিংয়ের বাস্তববাদী নেতৃত্ব চীনকে দেখিয়েছিল-আদর্শের চেয়ে ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ; আর উন্নয়নের জন্য দেশের বাইরের মানুষও দেশের সম্পদ।

আয়ারল্যান্ড তার বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কূটনীতি, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত করে একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। দক্ষিণ কোরিয়া বিদেশে অবস্থানরত গবেষক, প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তাদের জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ করেছে। সিঙ্গাপুর আবার প্রমাণ করেছে, প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব কোনো দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে না; সুশাসন, দক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং মানবসম্পদই পারে একটি রাষ্ট্রকে বৈশ্বিক অর্থনীতির শীর্ষ সারিতে নিয়ে যেতে।

এই উদাহরণগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন সূত্র রয়েছে-রাষ্ট্র তার মানুষের ওপর আস্থা রেখেছে, আর মানুষও রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রেখেছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ভিন্ন নয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি বসবাস করছেন। তারা প্রতিবছর ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ইউএস ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠান, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখা, আমদানি ব্যয় নির্বাহ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে এই অবদান অনস্বীকার্য।

কিন্তু রেমিট্যান্সের একটি স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর অধিকাংশই পারিবারিক ব্যয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা আবাসন নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। ব্যক্তি ও সমাজের জন্য এটি অত্যন্ত ইতিবাচক হলেও জাতীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্পে এই অর্থ সরাসরি যুক্ত হয় না। সেখানেই একটি প্রবাসী বন্ডের গুরুত্ব।

যদি প্রবাসীদের সঞ্চয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন তহবিলে যুক্ত করা যায়, তাহলে বন্দর, রেলপথ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পানি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি পার্ক, স্বাস্থ্যসেবা, উচ্চশিক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোর মতো খাতে একটি শক্তিশালী অর্থায়নের উৎস সৃষ্টি হতে পারে।

তবে এ ধরনের উদ্যোগের সফলতা কোনোভাবেই শুধু উচ্চ মুনাফার ওপর নির্ভর করবে না। এর ভিত্তি হবে বিশ্বাসযোগ্যতা। একটি আধুনিক ‘পুনরুত্থান বাংলাদেশ বন্ড’-এর নকশায় অন্তত কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। প্রথমত, এটি কেবল প্রবাসী বাংলাদেশি ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের জন্য উন্মুক্ত হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ডলার, ইউরো, পাউন্ড, ইয়েন কিংবা দিরহামের মতো আন্তর্জাতিক মুদ্রায় বিনিয়োগের সুযোগ থাকতে হবে।

তৃতীয়ত, সম্পূর্ণ ডিজিটাল নিবন্ধন, অর্থ প্রদান এবং মুনাফা গ্রহণের ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে সহজেই বিনিয়োগ করা যায়।

চতুর্থত, অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে তার প্রকল্পভিত্তিক তথ্য, আন্তর্জাতিক মানের নিরীক্ষা, নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন এবং স্বাধীন তদারকির ব্যবস্থা থাকতে হবে।

পঞ্চমত, সরকারের সার্বভৌম গ্যারান্টির পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রকৃতপক্ষে, প্রবাসী বন্ডের মূলধন অর্থ নয়; আস্থা। ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ পিটার ড্রাকার যথার্থই বলেছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সর্বোচ্চ সম্পদ মানুষ। আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তার ‘আস্থা’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে সামাজিক আস্থা একটি মৌলিক শক্তি হিসেবে কাজ করে। মানুষ তখনই বিনিয়োগ করে, যখন তারা বিশ্বাস করে যে তাদের অর্থ সুশাসন, সততা এবং জবাবদিহির মাধ্যমে পরিচালিত হবে।

এই প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অর্থমন্ত্রী আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের অর্থনৈতিক দর্শনও স্মরণীয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র বিপুল ঋণের ভারে ন্যুব্জ ছিল। কিন্তু তিনি সেই ঋণকে দুর্বলতা হিসেবে দেখেননি; বরং সুশৃঙ্খল ঋণ ব্যবস্থাপনাকে জাতীয় বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। 

তার মতে, নিয়ন্ত্রিত ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রঋণ একটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা নিহিত।

প্রবাসীরা দেশের প্রতি আবেগ থেকে বিনিয়োগ করবেন-এটি সত্য। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তারা বিনিয়োগ করবেন কেবল তখনই, যখন রাষ্ট্র তাদের সেই আস্থার মর্যাদা দেবে। তাই একটি সফল প্রবাসী বন্ডের পূর্বশর্ত হলো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, নীতির ধারাবাহিকতা, স্বাধীন নিরীক্ষা, তথ্যের উন্মুক্ততা এবং আইনের শাসন।

এ ধরনের উদ্যোগের সুফল শুধু বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি রাষ্ট্র ও প্রবাসীদের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। উন্নয়নে অংশীদারিত্বের নতুন সংস্কৃতি তৈরি করবে। আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতিরও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

বিশ্বের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি স্পষ্ট শিক্ষা দেয়-যে রাষ্ট্র তার প্রবাসীদের কেবল রেমিট্যান্স প্রেরক হিসেবে দেখে, সে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে। আর যে রাষ্ট্র তাদের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, সে ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করে।

বাংলাদেশের সামনে আজ সেই সুযোগ উপস্থিত। যদি সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দূরদর্শী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ‘পুনরুত্থান বাংলাদেশ বন্ড’ চালু করা যায়, তবে এটি কেবল একটি আর্থিক উপকরণ হবে না। এটি হবে রাষ্ট্র ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে আস্থা, অংশীদারিত্ব এবং জাতীয় পুনর্জাগরণের এক নতুন সামাজিক চুক্তি।

ইতিহাসে অনেক উন্নয়নের গল্প শুরু হয়েছে মানুষের শক্তিকে সংগঠিত করার মাধ্যমে। বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক অভিযাত্রার ইতিহাসও হয়তো একদিন লেখা হবে সেই দিনটির কথা স্মরণ করে, যেদিন রাষ্ট্র উপলব্ধি করেছিল-তার সবচেয়ে বড় সম্পদ কেবল ভূখণ্ডের ভেতরে নয়, বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তার মানুষের হৃদয়ে, শ্রমে, মেধায় এবং বিশ্বাসে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা