× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আলোকময় শিক্ষা, আলোকিত ভবিষ্যত

আলতাফ হোসেন উজ্জ্বল

প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে

শিক্ষা আসলে কোনো শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা শুরু হয় বিস্ময় থেকে, কৌতূহল থেকে, জানার অদম্য আকাঙ্ক্ষা থেকে।  গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শিক্ষা আসলে কোনো শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা শুরু হয় বিস্ময় থেকে, কৌতূহল থেকে, জানার অদম্য আকাঙ্ক্ষা থেকে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

একটি শিশু যখন প্রথমবারের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে প্রশ্ন করেÑ ‘তারারা কেন জ্বলে?’ তখনই শিক্ষার প্রথম বীজ অঙ্কুরিত হয়। যখন সে নদীর প্রবাহ দেখে জানতে চায়Ñ ‘পানি কোথায় যায়?’ তখনই জ্ঞানের প্রথম জানালাটি খুলে যায়। শিক্ষা আসলে কোনো শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা শুরু হয় বিস্ময় থেকে, কৌতূহল থেকে, জানার অদম্য আকাঙ্ক্ষা থেকে। আর এই কৌতূহলই মানুষকে গুহা থেকে মহাকাশে, অন্ধকার থেকে আলোর পথে, স্থবিরতা থেকে সভ্যতার শিখরে পৌঁছে দিয়েছে।

বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। উন্নয়নশীল রাষ্ট্র থেকে একটি জ্ঞানভিত্তিক, উদ্ভাবন-নির্ভর ও মানবিক রাষ্ট্রে উত্তরণের স্বপ্ন দেখছে দেশ। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল কিংবা ডিজিটাল অবকাঠামোর বিস্তার আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়ন, তথ্যপ্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাও আশাব্যঞ্জক। কিন্তু এই অগ্রগতির স্থায়ী ভিত্তি নির্মিত হবে কেবল তখনই, যখন উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকবে আলোকিত মানুষ গড়ার শিক্ষা।

শিক্ষা কেবল তথ্য আহরণের প্রক্রিয়া নয়, শিক্ষা হলো সত্য-মিথ্যা বিচারের সক্ষমতা, যুক্তিবোধের বিকাশ, নৈতিকতার চর্চা এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ। একজন মানুষ শত তথ্য জানতেই পারে, কিন্তু যদি তার মধ্যে সহমর্মিতা, সততা ও দায়িত্ববোধ না থাকে, তবে তার শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল কর্মসংস্থান নয়; শিক্ষার উদ্দেশ্য মানুষকে মানুষের মতো মানুষ করে তোলা।

দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নম্বরকেন্দ্রিক মানসিকতা একটি গভীর সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফলকে প্রায়শই মেধার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী শেখার আনন্দ হারিয়ে ফেলে, জ্ঞান অন্বেষণের পরিবর্তে মুখস্থ-নির্ভর প্রতিযোগিতার যান্ত্রিক চক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়Ñ পৃথিবীর সব বড় আবিষ্কার, সব মহান সাহিত্যকর্ম এবং সব বৈপ্লবিক ধারণার জন্ম হয়েছে প্রশ্ন থেকে, নম্বর থেকে নয়।

বাংলাদেশের তরুণ সমাজ আজ অসীম সম্ভাবনার পাশাপাশি নানা চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি। প্রযুক্তি যেমন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক চাপ, মাদকাসক্তি এবং আত্মপরিচয়ের সংকটও বাড়িয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক তরুণ বাস্তব জীবনের স্বপ্নের চেয়ে ভার্চুয়াল জীবনের প্রদর্শনীতে বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যের সাফল্যের ঝলকানি দেখে তারা কখনও কখনও নিজের সম্ভাবনাকেই ছোট করে দেখে।

এই বাস্তবতায় শিক্ষার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যশিক্ষাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সুস্থ মন ছাড়া সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে না। একটি জাতির উন্নয়ন কেবল তার সড়ক, সেতু বা আকাশচুম্বী অট্টালিকায় পরিমাপ করা যায় না; সেই উন্নয়ন পরিমাপ করতে হয় মানুষের মানসিক সুস্থতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক চেতনার গভীরতায়।

মাদকাসক্তি আজ বিশ্বব্যাপী একটি সামাজিক ব্যাধি, বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এই সমস্যা কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নির্মূল করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ। একজন তরুণ যখন জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পায়, যখন সে স্বপ্ন দেখতে শেখে, যখন সে সমাজের জন্য নিজের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে, তখন সে ধ্বংসের পথ থেকে সৃষ্টির পথে ফিরে আসে। তাই মাদক প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো অর্থবহ শিক্ষা, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড এবং ইতিবাচক জীবনদর্শন। একইভাবে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নও শিক্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্বাস্থ্যসচেতন নাগরিক তৈরি করতে হলে বিদ্যালয় থেকেই স্বাস্থ্যশিক্ষা, পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা এবং মানসিক সুস্থতার পাঠ দিতে হবে। একজন সচেতন মানুষ কেবল নিজের স্বাস্থ্য রক্ষা করে না; সে পরিবার ও সমাজকেও সুস্থ রাখার সংস্কৃতি গড়ে তোলে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও মানবসম্পদই সবচেয়ে বড় শক্তি। প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো শিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠীর শক্তিতে বিশ্ব অর্থনীতির নেতৃত্বের কাতারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদও তার তরুণ জনগোষ্ঠী। এই তরুণদের যদি দক্ষতা, উদ্ভাবনী শক্তি, নৈতিকতা ও নেতৃত্বের গুণে সমৃদ্ধ করা যায়, তবে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশ জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।

আজকের পৃথিবীতে তথ্যের অভাব নেই; অভাব রয়েছে প্রজ্ঞার। জ্ঞানের অভাব নেই; অভাব রয়েছে উপলব্ধির। প্রযুক্তির অভাব নেই; অভাব রয়েছে মানবিক প্রয়োগের। তাই শিক্ষার সর্বোচ্চ লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন নাগরিক তৈরি করা, যারা শুধু জানবে নাÑ বুঝবেও; শুধু বুঝবে নাÑ অনুভবও করবে; শুধু নিজের জন্য নয়Ñ দেশ, সমাজ ও মানবতার জন্যও চিন্তা করবে। একটি শিশুর হাতে বই, একটি তরুণের চোখে স্বপ্ন, একজন শিক্ষকের হৃদয়ে দায়বোধ এবং একজন অভিভাবকের মনে মানবিক ভবিষ্যতের প্রত্যাশাÑ এই চারটি শক্তি যদি একসূত্রে গাঁথা যায়, তবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে কোনো শক্তিই থামাতে পারবে না। কারণ, একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ তার খনিজ, তার স্থাপনা কিংবা তার প্রযুক্তি নয়; তার প্রকৃত সম্পদ তার মানুষ। আর সেই মানুষকে আলোকিত, সৃজনশীল, সুস্থ, নৈতিক ও দায়িত্ববান করে গড়ে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যমের নাম শিক্ষা।

যে শিক্ষা মানুষকে জীবিকা দেয়, তা প্রয়োজনীয়; কিন্তু যে শিক্ষা মানুষকে মানবিক করে তোলে, সমাজকে আলোকিত করে এবং জাতিকে মহিমান্বিত করে সেই শিক্ষাই প্রকৃত মহৎ শিক্ষা। বাংলাদেশের আগামী দিনের স্বপ্নযাত্রায় আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সেই আলোকময় শিক্ষারই।


আলতাফ হোসেন উজ্জ্বল 

শিক্ষক, কবি ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা