কাজী জিয়া উদ্দিন
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
কাজী জিয়া উদ্দিন। ফাইল ছবি
বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আজ এমন এক মানসিক অবস্থায় আবদ্ধ, যাকে ‘মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতি’ বলা যেতে পারে। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক মানসিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক আত্মতুষ্টি, ব্যক্তিস্বার্থের প্রবণতা এবং জনগণের বাস্তব চাহিদা ও অনুভূতি থেকে ক্রমবর্ধমান দূরত্বের ফল।
সমস্যার মূল হলো- রাষ্ট্রের কর্মচারী হিসেবে নিজেদের ভূমিকা সম্পর্কে অনেকের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছে। জনগণের সেবক হওয়ার পরিবর্তে তারা যেন নিজেদের জনগণের অভিভাবক, এমনকি কখনো কখনো প্রভু হিসেবেও কল্পনা করতে শুরু করেছেন। ফলে সাধারণ নাগরিকের প্রতি এক ধরনের নীরব ঔদ্ধত্য ও প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেষ্ঠত্ববোধ গড়ে উঠেছে, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দার্শনিক হেনরি ডেভিড থোরো বলেছিলেন, “যে সরকার জনগণের স্বাধীনতা, সক্ষমতা ও উদ্যোগকে সর্বাধিক সম্মান করে, সেই সরকারই সর্বোত্তম।” কিন্তু আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতির অনেক ক্ষেত্রে এখনো নিয়ন্ত্রণ, নির্দেশনা ও ক্ষমতার প্রদর্শনই যেন মুখ্য হয়ে আছে; সেবা, সহমর্মিতা ও অংশীদারিত্ব নয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, সততা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতার দীর্ঘমেয়াদি সুফল-যা একটি জাতির প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ও জনগণের আস্থা গড়ে তোলে-সেগুলো প্রায়ই প্রশাসনিক চিন্তার কেন্দ্রে স্থান পায় না। পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে এমন এক জীবনদর্শন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা মধ্যযুগীয় সুবিধাভোগী শ্রেণির মানসিকতার সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, পারিবারিক উন্নতি কিংবা ভবিষ্যৎ সুবিধা অনেক সময় বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের ওপর অগ্রাধিকার পায়।
এই প্রবণতাকে একটি ব্যঙ্গাত্মক উক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়- “আমেরিকা ধ্বংস হোক, কিন্তু তার আগে যেন আমার ছেলে হার্ভার্ড থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হতে পারে।” উক্তিটি অতিরঞ্জিত হলেও এর অন্তর্নিহিত বার্তা গভীর। ব্যক্তিস্বার্থ যখন জাতীয় দায়বদ্ধতাকে ছাপিয়ে যায়, তখন রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সমাজও ধীরে ধীরে এই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। নাগরিকদের একাংশের মধ্যে নীরব সমর্পণ, অসহায় গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রত্যাশার সংকোচন তৈরি হয়েছে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার পরিবর্তে আমরা অনেক সময় সেগুলোকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নিতে শুরু করি। এই সামাজিক সহনশীলতাই ব্যবস্থাগত সমস্যাগুলোকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
একই সঙ্গে প্রশাসনের অনেক স্তরে উদ্ভাবনী চিন্তা, সৃজনশীল সমস্যা সমাধান, ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতা এবং নৈতিক সাহসের ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। অনেক কর্মকর্তা নিজস্ব গণ্ডির বাইরে বের হয়ে সাধারণ মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে বোঝার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। ফলে সৃষ্টি হয় এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্ছিন্নতা-যেখানে নিজের সীমিত অভিজ্ঞতাকেই পুরো বাস্তবতা বলে ধরে নেওয়া হয়। বাংলা প্রবাদে যাকে বলা হয়, ‘কুয়োর ব্যাঙ’ মানসিকতা।
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেও সমস্যা কম নয়। আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ঊর্ধ্বতন-নিম্নতন সম্পর্ক এখনো অত্যন্ত স্তরবিন্যস্ত। ফলে তরুণ কর্মকর্তা বা মাঠপর্যায়ে কর্মরতদের নতুন ধারণা, বিকল্প চিন্তা কিংবা উদ্ভাবনী প্রস্তাব অনেক সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের উচ্চস্তর পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারে না। যেকোনো আধুনিক প্রতিষ্ঠানের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শোষণ করার ক্ষমতা-এক ধরনের ‘স্পঞ্জ ইফেক্ট’। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠানে এই সক্ষমতা এখনো সীমিত।
বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তি, অর্থনীতি, নাগরিক প্রত্যাশা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতাও প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে শুধু নতুন কিছু শেখাই যথেষ্ট নয়; পুরোনো ও অকার্যকর অভ্যাস ভুলে যাওয়া এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ‘আনলার্নিং’ ও ‘রিলার্নিং’-এর এই সংস্কৃতি ছাড়া আধুনিক প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আমাদের সামনে অনুপ্রেরণার উদাহরণ স্থাপন করেছে। সিঙ্গাপুর দেখিয়েছে, কঠোর সততা, মেধাভিত্তিক নিয়োগ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা কীভাবে একটি ছোট রাষ্ট্রকে বৈশ্বিক সাফল্যের প্রতীকে পরিণত করতে পারে। নিউজিল্যান্ড স্বচ্ছতা ও নাগরিককেন্দ্রিক সেবাকে প্রশাসনের মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে জনগণের আস্থা অর্জন করেছে। ফিনল্যান্ড সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণে নৈতিকতা ও জনবিশ্বাসকে কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। আর জাপানের ‘কাইজেন’ দর্শন আমাদের শেখায়-উন্নয়ন কোনো এককালীন বিপ্লব নয়; এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট উন্নতির ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
একটি ছোট গল্প এখানে প্রাসঙ্গিক। এক রাতে একটি ইঁদুর ঘন জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলল। সাহায্যের জন্য সে একটি পেঁচার কাছে গেল। পেঁচা বলল, “এটা খুব সহজ। আমার মতো ডানা গজাও, তারপর উড়ে ওপরে উঠে দেখো। সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।”
ইঁদুরটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু আমি ডানা গজাব কীভাবে?”
বিরক্ত হয়ে পেঁচা উত্তর দিল, “আমি তো সমাধান বলে দিয়েছি। বাস্তবায়ন করা তোমার কাজ।”
এই গল্পটি আমাদের নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। আমরা কি কখনো কখনো সেই পেঁচার মতো হয়ে যাচ্ছি না? বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা, মানুষের সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের জটিলতা না বুঝে কেবল তাত্ত্বিক সমাধান দিয়ে দায়িত্ব শেষ করছি না তো?
আজ আমাদের প্রয়োজন একটি মৌলিক ইউটার্ন, একটি কাঠামোগত ও দার্শনিক পরিবর্তন। একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উন্নত সমাজ গড়তে হলে এমন একটি সিভিল সার্ভিস দরকার, যা হবে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রাণবন্ত, নৈতিকভাবে দৃঢ়, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এবং সর্বোপরি জনগণকেন্দ্রিক।
আমাদের প্রশাসনকে কেবল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং উদ্ভাবন, সংস্কার এবং জাতীয় পুনর্জাগরণের চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার গভীর পুনর্বিন্যাস, নাগরিকের দৃষ্টিকোণ থেকে সেবা নকশা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং নৈতিক নেতৃত্বের বিকাশ।
সময় এখন আর অপেক্ষা করার নয়। ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে কিছু জাতি সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ বদলে দিয়েছে। বাংলাদেশও সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রশ্ন একটাই-আমরা কি অতীতের মানসিক শৃঙ্খল ভেঙে নতুন পথের যাত্রী হতে প্রস্তুত?
সময়ের স্রোত কারও জন্য থেমে থাকে না। যারা সময়ের আহ্বান শুনতে ব্যর্থ হয়, ইতিহাস তাদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যায়। আর যারা সাহসের সঙ্গে পরিবর্তনকে গ্রহণ করে, তারাই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। এখন সেই সাহস দেখানোর সময়।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি