× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তিচুক্তি

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় যুদ্ধের অভিঘাত আর কোনো নির্দিষ্ট সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

মধ্যপ্রাচ্যে একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের প্রভাব যেমন ইউরোপের জ্বালানি বাজারে পড়ে, তেমনি হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তার প্রভাব অনুভূত হয় বাংলাদেশের একজন রিকশাচালক, আফ্রিকান একজন কৃষক কিংবা লাতিন আমেরিকার একজন শ্রমিকের দৈনন্দিন জীবনে। এই বাস্তবতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক ১৪ দফা শান্তি সমঝোতা শুধু দুটি দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক ঘটনা নয়; বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি ঘটনা।

গত কয়েক মাসে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যেভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল, তাতে অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা করেছিলেন যে অঞ্চলটি একটি বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ, ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা, পারস্য উপসাগরে নৌ সংঘাতের আশঙ্কা এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারকে অস্থির করে তুলেছিল। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে, তেলের দাম বেড়ে যায়, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি হয়।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এই বাস্তবতা খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির অর্থ হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া। একজন দিনমজুর, একজন গার্মেন্টস শ্রমিক কিংবা একজন ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কোনো দূরবর্তী ঘটনা নয়; বরং তা সরাসরি তার সংসারের খরচের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই প্রেক্ষাপটে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি সমঝোতা বিশ্ববাসীর জন্য নিঃসন্দেহে একটি স্বস্তির বার্তা। কারণ যুদ্ধের সম্ভাবনা কমলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে যায়।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী পুনরায় স্বাভাবিকভাবে খুলে দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যেকোনো অনিশ্চয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে এই প্রণালী। ফলে এখানে স্থিতিশীলতা ফিরে আসা মানেই বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের স্বস্তি। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল ও গ্যাস মজুদের মালিক ইরান। কিন্তু দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটি তার পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেনি। যদি এই বাধাগুলো ধীরে ধীরে দূর হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ বাড়বে, যা মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।

১৪ দফা সমঝোতা গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে মনে হয়, ইরান তার দীর্ঘদিনের অধিকাংশ কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধের অবসান, সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি, তেল রপ্তানির সুযোগ, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পুনঃঅন্তর্ভুক্তি, জব্দ সম্পদ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য শত শত বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য তহবিলÑ এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো ইরানের পক্ষ থেকে পুনরায় ঘোষণা যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের প্রধান উদ্বেগ ছিল এই বিষয়টি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত এই ক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক সাফল্যের দাবি করতে পারে। কিন্তু সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চুক্তির অধিকাংশ ধারা কোনো না কোনোভাবে ইরানের দীর্ঘদিনের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ কারণেই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে এটিকে ইরানের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। কারণ ইরানের রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি সম্পদ, শক্তিশালী মানবসম্পদ, উল্লেখযোগ্য শিল্পভিত্তি, উন্নত বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান। এতদিন তাদের প্রধান বাধা ছিল আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত। সেই বাধাগুলো দূর হলে দেশটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নতুন মাত্রা পাবে।

চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগ, মধ্য এশিয়ার বাণিজ্যিক করিডোর, দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি বাজার এবং ইউরোপের বিকল্প জ্বালানি উৎসের চাহিদাÑ সব মিলিয়ে ইরান ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এই চুক্তির আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির শক্তিকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। সামরিক সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা এবং শক্তি প্রদর্শনের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার যে পথ, সেটিই শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা।

বিশ্ব আজ একসঙ্গে বহু সংকট মোকাবিলা করছেÑ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা সংকট, আঞ্চলিক সংঘাত এবং ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা। এই পরিস্থিতিতে আরেকটি বড় যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত। সে তুলনায় শান্তিচুক্তির পথে অগ্রসর হওয়া মানবজাতির জন্য অনেক বেশি আশাব্যঞ্জক। তাই এই সমঝোতাকে শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি কূটনৈতিক নথি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য স্বস্তির বার্তা, জ্বালানি বাজারের জন্য ইতিবাচক সংকেত, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আশার আলো এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জন্য সম্ভাব্য স্বস্তির সংবাদ।

চুক্তিটি এখনও চূড়ান্ত রূপ পায়নি। সামনে ৬০ দিনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা বাকি রয়েছে। বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জও কম নয়। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্ক আশাবাদই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত অবস্থান। তবুও বর্তমান বাস্তবতায় একটি বিষয় স্পষ্টÑ যুদ্ধের পথ থেকে সরে এসে শান্তির পথে অগ্রসর হওয়া বিশ্ববাসীর জন্য নিঃসন্দেহে একটি স্বস্তির খবর। আর চুক্তির বিষয়বস্তু বিচার করলে আপাতদৃষ্টিতে এটিকে ইরানের একটি বড় কূটনৈতিক বিজয় বলেই মনে হয়। যদি এই প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তাহলে আগামী দশকের মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রে ইরানের উত্থান একটি নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে। 

লেখক: আহসান হাবিব বরুন (সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক) 

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা