× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাজেট বড়, বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম, সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান-ন্যাশনাল এফ এফ ফাউন্ডেশন। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম, সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান-ন্যাশনাল এফ এফ ফাউন্ডেশন। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আর বাজেটে মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি। ঘাটতি অর্থায়নের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকার ব্যাংক খাত থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। একই সঙ্গে আসন্ন অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যয় হবে আরও ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এ ধরনের ঋণ-নির্ভর বাজেট বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ বাড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের শুরুতে সরকারের ব্যাংকঋণের স্থিতি ছিল পাঁচ লাখ ৫০ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা, যা ১০ মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৬০ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকায়। সরকারের প্রধান আয়ের উৎস রাজস্ব খাত হলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে শুল্ক ও কর আদায়ে ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্থরতা ও আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে এবারও সরকারকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি অর্থায়নের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকার ব্যাংক খাত থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। একই সঙ্গে আসন্ন অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যয় হবে আরও ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এ ধরনের ঋণ-নির্ভর বাজেট বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ বাড়বে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক থেকে এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। তবে অর্থবছরের জুলাই থেকে ১০ মে পর্যন্ত সরকার এরই মধ্যে নিট এক লাখ ৯ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। সরকারের প্রধান আয়ের উৎস রাজস্ব খাত হলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে শুল্ক ও কর আদায়ে ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্থরতা ও আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে। 

নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পাশাপাশি ভঙ্গুর অর্থনীতিকে গতিশীল করতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর নানা কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয় এবারের বাজেটে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড়, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ কমানোর উদ্যোগের মাধ্যমে জনজীবনে স্বস্তি ফেরানোর বার্তা দিতে চায় সরকার। অর্থনীতিকে পুনরায় উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে এনে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের আলোকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কর্মসংস্থানভিত্তিক উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলাই হতে যাচ্ছে এ বাজেটের প্রধান লক্ষ্য। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই বাজেটে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা বাড়ানো, ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার, মানুষের দোরগোড়ায় উন্নত চিকিৎসাসেবা, মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরার লক্ষ্য সামনে রাখা হয়েছে। 

জনতুষ্টি সামনে রেখে আগামী বাজেটের মূল অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্যে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা ফিরিয়ে আনা এবং কল্যাণমূলক অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা। অন্যদিকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি কল্যাণকর অর্থনীতির শক্ত ভিত্তি গড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যুবসমাজকে দক্ষ করে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো খাতে সঠিক প্রকল্প নির্বাচন, বিজ্ঞানভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও জনগণের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার মতো জনকল্যাণমুখী খাতগুলো থাকছে এই বাজেটের মূল কেন্দ্রে। একই সঙ্গে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুনর্গঠন, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে আইনি জটিলতা দূরীকরণ এবং চলচ্চিত্র, ক্রীড়া ও গ্রামীণ সংস্কৃতির মতো সৃজনশীল অর্থনীতি খাতের বিকাশকে এবার বিশেষভাবে প্রাধান্য দিচ্ছে সরকার।

অন্যদিকে কর প্রস্তাব যেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তকে চাপে না ফেলে তা বিবেচনা করে বাজেট প্রস্তুত করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে জনগণের ওপর নতুন করের চাপ না দিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসা সহজীকরণ ও ডিজিটাল রাজস্বব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। বেশিরভাগ নিত্যপণ্যে কর ছাড় ও শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা রাখা হয়েছে। ব্যবসা সহজ করা ও সাধারণ মানুষকে শক্তি দেওয়ার ওপর এবারের বাজেটে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় বাজেটে করদাতাদের স্বস্তি দিতে ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে বৈষম্য কমাতে ধনীদের আগের চেয়ে বেশি কর দিতে হবে। 

বর্তমানে একজন করদাতার নিট পরিসম্পদের মূল্যমান চার কোটি টাকা পর্যন্ত সারচার্জ শূন্য। চার কোটি টাকার বেশি হলে ১০ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকা অতিক্রম করলে সারচার্জের পরিমাণ ৩৫ শতাংশ। এ ছাড়া একাধিক গাড়ি থাকলে সিসিভেদে ২৫ হাজার থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পরিবেশ সারচার্জ দিতে হয়। বাজেটে বাজারমূল্যের ওপর ভিত্তি করে চার কোটি টাকার বেশি তবে ১০ কোটির কম সম্পদ থাকলে তাকে সম্পদমূল্যের শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ ‘সম্পদ কর’ দিতে হবে। ১০ কোটির বেশি তবে ২০ কোটির কম হলে এক শতাংশ, ২০ কোটির বেশি কিন্তু ৫০ কোটির কম হলে এক দশমিক ৫০ শতাংশ ও ৫০ কোটির বেশি হলে দুই শতাংশ ‘সম্পদ কর’ নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে এনবিআর। এই সম্পদ কর কোনোভাবেই করদাতার প্রদেয় করের চেয়ে বেশি হবে না। 

 দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে তারেক রহমান দেশে ফেরার সময় সবচেয়ে বেশি প্রচার পায় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান। এই দর্শন স্থান পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম বাজেট প্রস্তাবনাতেও। এজন্য দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তুলতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করেছেন আসছে বাজেটে। কর্মসংস্থানে বৈচিত্র্য আনতে উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ নামক নতুন এক প্লাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রস্তাবিত এই বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা গঠনের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের মতে, একটি আধুনিক, জ্ঞানভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসায় স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে একটি বড় প্রত্যাশার জায়গা তৈরি হয়েছে। যেহেতু এটি এই সরকারের প্রথম বাজেট, তাই তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন এখানে থাকাটাই স্বাভাবিক। প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে এবার বাজেটের আকার ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে জনতুষ্টির কথা মাথায় রেখে সরকারের হাতে আসলে এর কোনো বিকল্পও নেই। তবে এই বিশাল বাজেটের ঘাটতি অর্থায়ন যদি সরকার পরিকল্পনামাফিক সফলভাবে করতে পারে, তাহলে ২০৩৪ সালের মধ্যে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির’ যে স্বপ্ন সরকার দেখছে, তা বাস্তবায়ন করা পুরোপুরি সম্ভব। বাংলাদেশের ইতিহাসে বৃহত্তম এই বাজেট বাস্তবায়ন করা কতটুকু সম্ভব, সেটাই দেখার বিষয়।


ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম

সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান-ন্যাশনাল এফ এফ ফাউন্ডেশন

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা