মতিলাল দেব রায়
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশে প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। চিকিৎসা সুবিধার উন্নয়ন, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ফলে দেশের একটি বড় অংশ এখন সিনিয়র সিটিজেন বা প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সুস্থতা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের প্রশ্নে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এ প্রেক্ষাপটে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য গড়ে ওঠা সংগঠনগুলোর গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত পারিবারিক কাঠামো একসময় প্রবীণদের জন্য ছিল সবচেয়ে বড় নিরাপত্তার জায়গা। যৌথ পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠরা ছিলেন সম্মান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের পরিবর্তন এবং পারিবারিক কাঠামোর রূপান্তরের ফলে অনেক প্রবীণ আজ একাকিত্ব, অবহেলা এবং অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। সন্তানরা কর্মসূত্রে দেশের বাইরে বা অন্য শহরে অবস্থান করায় অনেক প্রবীণকে জীবনের শেষ অধ্যায়ে নিঃসঙ্গ সময় কাটাতে হচ্ছে।
আসলে মানুষের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও সংগ্রামী পথচলার নাম যৌবন নয়, বার্ধক্য। কারণ যৌবনে মানুষ স্বপ্ন দেখে, সংগ্রাম করে, সৃষ্টি করে; আর বার্ধক্যে এসে সে ফিরে তাকায় জীবনের দিকে। দেখে কত সুখ-দুঃখ, কত অর্জন-বিয়োগ, কত হাসি-কান্না মিশে আছে তার জীবনের পাতায়। কিন্তু বড় বেদনার বিষয় হলো, যে মানুষটি একদিন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন, সেই মানুষটিই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অনেক সময় হয়ে পড়েন অবহেলিত, একাকী এবং উপেক্ষিত। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলেছে। অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের নানা সূচকে দেশ প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এই উন্নয়নের আলো কি সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে আমাদের প্রবীণ নাগরিকদের কাছে? যে মানুষগুলো স্বাধীনতা সংগ্রাম, রাষ্ট্রগঠন, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা কিংবা প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখে আজকের বাংলাদেশ নির্মাণ করেছেন, তাদের জীবনের শেষ অধ্যায় কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও আনন্দময়Ñ এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের কারণে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে পরিবর্তিত পারিবারিক কাঠামো, নগরায়ণ, কর্মব্যস্ততা এবং বিদেশমুখী জীবনযাত্রা প্রবীণদের জীবনকে আরও জটিল করে তুলেছে। একসময় যে যৌথ পরিবার ছিল প্রবীণদের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়, তা এখন অনেকটাই অতীত।
আজ অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন, বিদেশে পাঠিয়েছেন। কিন্তু বয়সের ভারে যখন তাদের হাত কাঁপে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, হাঁটার শক্তি কমে যায় তখন অনেকেই পাশে কাউকে পান না। শহরের কোনো ফ্ল্যাটের নিঃশব্দ কক্ষে কিংবা গ্রামের কোনো নির্জন বাড়িতে তারা অপেক্ষা করেন একটি ফোনকলের জন্য, একটি খোঁজ নেওয়ার জন্য, একটি ভালোবাসার স্পর্শের জন্য।
প্রবীণদের এই নীরব কষ্ট শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি মানসিক ও সামাজিক সংকটও বটে। অনেক প্রবীণই আজ একাকিত্ব, হতাশা এবং আত্মমর্যাদাহানির শিকার। তাদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে কাজে লাগানোর সুযোগ কমে যাচ্ছে। সমাজে তাদের প্রয়োজনীয়তা যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সবচেয়ে বড় ধারক-বাহক হচ্ছেন এই প্রবীণ মানুষগুলো। এমন বাস্তবতায় সিনিয়র সিটিজেনদের নিজস্ব ফোরাম জাতীয় সংগঠনের গুরুত্ব অপরিসীম। যা শুধু একটি সংগঠন নয়; এটি প্রবীণদের জন্য একটি আশ্রয়, একটি পরিবার, একটি আত্মিক বন্ধন। যেখানে একজন প্রবীণ অনুভব করতে পারেন যে তিনি একা নন, তার কথা শোনার মানুষ আছে, তার অভিজ্ঞতার মূল্য আছে, তার জীবনের গল্পের গুরুত্ব আছে। আমি মনে করি, সিনিয়র সিটিজেন ফোরাম প্রবীণদের সামাজিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করতে পারে, তাদের স্বাস্থ্যসচেতনতা গড়ে তুলতে পারে, সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, এটি প্রবীণদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারে। কারণ, মানুষ শুধু খাদ্য বা চিকিৎসার জন্য বাঁচে না; সে বাঁচে সম্মান, ভালোবাসা ও স্বীকৃতির জন্য।
বাংলাদেশে প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে সিনিয়র সিটিজেন ঐক্য একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হতে পারে। এর মাধ্যমে প্রবীণদের অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আইনগত সুরক্ষার বিষয়গুলো আরও জোরালোভাবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরা সম্ভব। প্রবীণদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, অবসরপ্রাপ্তদের দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ এবং প্রবীণবান্ধব অবকাঠামো তৈরির দাবিতে এসব সংগঠন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
মনে রাখতে হবে, বার্ধক্য কোনো অভিশাপ নয়; এটি জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি। আজ যারা তরুণ, একদিন তারাও প্রবীণ হবে। আজ আমরা যে সমাজ গড়ে তুলছি, কাল সেই সমাজেই আমাদের বার্ধক্য কাটাতে হবে। তাই প্রবীণদের সমস্যা শুধু একটি নির্দিষ্ট বয়সের মানুষের সমস্যা নয়; এটি পুরো সমাজের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ব পালনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পারিবারিক মূল্যবোধ সব সময় বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করতে শিখিয়েছে। বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব, প্রবীণ আত্মীয়-স্বজনের প্রতি যত্ন এবং সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাÑ এসবই আমাদের মানবিকতার পরিচয়। কিন্তু আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা অনেক সময় সেই মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।
আমি মনে করি, যেকোনো দেশের উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন প্রবীণরা নিজেদের নিরাপদ, সম্মানিত ও ভালোবাসার পরিবেশে দেখতে পাবেন। যখন কোনো বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিঃসঙ্গতায় কাঁদতে হবে না, যখন তাদের চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত হবে, তখনই আমরা সত্যিকারের মানবিক সমাজ গঠনের দাবি করতে পারব। কারণ, প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন; তারা আমাদের শিকড়, আমাদের ইতিহাস, আমাদের অভিজ্ঞতার ভান্ডার। তাদের হাসি, তাদের আশীর্বাদ, তাদের জীবনের শিক্ষা একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ।
অবশ্য বাংলাদেশ সরকার বয়স্ক ভাতা, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রবীণদের সহায়তায় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণে এসব উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করা প্রয়োজন। প্রবীণবান্ধব নগর পরিকল্পনা, জেরিয়াট্রিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি করা সময়ের দাবি।
আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে বার্ধক্য মানে একাকিত্ব নয়, অবহেলা নয়; বরং সম্মান, নিরাপত্তা এবং ভালোবাসার নিশ্চয়তা। যেখানে প্রতিটি প্রবীণ মানুষ গর্ব করে বলতে পারবেনÑ ‘আমি এই দেশের জন্য কাজ করেছি, আর এই দেশ আমাকে ভুলে যায়নি।’ এটাই হোক আমাদের মানবিক অঙ্গীকার, এটাই হোক উন্নত বাংলাদেশের প্রকৃত পরিচয়। পরিশেষে বলব, একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গঠনের জন্য প্রবীণ নাগরিকদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
লেখক: মতিলাল দেব রায় (কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক)